| |

বৃহত্তর ময়মনসিংহের রাজাদের স্মৃতি বিজরিত সু-স-ঙ্গ-দু-র্গা-পু-র

মোঃ মোহন মিয়া  : বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার রাজাদের স্মৃতি বিজরিত ও বর্তমানে নেত্রকোনা জেলার বাংলাদেশ ভারত সীমান্তের একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল সু-স-ঙ্গ-দু-র্গা-পু-র।ভারতের মেঘালয় প্রদেশের  সারি সারি গারো পাহাড় বেষ্টিত প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যময় লীলাভূমি দুর্গাপুর।প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দুর্গাপুর এখন বিশ্বের ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে।এই এলাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতাপশালী জমিদারদের অসংখ্য কাহিনী।জমিদারদের অনেক ঘটনা আজও কিংবদন্তী হয়ে আছে এখানে। সুসঙ্গের জমিদারী শাসন চলে একটানা ৩’শ বছর এবং জমিদাররা ছিলেন স্বাধীন।।জমিদারদের অসংখ্য ঘটনা আজও পুরাতন স্মৃতিগুলোকে স্মরন করিয়ে দেয়। দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় ছিল তাদের রাজস্ব আদায়ের একমাত্র পথ। উপজাতী গারো হাজং , কোচ , বানাই এরা ছিল এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দা।জমিদারী ক্ষমতার বলে সুসঙ্গ এর রাজাই পান একমাত্র মহারাজার উপাধি।জমিতে ধান হোক আর না হোক কড়ায় গন্ডায় বুঝে নিতেন রাজাদের চুক্তি মোতাবেক ‘টঙ্ক’ প্রথা নামে কৃষকের ফসল। সুসঙ্গ মহারাজার বংশধর ছিলেন এ দেশের কমিউনিষ্ট আন্দোলনের প্রধান প্রতিকৃত  কমরেড মণিসিংহ তিনি ছিলেন তার ভাগ্নে।
সুসঙ্গ রাজবংশের রাজাগন সোমেশ্বর পাঠকের বংশধর ছিলেন। সুসঙ্গ পরগণার পরিধি ছিল ব্যাপক। এই গারো পাহাড়ের অন্তর্গত ন্যাংজাশৈল , পূর্বে মহিষখোলার মহাদেব নদী।পশ্চিমে হালুয়াঘাট , ধোবাউড়া। দক্ষিনে বিশাল সমতল ভূমি নিয়ে ছিল সুসঙ্গ পরগণা। আর দুর্গাপুর নামকরনের ব্যাপারে জনশ্রুতি রয়েছে অধিষ্ঠাত্রি দেবী দশভূজার নামানুসারে দুর্গাপুর রাখা হয়।অনেকে আবার এও বলছেন আদিবাসী নেতা ও প্রভাবশালী দূর্গাপুর নামকরন করা হয়।তখনকার আমলে গহীন অরণ্যে আর হিং¯্র জীবজন্তুতে পরিপূর্ণ ছিল এই এলাকা। ঘন অরণ্যের ফাঁকা জায়গায় ও পাহাড়ের পাদদেশে গারো ও ধীবর সম্পদের বসতি ছিল প্রচুর।আঞ্চলিক ভাষায় ধীবরদের পাটুনী বলা হতো।গারো পাহাড়ের মেঘালয় থেকে প্রবাহিত খর¯্রােতা মেঘালয় কন্যা সোমেশ্বরী নদী এর বুকে  রয়েছে মূল্যবান নুড়ী পাথর, মোটা বালু, সিলিকন বালু, ও কয়লা।  ধীবরগন দেবতুল্য ব্রাম্মন সোমেশ্বর পাঠকের পরিচয় পেয়ে তাকে দুর্গাপুর আসার আমন্ত্রণ জানালে তিনি তার অনুচরসহ দুর্গাপুরে একটি অশোক বৃক্ষের নিচেঅবস্থান করেন।উক্ত স্থানটি বর্তমানে দশভূজা মন্দির এর দক্ষিণ পাশে এবং দুর্গাপুর সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রধান ফটকের সম্মুখে অবস্থিত। সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি তখনকার আমলে সুসঙ্গ মহারাজার বসত বাড়ি ছিল। তখনকার আমলে নির্মিত ৪ টি বাসস্থান ও একটি বিশাল কূপ ঐ স্থানে ছিল।১৯৭০ সালের আগ পর্যন্ত ঐ কূপের পানিই ছিল একমাত্র দুর্গাপুর বাসীর পানির চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থা।সোমেশ্বর পাঠকের নাম অনুসারে সুসঙ্গ পরগনার ভিত্তি স্থাপিত হওয়ায় তার নাম হয় সুসঙ্গ।দুর্গাপুরে সুসঙ্গ পরগনার প্রতিষ্ঠাতা সোমেশ্বর পাঠক খ্রীষ্টিয় চতূর্দশ শতাব্দের প্রথম দিকে প্রায় ১’শ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। পরে সোমেশ্বর পাঠকের মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে সুসঙ্গ রাজবংশগন বিভিন্নভাবে বিভক্ত হয়ে বড়বাড়ী , আবুবাড়ী, মধ্যমবাড়ী ও দুয়ানীবাড়িনামে পরিচিতি লাভ করে। সুসঙ্গ মহারাজার পাঠকের নামে দুর্গাপুরের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত খর¯্রােতা সোমেশ্বরী নদীর নামকরন করা হয়।বর্তমানে এই নদী যৌবন হারা মৃত প্রায়।ঐতিহাসিক ঘটনার জন্মধাত্রী সুসঙ্গ রাজ রানী কমলারানী দিঘীও আজ সুমেশ্বরী নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।দিঘীর একটি পাড় রয়েছে যা দেখলে মনে হবে সমতল ভূমিতে একটি পাহাড় দাড়িয়ে আছে।এলাকায় এটি “সাগর দিঘী” নামে পরিচিত। সবুজ বনলতায় ঘেরা সারি সারি বিশাল পাহাড় , শ্বেতশুভ্র জলরাশিতে দুকুল ছাপানো পাহাড়ি কন্যা সোমেশ্বরী নদীর সেই উত্তাল স্মৃতি আজ নেতিয়ে পড়ে মরুভূমিতে পরিনত হয়েছে।
সোমেশ্বর পাঠকের সময়কালে সুসঙ্গ রাজ্যের পরিধি ছিল গারো পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ২’শ কি:মি: দৈর্ঘ ও প্রায় ১৩০ কি:মি: প্রশস্ত। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগাভাগির আগ পর্যন্ত এখানে বাঙ্গালীর সংখ্যা ছিল খুবই নগন্য। বেশীর ভাগ ছিল উপজাতি। এদের মধ্যে গারোরাই ছিল সংখ্যায় গরিষ্ট।পুরুষরা পরিধান করত লেংটি আর মেয়েরা কোমরের নিচে হাটু পর্যন্ত পরিধান এক টুকরো কাপড়।সুসঙ্গ পরগনায় গারো পাহাড়ে হাতি ছিল প্রচুর। সুসঙ্গ রাজাদের প্রধান আকর্ষন ও আয়ের উৎস ছিল ‘ আগড় ’ কাঠ ও হাতি।জমিদাররা ‘খেদা’ দিয়ে হাতি ধরার ব্যবস্থা করত। নলুয়াপাড়া , দাহাপাড়া , গোপালপুর , ভবানীপুর ও লেঙ্গুড়া পর্যন্ত পাহাড়ী এলাকায় ছিল হাতি ধরার বিশাল “খেদা”। এই জন্য সুসঙ্গ রাজাগন হাতি ধরার কাজে হাজং উপজাতিদের ব্যবহার করার জন্য ভারতের আসাম প্রদেশের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে এদের নিয়ে আসেন।হাজংরা হিন্দু ধর্মাম্বলী।হাজংরা ছিল সৎ ,সাহসী ও দুর্ধর্ষ।হাতি ধরে পোষ মানিয়ে ইংরেজদের কাছে বিক্রী করে প্রচুর মুনাফা করতেন।সুগন্ধী আগড় কাঠ ও হাতি নজরানা দিয়ে ইংরেজদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ ও বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতেন রাজাগন। এক পর্যায়ে উত্তরের আসামের প্রান জতিকাপুর এবং দক্ষিনে কিাশোর গঞ্জ জেলার জঙ্গল বাড়ী দুর্গের বীর  ঈশাখা এর সাথে মহারাজাদের বিরোধ বাধে। দুই দিক থেকে চাপ সৃষ্টির ফলে রাজার এক মাএ পুত্র রাজা রঘুনাথ উপায় না দেখে মানসিংহের মারফতে দিল্লির স¤্রাট আকবরের সরনাপন্ন হন। স¤্রাট কে নজরানা দিতে সঙ্গে নেন সুগন্ধী আগর। রাজা রঘু ও সম্রাট আকবরের মধ্যে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হন। চুক্তির বিনিময়ে রাজা প্রতিবছর আগর পাঠাতেন আর সম্রাট তখন সব ধরনের আক্রমন থেকে রাজা রঘুকে রক্ষা করবেন। এক সময় রাজা রঘুকে পাঁচ হাজারী মনসফদারের অধিকার দেন। এই চুক্তির ফলে রাজা রঘুকে মানসিংহের পক্ষে ও চাঁদ রায়, কেদার রায় এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলা হয় । যুদ্ধে চাঁদ রায়, কেদার রায় পরাজিত হলে ওখান থেকে  রাজা রঘু অষ্ট ধাতুর “দূর্গাপ্রতিমা” নিয়ে আসেন। এই প্রতিমা পরে সুসঙ্গ রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করে অঞ্চলের নাম রাখা হয় সুসঙ্গ দুর্গাপুর।
সুসঙ্গ রাজ্যের পতনের সময়ে বিশ্বনাথ সিংহ রাজ্য শাসন করতেন। তার ছিল চার পুত্র। রাজকৃষ্ণ , অমলকৃষ্ণ , জগৎকৃষ্ণ ও শিবকৃষ্ণ এদের প্রত্যেকের রাজবাড়ির অংশ ছিল ১০ একর করে। রাজারা রাজবাড়ীতে বাঘ , হরিণ , ময়না , ময়ুর সহ বিভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখি লালন পালন করতেন।তাদের একমাত্র বাহন ছিল হাতি।হাতির উপরে সুসজ্জিত সুন্দর বেষ্টনী দিয়ে তার উপর বসে চলাফেরা করতেন। সুসং মহারাজা রাজকৃষ্ণ জমিদারীর ১৪ আনা অংশের জমিদার ছিল বড় হিস্যা। বড় হিস্যাই “বড়বাড়ি” নামে পরিচিত। বড় বাড়িতেই অবস্থান করতেন তার ছেলে মহারাজা কুমুদচন্দ্র সিংহ শর্মা। ছিল এখানে সুসং রাজবাড়ির ৩ তলা বিশিষ্ট বিশাল রংমহল।রংমহলটির উপরে ছিল টিনের ছাউনী, চারিদিকে ছিল কারুকার্য করা কাঠের বেড়া ও মেঝ পাকা।১৯৭০ সালে রংমহলটিতে প্রতিষ্ঠিত হয় সুসং ডিগ্রী কলেজ।জমিদারীর মধ্যম হিস্যাকে মধ্যম বাড়ি বলা হত। রাজা প্রমোদ চন্দ্র সিংহ শর্মা , রাজা সুহৃদ সিংহ শর্মা এবং তাদের উত্তরাধিকারী গন মধ্যম বাড়ির রাজকার্য পরিচালনা করতেন। মহারাজার বাসস্থানে রয়েছে দুর্গাপুর সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।এই বাড়িতে রয়েছে রাজবংশের পুরনো ৩টি ঘর। ঘরের ভিতরে ও বাহিরে রয়েছে কাঠের সুন্দর কারুকার্য।জমিদারীর ছোট হিস্যা আবু বাড়ি নামে পরিচিত।আবু বাড়ির রাজা অমলেন্দু সিংহ যিনি বাহাদুর নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন।সুসং রাজবংশেরসর্বশেষ বংশধর মিনি বাহাদুর ১৯৬৮ সালে ভারতে চলে যান।শিবকৃষ্ণের বাড়ীতে সুসং আদর্শ বিদ্যানিকেতন ও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।জগৎকৃষ্ণের পুরো বাড়িটাই বর্তমানে বেদখল হয়ে গেছে।আর দশভূজা মন্দিরটি স্থানীয় পুজারীদের সহায়তায় সুন্দর পরিবেশে সুসজ্জিত হয়ে বর্তমানে কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে। চার ভাইয়ের মধ্যে শিবকৃষ্ণের রাজমুকুট ও সনদ ছিল। প্রজারা তাকে খুব পছন্দ করত।তারই বাড়ির পাশে ছিল নাট মন্দির ও রাজবংশীয় মেয়েদের ¯œানের মিঠাপুকুর।বর্তমানে এখানে মুক্তিযোদ্ধা অফিস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে ১৯৪২ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে মহারাজদের পরিবারগন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পাড়ি জমান।“১৯৫৪ সালে জমিদার প্রথা উচ্ছেদ আইন” প্রাদেশিক পরিষদে পাশ হলে মহারাজদের সম্পত্তি সরকারী নিয়ন্ত্রনে চলে আসে। দুআনি বাড়ির জমিদারগন ওয়ারিশ সূত্রে তালুক প্রাপ্ত ছিলেন। তারা বংশানুক্রমে পুত্র সূত্রে জমিদারী লাভ করেন নাই।দুআনি বাড়ির জমিদারীর বিস্বস্থ কর্মচারী ছিল শ্রী সাধু চরন দাস। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তার ছেলে স্বর্গীয় মধুসুদন দাস জমিদারের পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিকানা প্রাপ্ত হন।  সুসঙ্গ মহারাজার ফেলে যাওয়া স্থাবর অস্থাবর বসত বাড়ী বিশাল কমলা রানীর দিঘী ( সাগর দিঘী ) নাট মন্দির , মিঠাপুকুর , দুআনি বাড়ি , দশভূজা বাড়ি এলাকায় এখনও রাজ রাজার স্মৃতিময় কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে।  আজ রাজা নেই রাজ্যও নেই, নেই কোন পাইক পেয়াদা। রাজবাড়ির সম্মুখ দিয়ে এখন আর কাউকে জুতো হাতে নিয়ে ও ছাতা বন্ধ করে যেতে হয় না। শুনা যায় না রংমহলে নৃত্যের রুমঝুম শব্দ। শুধু রয়েছে তার স্মৃতি বিজরীত কিছু কির্তী।যা এখানে এলে আজও দেখা যাবে। যেভাবে যাবেনঃ ঢাকা টু বিরিশিরি ভায়া ময়মনসিংহ , মহাখালী বাসষ্ট্যান্ড থেকে। নাইট কোচ : বিশাল। ভাড়া : ৩৫০/= । কমলাপুর থেকে বলাকা এক্সপ্রেস  ট্রেন ময়মনসিংহ  হয়ে জারিয়া ঝাঞ্জাইল পর্যন্ত। ভাড়া ৮০ টাকা।সেখান থেকে টেম্পু , অটো , সি,এন,জি ও মটর যানে আসতে হবে বিরিশিরি হয়ে দুর্গাপুরে। ভাড়া ৩৫-৫০ টাকা।
যেখানে খাবেন ঃ বিরিশিরিতে আদিবাসী স্বর্না হোটেল, দুর্গাপুরে হোটেল নিরালা , হোটেল শান্ত , হোটেল দুলাল , হোটেল চম্পা ।
যেখানে থাকবেন ঃ বিরিশিরি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমী , ওয়াইএম সিএ, , ওয়াইডব্লুসিএ, আদিবাসী স্বর্না গেষ্ট হাউজ, ভাড়া ৫শ থেকে ১ হাজার টাকা। দুর্গাপুরে সাধারন হোটেলের মান অনুযায়ী : জবা গেষ্ট হাউস , হোটেল গুলসানে থাকা যাবে।