| |

শুভ জন্মাষ্টমীর আলোচনায় বিভাগীয় কমিশনার- শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ অনুসরণে সুখী সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনে অবদান রাখা সম্ভব

স্টাফ রিপোর্টার ঃ দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের মধ্যদিয়ে অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি আনয়ন কারী, মানব প্রেমের অমিত বানী প্রচারকারী, পরমাত্মার সঙ্গে জীবাতœার মিলনকারী সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্ত-বিশ্বাসীদের প্রাণপুরুষ প্রেমাবতার-মহাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে গতকাল সোমবার (১৪ আগস্ট) সকালে ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ি মন্দির প্রাঙ্গনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনা শেষে সেখান থেকেই বের করা হয় জন্মাষ্টমীর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ওই মন্দির প্রাঙ্গনে ফিরে এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় বিভাগী পর্যায়ের কর্মকর্তা, জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গ, সাংবাদিকসহ বিপুল সংখক সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেন। জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা বের করার আগে মন্দির প্রাঙ্গনে সর্বজনীন জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক এডভোকেট রাখাল চন্দ্র সরকারের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার জিএম সালেহ্ উদ্দিন। তিনি বলেন, আজ থেকে সাড়ে ৫ হাজারের অধিক বছর আগে সভ্যতা, মানবতা ও কল্যানের জন্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই মর্তে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সমাজে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নতুন সুন্দর সমাজ বিনির্মানের লক্ষ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম। তাঁর অপরাজেয় আদর্শকে অনুসরণ করে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজকে একটি সুখি সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রগঠনে অবদান রাখতে হবে। যেন আমরা সকলে মিলে একে অপরের ধর্মানুষ্ঠান উপভোগ করি পালন করি। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক দেশ। আসুন আমরা এক সঙ্গে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাই এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনে অবদান রাখি।
বিশেষ অতিথি ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজি শ্রী নিবাস চ্দ্র মাঝি বলেন কংশের কারাগারে বসুদেব ও দেবকীর ৭টি সন্তানকে হত্যার পর ৮ম বারে শ্রী কৃষ্ণের জন্ম হয়। পালিত হন যশোদার কোলে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এমনি সময়ে জন্ম গ্রহণ করেন যখন পৃথিবীতে অন্যায়কারী-অত্যাচারী-পাপকারীদের রাজত্ব চলছিল। শ্রীকৃষ্ণ জরাসন্ধ ও কংশের মতো হিংস্র রাজাদের বধ করেন। তিনি দুষ্টদের দমন ও সাধুজনদের রক্ষার জন্যই আবির্ভূত হন। পৃথিবীতে যখন ধর্মের গ্লানি অধর্ম প্রকট হয়ে ওঠে এবং অন্যায় অত্যাচার-অসুরবৃত্তি বেড়ে যায় তখনি শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হন। এভাবেই যুগে যুগে তাঁর আগমন। দ্বাপর যুগে তিনি সাধুদের পরিত্রাণ আর ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য আসেন। নিবাস মাঝি আরো বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এদেশের মানুষ একে অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সকল মানুষ একে অপরের ধর্মানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকেন। আমাদের সকলকে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন অন্য ধর্মে ব্যাঘাত বা আঘাত হয় এমন আচরণ না করি। সম্প্রতি ফেইসবুক ব্যবহার করে উসকানী ও ধংসাত্মক কান্ড ঘটানো হয়েছে। ফেইসবুক ব্যবহার কারীদের মধ্যে এমন কতক দুষ্ট প্রকৃতির লোক আছে যারা অন্যের ফেইসবুক ব্যবহার করে উসকানী মূলক বক্তব্য দিয়ে সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টিকরে ইতরসুখ গ্রহণ করে। সাবধান করে দিতে চাই কারো ফেইসবুকে এরূপ কিছু পাওয়া গেলে আমরা তা কঠোরভাবে প্রতিহত-দমন করবো। দুষ্কর্ম ও অপরাধ চিরতরে নির্মূল করবো। অপরাধ করে কেহ পার পাবেনা। জাতীয় শোকের মাসের আজকের এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যগনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছি।
বিশেষ অতিথি জেলা প্রশাসক মোঃ খলিলুর রহমান বলেন, যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষকে সত্য, ন্যায়, সুন্দর ও শান্তির পথ দেখিয়ে গেছেন। তিনি সকল অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করে বিশ্বে ন্যায় শান্তি শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করেন। আসুন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সকল মানুষ মিলে মিশে কাজ করে সমাজ তথা দেশকে আরো উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাই। জেলাপরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান বলেন, বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠদের অনেক দায়-দায়িত্ব রয়েছে। সকলে যেন একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করি। আমরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে দেশকে বিশ্বদরবারে মাথা উচু করে দাঁড়াবো। সর্বস্তরের সকলে মিলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে তাঁর উত্তরসুরী হয়ে দেশের জন্য কাজ করবো।
পৌরসভার মেয়র ইকরামুল হক টিটু বলেন, শ্রীকৃষ্ণ প্রেম ও শান্তির বাণী নিয়ে এই ধরাধমে এসে ছিলেন। তিনি অসুরদের ধ্বংস করে পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন করেছিলেন। আসুন আমরা সৃষ্টির সেরা মানুষ হিসেবে সমাজের কল্যানে এই মহামানবের পথ অনুসরণ করি। সকল অসুরদের বিনাশ করি। ১৯৭৫-এ কতিপয় অসুর আমাদের বাঙ্গালী জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে অসাম্প্রদায়িক নীতির পথ দেখিয়ে গেছেন। আসুন আমরা জাতির পিতার সেই আদর্শের পথ অনুসরণ করি। ময়মনসিংহের মানুষ আদিকাল থেকেই সম্প্রীতির মধ্যেই বসবাস করে আসছেন। ভবিষ্যতেও এভাবে চলবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার) নুরে আলম বলেন, অধর্ম ও দুষ্টের বিনাশ করে জগতে সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম দেবকীর কোলে। জন্মের পর থেকেই তিনি অসুর আর অধর্মকে বিনাশ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে লিপ্ত হন।
মহানগর আওয়ামীলীগ সভাপতি এহতেশামুল আলম বলেন, আমরা ময়মনসিংহের মানুষ একে অন্যের ধর্ম কিংবা রাজনৈতিক বিষয়েও সহনশীল শ্রদ্ধাশীল। এখানে কখনো ধর্ম নিয়ে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এখানকার সকল ধর্মমতের মানুষ এক সঙ্গে একে অপরের ধর্মানুষ্ঠানে স্বতস্ফুর্ত অংশ গ্রহণ করে থাকেন।
জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্ট্রান ঐক্যপরিষদ নেতা এডভোকেট বিকাশ রায় উপস্থিত সকলকে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, ময়মনসিংহেরমানুষ অসাম্প্রদায়িক বলেই ধর্ম নিয়ে এখানে কখনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। দেশের কোন কোন স্থানে অসুর প্রকৃতির কতিপয় লোক নিরীহ মানুষের প্রতি অন্যায় আচরণ করে থাকলেও বর্তমান সরকার অসাম্প্রদায়িক। স্থানীয় এমপিদেরকে এসব বিষয়ের লক্ষ্য রাখতে হবে।
জেলা মটর মালিক সমিতির সভাপতি মমতাজ উদ্দিন মন্তা বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আমাদের সকলকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে চলতে হবে। আমরা ময়মনসিংহ বাসী সকলে মিলেমিশে ধর্মকর্ম পালনে আনন্দ উপভোগ করে থাকি। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে ধর্ম যার যার উৎসব সকলের।
আলোচনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মহানগর পূজা উদযাপন কমিটির আহবায়ক শ্রী প্রদীপ ভৌমিক, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ মহানগর শাখার আহবায়ক এডভোকেট প্রশান্ত দাস চন্দন, সদস্য সচিব শ্রী পবিত্র রঞ্জন রায়, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক এডভোকেট পীযুষ কান্তি সরকার, পূজা উদযাপন পরিষদ মহানগর শাখার সদস্য সচিব শ্রী উত্তম চক্রবর্তী রকেট প্রমুখ। আলোচনার শুরুতে পবিত্র গীতা থেকে পাঠ করেন দুর্গাবাড়ি মন্দিরের পৌরহিত শ্রী অরুণ ভট্টাচার্য্য। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ সদস্য সচিব শ্রী শংকর সাহা।