| |

জামালপুরে ইরি-বোরো নেকব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত॥কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শঙ্কিত কৃষক

এসএম হালিম দুলাল ॥ ইরি-রোবো সোনালি ফসল নিয়ে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন যেন দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। ইরি- বোরো ধানে ক্ষতিকারক ‘নেকব্লাস্ট’ রোগের সংক্রমণ ক্রমশই ছড়িয়ে পড়ছে। কৃষি কর্মকর্তারা যথাসাধ্য চেষ্টাও চালাচ্ছেন কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। মাঠেই ফসল মরে যাওয়া দৃশ্য দেখে নীরবে চোখের জল ফেলছেন কৃষকরা। চাষীর স্বপ্নভঙ্গের সঙ্গে দেখা দিয়েছে লক্ষ্য মাত্র অর্জনে দেখা দিয়েছে নানা সংশয়।
জামালপুর সদও,দেওয়ানগঞ্জ,বকসিগঞ্জ,ইসলামপুর,মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী এই ৭টি উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা বিআর-২৮ জাতের ধান আবাদের পাশাপাশি অন্যান্য জাতের ধানও আবাদ করেছেন তারা। বিগত বছর গুলোতে এই অঞ্চলে বিআর-২৮ জাতের ধান আবাদ করে ভাল ফলন পেয়ে তারা এবারও চাষ করেছেন। এ বৎসর হঠাৎ অধিকাংশ এলাকায় বিআর-২৮ জাতের ধান নেকব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে গাছ সাদা হয়ে ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। সর্বত্রই দেখা দিয়েছে এই রোগের প্রাদুর্ভাব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলারয় বিক্ষিপ্তভাবে ‘নেক ব্লাস্ট’ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাব ইসলামপুর উপজেলায়। পাথর্শী ইউনিয়নের বারেক মিয়া জানান, ৪ বিঘা জমিতে ২৮ জাতের ধান চাষ করেছি। অনেক শীলা বৃষ্টি হওয়ার পরেও ফলন ভালই হবে মনে করেছিলাম। কিন্তু গত কয়েকদিন আগে ক্ষেতে এসে দেখি, ধানের শীষ মরে যাচ্ছে এমনকি ধানের শীষ চিটা হয়ে গেছে। তাতে ফলন তো হবেই না বরং আবাদ করে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। এতে সারা বছর আমাদের পরিবার নিয়ে অনেক কষ্ট করতে হবে। ইসলামপুরের পাথর্শী গ্রামের সুলতান মিয়া জানান, ব্রি-২৮ ও ২৯ ধান প্রায় ৫ একর জমিতে চাষ করেছি। অন্য ধান কিছুটা ভাল থাকলেও ২৮ জাতের ধান মরে যাচ্ছে ও চিটা হচ্ছে। তবে আমাদের কৃষি অধিদপ্তর একটু খোজ খবর নিলে হয়ত এমন হতো না।
চিনাডুলী ইউনিয়নের ঘোনাপাড়া আব্দুর রহমান জানান, ক্ষেতে নতুন এই রোগটি প্রথমে দু-একটি শীষে দেখা যায় পরে কয়েকদিনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত ধান ক্ষেতে। তবে আমি কীটনাশক স্প্রে দিয়েছি কোন কাজ হয় নাই। আমার ৩ একর জমিতে এই রোগের আক্রমণে ক্ষেত নষ্ট হয়েছে।
এ ছাড়া সাত উপজেলাতে কিছু কিছু জমি আক্রান্ত হয়েছে। ইসলামপুরের কৃষক রজব আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন জমিতে সোনালী ধানের বদলে ‘চিটা’ হয়ে যাচ্ছে। আমার দেড়বিঘা মাটির ধান সব শ্যাষ হয়ে গেল। এবারও দেনায় পরতে হবে। সরেজমিনে গিয়ে আরো দেখা যায়, চিনাডুলী ইউনিয়নের দেলীর পাড় গ্রামে কৃষক সমশের আলী বলেন আমি ৩ একর জমিতে ব্রি-২৮ জাতের ধান চাষ করেছিলাম। নেকব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে ধানের শীষে চিটা হয়ে গেছে তাই নিরুপায় হয়ে ধান কর্তন করে খড় হিসাবে বিক্রি করছি।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানাযায় জেলার ৭টি উপজেলায় এবার ১লাখ ২৮হাজার ৯শ ৫ হেক্টও জমিতে ইরি-বোরো ধানের চাষাবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু চাষাবাদ করা হয়েছে ১লাখ ৩১হাজার ৮শ ৩০ হেক্টর জমিতে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২হাজার ৮শ ৭৫ হেক্টর বেশী জমিতে। উৎপাদন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭লাখ ৮৫হাজার ২শ ৬৫ মেট্রিক টন ধান। এ পর্যন্ত সারা জেলায় কম পক্ষে ৩০ হেক্টর জমিতে নেক ব্লাস্ট’ রোগে আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত্য হয়েছে। তাতে ৯০ মেট্রিক টন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কৃষি বিভাগ সুত্রে জানাযায় এ রোগে আক্রান্ত হলে প্রথমে পাতায় ডিম্বাকৃতির দাগ দেখা যায়, যার দুই প্রান্তে লম্বা হয়ে চোখের আকৃতি ধারণ করে। দাগের মধ্যভাগ ছাই রঙের ও বাইওে গাঢ় বাদামি হয়। অনেক দাগ একত্রিত হলে পাতাটি মরে যেতে থাকে। সে সময় ধান পুষ্ট না হয়ে বরং শীষের সব ধান চিটা হয়ে যায়।
এব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত উপপরিচালক(শস্য) মো.নূরুজ্জামান বলেছেন, এ ধরণের রোগ দেখা দেওয়া মাত্র জমিতে সব সময় পানি ধরে রাখতে হবে। রোগ দেখা দিলে বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাশ সার প্রয়োগ করে সেচ দিতে হবে। এছাড়া প্রতি লিটার পানিতে ছত্রাকনাশক (টেবুকোনাজল ৫০% ট্রাইফ্লুক্সিট্রোবিন ২৫%) যেমন: নাটিভো ৭৫ ডব্লিউপি ০.৬০ গ্রাম মিশিয়ে বিকেলে স্প্রে করতে হবে। অথবা প্রতি লিটার পানিতে ট্রাইসাইক্লাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন: ট্রপার ৭৫ ডব্লিউপি বা জিল ৭৫ ডব্লিউপি ০.৮১ গ্রাম ছত্রাকনাশক মিশিয়ে বিকেলে স্প্রে করতে হবে। পরবর্তী সতর্কতা হিসেবে, আক্রান্ত ক্ষেত থেকে বীজ সংগ্রহ না করা এবং ধান কাটার পর শুকিয়ে নিয়ে নাড়া জমিতেই পুড়িয়ে ফেলার কথাও বলছে তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক জেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, এ রোগে যাতে ধান ক্ষেত আক্রান্ত না হয় সেই জন্য আমরা সঠিক সময়ে কৃষকদের পরামর্শ ও প্রচারপত্র বিলি করেছি। ভুক্তভোগী কৃষকরা জানিয়েছেন, ওষুধ দিয়েও কোন কাজ হচ্ছে না।