| |

পৌর এলাকার আবর্জনাভোজী গরুর দুধ জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

মোঃ নুরুল  ইসলাম : বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি ) বিজ্ঞানীরা  পৌর এলাকার আবর্জনাভোজী গরুর দুধে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি পেয়েছেন। ছয় মাসের গবেষণায় এই তথ্য পাওয়া গেছে । গত ২০১৬  সালের ডিসেম্বর মাসে এ গবেষণা শেষ হয়েছে এবং বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যানিমেল সাইন্সে এর ফলাফল  প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের অধীন পশু বিজ্ঞান বিভাগের একজন পি.এইচ.ডি ছাত্র সাখাওয়াত হোসেন  এবং একই বিভাগের তাঁর সুপারভাইজার প্রফেসর ড. আবুল কালাম আজাদ  জানান, তাঁরা পৌর এলাকার আবর্জনাভোজী  গরুর দুধের নমুনায় ভারী ধাতু লেড (সীসা) , ক্যাডমিয়াম (টিনের মতো ধাতু বিশেষ ) ও জিংকের (দস্তা ) উপস্থিতি পেয়েছেন। তাঁরা বলেছেন দুধের  নমুনায় বিশ্ব স্থাস্থ্য সংস্থার  (ডঐঙ) অনুমোদিত মাত্রার  দ্বিগুণ পরিমান লেডের  উপস্থিতি  পেয়েছেন ।  তাঁরা  অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে  বেশী পরিমান ক্যাডমিয়াম এবং জিংক পেয়েছেন ।
গো খাদ্য হিসেবে ডাস্টবিনের বর্জ্য বিশেষ করে  আবর্জনা (গারবেজ) বর্জ্যে ভারী ধাতু থাকে এবং দূর্গন্ধ যুক্ত দূষিত আবর্জনা  বর্জ্য থেকে গরুর দুধে ভারী ধাতু চলে আসে ।  পৌরসভা বা সিটি কপোরেশন  এলাকার আবর্জনা বর্জ্যে বেশী পরিমাণ ভারী ধাতু থাকে যা স্বাস্থ্য ও পরিবেশের বিপর্যয় সৃষ্টি করে ।  শহর এলাকার  ডেইরি গাভী  মুক্তভাবে রা¯তায়  চলাচলের সময় আবর্জনা  বর্জ্যকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করার ফলে ভারী ধাতু গুলো শরীরে প্রবেশ  করে এবং ধীরে ধীরে দুধ ও মাংসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের মোট পশু সম্পদের প্রায় শতকরা ২ ভাগ শহর এলাকায়  পাওয়া যায়। মজার বিষয় হচ্ছে, কোন প্রকার পরিকল্পনা ছাড়াই শহরে গরু লালন-পালন করা হয় ।  অধিক ঘনত্বের  জনসংখ্যার দেশে এটি স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি  করে  এবং পরিবেশ দূষণের দিকে টেনে নিয়ে যায়  ।
এ দেশে প্রায় শতকরা ৬৭ ভাগ ডেইরি গরু পালন করা হয় এবং শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগের বেশি গবাদী পশু তিন বছর পর্যন্ত রাখা হয় । এদের প্রায় শতকরা ৬ ভাগ মালিক ৬ মাসের  মধ্যে  গরু বিক্রি করে ফেলে  এবং প্রায় শতকরা ৫৬ ভাগ মালিক রিপ্লেজম্যান্ট স্টক ( পুনর্বার পালনের জন্য মজুত রাখা )  হিসেবে বাছুর পালন করেন। প্রায় শতকরা ৬৬ ভাগ গরু রাস্তায় আবর্জনার স্তূপ, ডাস্টবিনের ময়লা, বেড়াবিহীন খোলা জায়গায় পঁচা বর্জ্য এবং সরকারি ও পৌর  এলাকার রাস্তা থেকে  পঁচা আবর্জনাকে খাবার হিসেবে ব্যবহার করে। অধিকাংশ গরুর  মালিক  গরুর জন্য কোন প্রকার খাদ্য সরবরাহ করেন  না এবং  তাঁরা  উম্মুক্তভাবে গরু  ছেড়ে দেন।
পৌর এলাকার অধিকাংশ  ঘুরে বেড়ানো গরু  রাস্তার  ডাস্টবিনে ফেলা রান্না ঘরের অবশিষ্ট আবর্জনা, সবুজ বর্জ্য, পেপার, পেইন্ট, রাসায়নিক বর্জ্য, সার, পেস্টিসাইড্স , হারবিসাইড্স, চামড়া বর্জ্য এবং ডাক্তারী বর্জ্যের মিশ্রিত আইটেম খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। শহর এলাকায় গবাদী পশু পালনের মাধ্যমে জনগণের চলাচলের রাস্তায় গোবর, মূত্র নিস্বরণ, দুর্গন্ধ ও রাস্তা অবরোধ বা যানজট প্রভূতি সৃষ্টি  হয় । যথাযথ পশুর খাদ্য সরাবরাহ না করা এবং গবাদী পশুর আশ্রয়ের অভাবে এই সমস্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এছাড়া শহর এলাকায় শতকরা প্রায় ৮৬ ভাগ গরু অস্থায়ী সেডে রাখা হয়  । এদের দুই তৃতীয়াংশ গরু রাস্তায় মুক্ত ভাবে চলাফেরা করে এবং প্রায়  শতকরা ৭৯ ভাগ গরু রাস্তার পাশে ড্রেনের পানি পান করে। বিভিন্ন পেথোজেন (ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া, ফাঞ্জাই), ভারী ধাতু এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ গরু খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে । এসব  পদার্থ দুধ ও মাংসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে  প্রবেশ করে ।
শহরে প্রায় শতকরা ৬৮ ভাগ গরু দুধের  উদ্দেশ্যে পালন করা হয় ।  প্রায়  শতকরা ২৪ ভাগ গরু মাংসের জন্য ব্যবহার করা হয়। শহর এলাকায় গবাদি পশু পালনের কোন পরিসংখ্যান  নেই।  প্রকৃত পক্ষে প্রায় শতকরা ৫৮ ভাগ গরুর মালিক স্বচ্ছল এবং শতকরা প্রায় ২৬ ভাগ ব্যবসায়ী যাদের উভয়ই সমাজে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে ।
জনগণের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের মারাত্মক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বে ও শহর এলাকায় গবাদি পশু পালনের ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস করার উদ্দেশ্যে সঠিক নিয়মে কোন সর্তকতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না । শহর এলাকার  অধিকাংশ গবাদিপশুর মালিক  মৌলিক শিক্ষা ও পরিবেশের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা সত্বেও  এ পরিস্থিতি প্রতিরোধে ক্ষুদ্র ঊদ্যোগ নেয়া  হচ্ছে।
গবাদি পশু পালনে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের উপর খারাপ প্রভাব সম্পর্কে শতকরা ১০০ ভাগ গবাদি পশুর মালিক সচেতন । তাঁদের ৭৩ ভাগ লোকের কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষা আছে। যদি এটি সঠিক ভাবে দমন বা তদারকী না করা হয় , এটি মহামারী বা মারাত্মক রোগ ডেকে আনতে পারে  । এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য  জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান ওই গবেষণার ফলের সাথে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘এটা একটি  স্বাভাবিক ঘটনা। এর আগেও বিভিন্ন গবেষণায় এমন ধরনের কিছু নমুনা মিলেছে। তবে জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় বিষয়টি নিয়ে আরো জোরালো গবেষণা জরুরি।’
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মাহবুবুল আলম তরফদার বলেন, ‘এখানে নমুনা দুধে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে।’
অধ্যাপক ড. মোঃ আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘দুধে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতির প্রমাণ তাঁরা পেয়েছেন। বিভিন্ন জার্নালে তাঁরা তা প্রকাশও করেছেন।’