| |

মিষ্টির জগতে অনন্য নাম ‘শ্রীকৃষ্ণের কালোজাম’

সৌমিন খেলন : গল্প নয় এটাই সত্যি! একটি মিষ্টি তৈরি করতে লেগেছিল তিনবছর সময় আর খরচ হয়েছিল প্রায় চার লাখ টাকা! ওই তিনবছর সময়ে দিনরাত জ¦লন্ত আগুনের কাছে পড়ে থেকে লিটন করেছেন ‘গবেষণা’ আর অক্লান্ত পরিশ্রম। অথচ নেত্রকোনার জনপ্রিয় সেই ‘শ্রীকৃষ্ণের কালোজাম’ নামের মিষ্টি প্রতি পিসের দাম বিশ ও কেজি হিসেবে দুইশ টাকা মাত্র। এ মিষ্টি দেশ ও দেশের বাইরে নেত্রকোনার জন্য ব্যাপক সুনাম ও প্রশংসা কুড়িয়েছে। রসে ভরপুর তুলতুলে কালোজাম মিষ্টি মুখে দিলে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো মিলিয়ে যায়! এক-দুই পিস খেয়ে কোনোভাবে তৃপ্ত হওয়া সম্ভব নয়। একসাথে দশ বারটি মিষ্টি একাই তৃপ্তিসহ খেয়ে ফেলা সম্ভব। কেন না শ্রীকৃষ্ণের কালোজামে কোনো প্রকার চিনির দানা থাকে না। অন্যসব কালোজামের ভেতরে থাকে গুঁটি আর শক্ত দানা। কিন্তু কৃষ্ণের কালোজামে তা একদমই নেই। দেশি গাভীর খাঁটি দুধ পেলে তবেই শ্রীকৃষ্ণের কালোজাম তৈরি করা সম্ভব। পাউডার মেশানো কিংবা ভেজাল দুধ দিয়ে এ মিষ্টি তৈরি করা সম্ভব নয় বলেই দাবি কারিগরের। দুধে কোনোপ্রকার ভেজাল থাকলে এই কালোজাম অন্যসব মিষ্টির মতোই চোঁচা, শক্ত আর স্বাদহীন হয়ে যায়। শ্রীকৃষ্ণের কালোজামে স্বাদ ও গুণগতমান বজায় রাখতে বিশেষ কিছু রসদ যোগ করা হয়েছে যা ব্যবসায়িক স্বার্থে কাউকে বলা হয় না। শহরের বারহাট্টা-মোহনগঞ্জ সড়কের শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের সত্ত্বাধিকারী লিটন মোদক। তিনিই রসেভরা মনকাড়া শ্রীকৃষ্ণের কালোজাম মিষ্টির জনক। পৈতৃক সূত্রে লিটন দোকানমালিক। দোকানের যাত্রা শুরু হয় আজ থেকে ৬০/৭০ বছর আগে। লিটন কালোজাম তৈরির ইতিবৃত্ত তুলে ধরে বলেন, শুরুতে জেলার বাইর থেকেও মোটা অংকের পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মিষ্টির কারিগর এনেও লাভ হয়নি। কোনো কারিগর এতো সুস্বাদু কালোজাম তৈরি করতে পারেনি। দিনের পর দিন শুধু অর্থই নষ্ট হয়েছে। শেষ পর্যন্ত হাল না ছেড়ে তিনি কালোজাম তৈরির চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নিজেই নেমে পড়লেন কারিগর হয়ে। দিনরাত খেটে শুরু করে দিলেন গবেষণা। এ ভাবে তিনবছর সময় ব্যয় আর প্রায় চার লাখ টাকার মিষ্টি নষ্ট করে অবশেষে তিনি বিশেষ এই কালোজাম তৈরি করতে সক্ষম হন। তৈরির কৈৗশল সম্পর্কে তিনি জানান, খাঁটি দুধের ছানা, ময়দা, চিনি ও ডালডা প্রথমে একসাথে মেশানো হয়। সাদা রঙ ধারণ করলে গুছি কেটে মিষ্টি আকৃতিতে নিয়ে আসা হয়। অন্য দিকে বড় কড়াইয়ে গরম হতে থাকে তেল। গুছি কাটা সম্পন্ন হলে সেগুলো কড়াইয়ের গরম তেলে ১০-১৫ মিনিট ভালো করে ভাঁজা হয়। ভাজার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আগুনের তাপ সমান দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। সেজন্যে শুরুতেই আগুনের তাপ বুঝেশুনে দেওয়া উচিৎ। যেন পরে তা কমাতে বাড়াতে না হয়। মিষ্টিতে বেশি সুঘ্রাণ পাওয়া যায় যদি ভাজার সময় কিছুটা ঘি ও ডালডা ব্যবহার করা যায়। ভাজার সময় সাদা গুছি ধীরেধীরে রঙ বদলাতে থাকে। কৃষ্ণের কালোজাম মিষ্টিতে কোনো কৃত্রিম রঙ মেশানোর প্রয়োজন হয় না। তেলে ভাজা হয়ে গেলে ছাড়তে হবে অন্য এক কড়াইয়ে। যে কড়াইয়ে তৈরি করা আছে চিনির শিরা। এখানেও মিষ্টিটা রেখে দিতে হবে ১০-১৫ মিনিট। নির্দিষ্ট সময় চলে গেলে উঠিয়ে ফেলতে হবে চিনির শিরা থেকে। এভাবেই তৈরি হয়ে যায় কৃষ্ণের কলোজাম মিষ্টি। ক্রেতার হাতে মিষ্টি তুলে দেয়ার সময় কালোজামে ছিটিয়ে দেওয়া হয় দুধ থেকে তৈরি মাওয়া। যা মুখের রুচি বাড়ানোর পাশাপাশি মিষ্টির শোভাবর্ধন করে। দিন যত বাড়ছে কৃষ্ণের কালোজাম মিষ্টির পরিচিতি আর সুনামও বাড়ছে। খোঁজ পেয়ে প্রতিদিন কোনো না কোনো জেলা থেকে মিষ্টির অর্ডার দিতে আসছেন অনেকেই। এমনই একজন ময়মনসিংহের নন্দীবাড়ির উজ্জ্বল সেন। তিনি বলেন,কিছুদিন আগে আমার বন্ধুরা নেত্রকোনায় বেড়াতে এসে কৃষ্ণের কালোজাম মিষ্টির সন্ধান পায়। নিজেরা খেয়ে সাথে কিছু নিয়ে যায় আমাদের জন্যে। যদিও আমি তখনও কালোজাম কখনো খেতাম না। কিন্তু সকলের মুখে প্রশংসা শুনে আর কালোজাম দেখে লোভ ধরে রাতে পারলাম না। তারপর খেয়েদেয়ে আমি তো অবাক! অন্যান্য কালোজামের সাথে এর কোনো তুলনাই হয় না। অপর বন্ধু রাতুল ইসলাম রাহাত বলেন, পরিবারের সদস্যরা কালোজামের প্রশংসা শুনে খাওয়ার বায়না ধরেছে তাই নিতে এসেছি। নিজে খাওয়ার পর মনে হয়েছে কৃষ্ণের কালোজাম যত পরিচিতি পাবে তত দ্রুতই বিখ্যাত হয়ে উঠবে। নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শামসোজ্জোহা বলেন, কৃষ্ণের কালোজামমিষ্টি আমি খেয়েছি। এ মিষ্টি আমার দীর্ঘদিনের ধারণা বদলে দিয়েছে। আমি ভাবতাম মানসম্মত কালোজাম কেউ কোনোদিন তৈরি করতে পারবে না। কিন্তু না, লিটন আমার শুধু ধারণাই পাল্টে দেয়নি সে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে সবাইকে। সবশেষে লিটন মোদক জানান, কালোজাম তৈরি প্রথমে তার জন্যে চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু কালোজাম বিক্রি করে এখন তার নামধাম ও ব্যবসা দিনদিন অগ্রগতির পথে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও লিটন কালোজাম মিষ্টি সরবরাহ করেছেন।