| |

হারিয়ে যাচ্ছে কেন্দুয়ার “বিল বাওয়া” উৎসব

মোঃ মহিউদ্দিন সরকার,প্রতিনিধি ঃ খাল-বিল-হাওর বেষ্টিত নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বিল পাড়েরর মানুষের শীতকালীন মাছ ধরার একটি কার্যক্রমকে বলা হতো “বিল বাওয়া” উৎসব। কালের বিবর্তনে এবং প্রভাবশালীদের বিল দখল, অবৈধ পাগাড় (ছোট পুকুরের মতো) এবং লিজ নামক যাতাঁকলে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে এই উৎসব। অথচ নবান্নের প্রাক্কালে কার্তিক মাসের প্রথম শনিবার থেকে শুরু করে শেষ মঙ্গলবার পর্যন্ত বিল পাড়ের মানুষের মাঝে মাছ ধরা এই উৎসবকে গ্রামীণ আনন্দের সাথে বিনোদনেরও একটি মাধ্যম মনে করা হতো, যা এখন শুধুই স্বপ্নের মতো। কেন্দুয়া সদর হতে অল্প দূরে রয়েছে বেশ কয়েকটি বিল। যে বিলগুলোতে ৯০ দশকেও এ উৎসব প্রচুর হতো। এক সময় দেশিয় প্রজাতির মাছে টইটুম্বর ছিল যে বিলগুলো তা হচ্ছে ভুগিয়ার বিল, বারুক বিল, মরা বিল, কালিয়ান বিল, ইছামতি বিল, অমাবশিয়া বিল, দারিয়ালী বিল, দেউড়ী বিল, বিলঘোড়াইল বিল, মজানী বিল ইত্যাদি। বিল বাওয়া উৎসবের প্রবীণ মাছ শিকারী আরশ মিয়া, ফজু রহমান, জাহের উদ্দিন, শৈলেন সরকার, বীরদর্শন দাস, মিয়ার বাপ, সামছু মিয়া, ছমেদ আলী, নূরু মিয়া জানান, এক সময় কার্তিক মাস শুরু হলেই বিভিন্ন হাট-বাজারে ঢোল পিটিয়ে মাছ শিকারীদের বিল বাওয়ার উৎসবে দাওয়াত দেয়া হতো। ঢোল বাদকেই জানিয়ে দিত কোন্ দিন কোন্ বিল বাওয়া হবে। দূর গাঁয়ের মাছ শিকারীরা আগের দিন রাতে এসে এবং বিল পাড়ের শিকারীরা মাছ শিকারে নানা উপকরণ যেমন, স্থানীয় ভাষায় ঝুপড়া, চুপড়া, পলো, কুচ, টাকজাল, কুনিজাল, ঠেলা জাল ইত্যাদি নিয়ে বিল পাড়ে অবস্থান করতেন। রাত শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটার সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের আওয়াজ করে বিলের পানিতে নেমে পড়তেন শিকারীরা। দুই থেকে তিন ঘন্টা বিল বাওয়ার পর প্রচুর মাছ নিয়ে বাড়ী ফিরতেন সহস্রাধিক শিকারী। একজন শিকারীর সঙ্গে একাধিক সহযোগী থাকতেন। তারা মাছ ধরে বিল থেকে পাড়ে এনে মজুদ রাখতেন। বিল বাওয়া শেষ হলে বাঁশের লাঠির মাথায় হলুই (লোহার বড় সুঁই) দিয়ে গেথেঁ কাধেঁ করে বাড়ি ফিরতেন শিকারীরা। এ মাছ শুকিয়ে শুটকি দিয়ে সারা বছর চাহিদা পূরণ করা হতো। দল বেধে শিকারে যাওয়া মাছ শিকারীদের সে দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। গ্রামীণ ঐতিহ্য অনেক কিছুর মতো বিল বাওয়া উৎসবের এই ঐতিহ্যটিও হারিয়ে যাচ্ছে।