| |

বিপন্নপ্রায় তালগাছ প্রকল্পের মাধ্যমে সোনার বাংলার সৌন্দর্য্য ধ ও আর্থিক সমৃদ্ধি সম্ভব

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অপরূপ সৌন্দর্য্যরে এই সোনার বাংলা-স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। একাত্তরে স্বাধীনতার পর থেকে গাণিতিক হারে বেড়ে যাওয়া এদেশের মানুষ নিতান্তই জীবিকার তাগিদে জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় গাছপালা পর্যন্ত কেটে সাবাড় করে দিতে থাকে। পাশাপাশি বৃক্ষ রোপনের কোন উদ্যোগ না নিয়ে দেশের মানুষ দু’যুগেরও বেশী সময় ধরে আগ্রাসী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শুধু গাছপালা কেটেই গেছেন। সরকারী বন বিভাগের অসাধু স্বার্থপর কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় সরকারী বনাঞ্চলও উজার করে দেয়া হয়। এভাবে একেবারে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে সারা দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় হয়ে পড়ে দেশের মানুষ। টনকনড়ে দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারের। অবাধে বৃক্ষ নিধন বন্ধে আইন প্রনীত হয়। একই সঙ্গে দেশময় সরকারী নির্দেশে সর্বস্তরে শুরু হয় বৃক্ষরোপন অভিযান যাতে থাকে অধিকাংশ কাঠ জাতীয় গাছ। কিন্তু ইতোমধ্যে দেশীয় প্রজাতির ফলজ, ওষধি সহ উপকারী ও মূল্যবান বহু গাছ আমাদের প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। অনেক প্রজাতির গাছ বিপন্নপ্রায় হয়ে পড়ে। বিপন্নপ্রায় গাছগুলোর অনন্য সাধারণ হচ্ছে তাল গাছ। প্রকৃতিতে তালগাছ শুধু সৌন্দর্য্যরে প্রতীক নয়, একটি অর্থকরী সম্পদও বটে। কিন্তু ইদানিং প্রয়োজনীয় এই বৃক্ষ সচরাচর দেখা যায় না। প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় ও রাস্তার ধারে এর আঁটি রোপন করার পর যথাযথ পরিচর্যা করে বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে এর বিস্তৃতি ঘটানো সম্ভব। সুউচ্চ-দীর্ঘজীবি, ফল-ছায়া-জ্বালানী-সুমিষ্ট পানীয়-আসবাবপত্রের আয়োজন ও আশ্রয়দানকারী। তালপাতার মাদুর-পাখা-খেলনা সামগ্রী বাঙ্গালী সংস্কৃতির ঐতিহ্য। তালের শাঁস ও পাকাতালের রস অত্যন্ত সুস্বাদু-সুমিষ্ট-তৃপ্তিকর। মাটির ক্ষয় রোধ এবং পরিবেশের ভারসাম্য ও সৌন্দর্য্য রক্ষায় এই বাংলায় তালগাছের গুরুত্ব অপরিসীম। তালগাছের টাটকা রস আর রস দিয়ে তৈরী গুড়-পাটালী খেতে খুবই মজা ও স্বাস্থ্যকর। জেলেদের মাছ ধরার জন্য নৌকা, ঘরের মজবুত দরজা-জানালায়, কৃষকের লাঙ্গলে এ গাছের জুড়ি নেই। গাছটির পাতায় ঝুলন্ত বাবুই পাখির বাসা দেখতে আনন্দদায়ক।
জীবন জীবিকার নানা পেশাগত কাজের ফাঁকে ফাঁকে সুন্দর সমাজ গঠনে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি ও পরিবেশের ভারসাম্য সংরক্ষণে অনেকেই ব্রতী হয়ে থাকেন। এমনি ভাবেই ব্রতী হয়ে ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন গফরগাঁও উপজেলার লংগাইর গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য প্রেমিক ও সমাজ সেবক কৃষক লীগ নেতা মোঃ রফিকুল ইসলাম। উদ্যোগ সফলে তিনি-‘মানুষের কল্যাণে আমি-তালগাছ, বিলুপ্ত প্রায় বৃক্ষ, আমাকে বাঁচিয়ে রাখো-প্রিয়জনপদ, মানুষে ও বৃক্ষে হোক সুনিবিড় সখ্য’।
এই লাইন দুটি অনুভবে নিয়ে দেড় যুগ আগে ১৯৯৭ ইং সালে গ্রহন করেন ব্যতিক্রমী “তালগাছ রোপন প্রকল্প”। নিজ এলাকার মাইজ বাড়ি বাজার হতে কান্দিপাড়া বাজার পর্যন্ত এলজিই ডি’র ২ কিলোমিটার রাস্তার দু’পাশ এবং এই বড় রাস্তা হতে নিজ বাড়ী পর্যন্ত ২৬০ মিটার রাস্তার দু’পাশে তালগাছের বীজ তালের আঁটি রোপন করেন। স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় আনুষ্ঠানিক ভাবেই তিনি তার ব্যক্তিগত এই প্রকল্পটির কাজ শুরু করেন। আঁটি রোপনের পর থেকে টানা ৩ বছর পরিচর্যায় প্রত্যেকটি আঁটি থেকে চারা গজিয়ে মাত্র কয়েক ফুট উঠতেই ওগুলোর উপর নেমে আসে অনাকাংখিত এক দুর্যোগ-রাস্তা প্রশস্ত-কারণ কাজ। দু’পাশে প্রচুর নতুন মাটি ফেলায় তালের অনেক চারা চাপা পড়ে। রাস্তায় পাকাকরণ কাজও চলে। পেরিয়ে যায় পুরো তিন বছর। নষ্ট হয়ে যায় অধিকাংশ চারা । হাল ছাড়েননি নিঃস্বার্থ প্রকৃতি প্রেমিক-বৃক্ষ প্রেমিক রফিকুল ইসলাম। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তিনি তালের মৌসুম শেষে ফের লেগে যান আঁটি সংগ্রহে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি রোপন করেন ১ হাজার ২শ’ আঁটি। বিগত ২০০০ইং সালে তালগাছ পুনঃরোপন প্রকল্প কাজ উদ্বোধন কালে ৪ অক্টোবর প্রকল্প এলাকায় উপস্থিত থেকে নিজ হাতে আঁটি রোপন করেন তৎকালীন জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ। দীর্ঘ ১৩ বছরে সৌন্দর্য্য প্রেমিক বৃক্ষ প্রেমিক মোঃ রফিকুল ইসলামের তালগাছ প্রকল্প সফলের দিকে চলতে থাকে। প্রকল্পের প্রতিটি গাছ ডানা-পালা মেলে দীর্ঘাঙ্গী রফিকুলের মাথা ছাড়িয়ে সুউচ্চে উঁকি দিতে শুরু করে । সেই সঙ্গে ছড়িয়ে দেয় সবুজ সৌন্দর্য ও শীতল ছায়া। বর্তমানে গাছ গুলো বেশ বলবান হয়েছে এবং অধিকাংশ রফিকুলের দ্বিগুনসম উচ্চতায় উঁকি দিচ্ছে আকাশে। যে কেউ এই পথে যান চেয়ে চেয়ে দেখেন সজীব-সুঠাম গাছগুলো। জুড়িয়ে নেন নয়ন-মন দুই’ই।
আর ২/৩ বছরের মধ্যেই প্রতিটি তালগাছ সবগাছ ছাড়িয়ে আকাশ ছুবে ছুবে। সফল ব্যক্তিগত এই প্রকল্পের ফল রফিকুল ইসলাম সরাসরি না পেলেও জাতীয় স্বীকৃতি পাবেন কি না জানেন না। তাতেও তাঁর দুঃখ নেই-কষ্ট নেই। হাতে গড়া প্রকল্প দেখে তিনি অত্যন্ত আনান্দিত-উৎফুল্ল। ইদানিং ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথের দু’পাশ দেশের বিভিন্ন স্থানে তালের আঁটি রোপনের প্রকল্প হাতে নেয়ায় তিনি আরো আনন্দিত। রফিকুল জানান, এই ফল আমি ভোগ করতে না পারলেও আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম ভোগ করবে। এই সম্পদ প্রজন্ম ছাড়াও রাষ্ট্রীয় সম্পদ। তিনি আরো বলেন, তৎকালীন ঢাকা বিভাগীয় অতিরিক্ত কমিশনার মির্জা আল ফারুকের অনুপ্রেরনায় ও উপস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদী এই প্রকল্পটি গ্রহণ করি। প্রকল্পটির সঠিক পরিচর্যা রক্ষানাবেক্ষণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে প্রকল্পটির উপর উপজেলা প্রকৌশলী, এলজিইডি, গফরগাঁও, ময়মনসিংহের সঙ্গে বিগত ২১/০৫/২০০৫ইং সালে তার একটি চুক্তিপত্রও স্বাক্ষর হয় বলেও তিনি জানান। উপজেলা প্রকৌশলী ও প্রকল্পের হোতা মোঃ রফিকুল ইসলামের মধ্যকার এই চুক্তিনামায় বন্টন নীতিমালা সহ ১০টি শর্ত রয়েছে। শর্তমতে চললে প্রকল্পটি সফল ও সমৃদ্ধ হবে। রফিকুল ইসলামের শেষ কথা হলো, রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি-উন্নতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নতি সমৃদ্ধির জন্যে আমাদের প্রত্যেকেই তালগাছ, খেজুরগাছ সহ বিপন্নপ্রায় সকল প্রকার দেশীয় বৃক্ষাদির উপর এরূপ প্রকল্প হাতে নেয়া উচিত। তিনি আরো বলেন উক্ত প্রকল্পের তালগাছের পাতা কে বা কারা যখন খুশী তখন কেটে ফেলেছে। তাতে তালগাছের চরম ক্ষতি হচ্ছে। তালগাছের প্রকল্পের ক্ষতি সাধন না করার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানান। তিনি প্রত্যেককে কমপক্ষে তিনটি তালের আঁটি রোপনের জন্যও সকলের প্রতি আহবান জানান।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও বৃক্ষ প্রেমিক রফিকুল ইসলামের তালগাছ রোপন প্রকল্পের গাছগুলো দ্রুত বাড়ছে। ছবিতে ইনসেটে রফিকুল ইসলাম। ছবিঃ স্বদেশ সংবাদ