| |

শেরপুরে কমিটি গঠন নিয়ে মাদ্রাসায় হামলা আ’লীগের দু’গ্রুপে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ, আহত ২০

শেরপুর থেকে আলমগীরঃ শেরপুর জেলা শহরের প্রধান ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তেরাবাজার জামিয়া সিদ্দিকিয়া মাদ্রাসার ত্রি-বার্ষিক সাধারণ সভা ও কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের বিবদমান দু’গ্রুপের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার দুপুরে তেরাবাজার মাদ্রাসায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও হামলার ঘটনায় তেরাবাজার সড়কটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ওইসময় হামলা এবং পুলিশের ৬২ রাউন্ড রাবার বুলেট ও ৫ রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপে ৩ পুলিশ কনস্টেবলসহ অন্ততঃ ২০ জন গুরুতর আহত হয়। আহতদের মধ্যে পুলিশ কনস্টেবল সমাপ্ত নখরেক (২৭), যুবলীগ কর্মী হাসান (২৪) ও গাজীরখামার এলাকার মনির (২৫) কে জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে দীর্ঘ প্রায় এক ঘন্টার প্রচেষ্টায় পুলিশ ওই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিলেও শহরে এখনও টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। হামলা-সংঘর্ষের আশঙ্কায় তেরাবাজারে পুলিশ মোতায়েনসহ শহরের টহল জোরদার করা হয়েছে।
জানা যায়, শনিবার সকাল ১১টায় তেরাবাজার জামিয়া সিদ্দিকিয়া মাদ্রাসার ত্রি-বার্ষিক সাধারণ সভা আহবান করা হলেও ওই সভা শুরু হয় দুপুর ১টার দিকে। প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আব্দুল ওয়াদুদ অদুর সভাপতিত্বে ওই সভায় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর রুমান, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছানুয়ার হোসেন ছানু, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট রফিকুল ইসলাম আধার, সদর উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যান বায়েযীদ হাছান, পৌর প্যানেল মেয়র আতিউর রহমান মিতুল, কাউন্সিলর রাশেদুল ইসলাম রানা, বিএনপি নেতা এটিএম আমির হোসেন, এসম শহীদুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন আমন্ত্রিত মেহমান অংশ নেন। প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম স্বপনের পরিচালনায় ওই সভা শুরুর আগেই আওয়ামী লীগের হুইপ আতিক বলয় সমর্থিত যুবলীগ-ছাত্রলীগের প্রায় ২ শতাধিক নেতা-কর্মী মাদ্রাসার বাহিরে ও ভিতরে অবস্থান নেয়। খবর পেয়ে রুমান-ছানু বলয়ের যুবলীগ-ছাত্রলীগের বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীও মাদ্রাসা অঙ্গণে পৌঁছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতির আশঙ্কায় মাদ্রাসায় সতর্ক অবস্থান নেয় পুলিশের শতাধিক সদস্য। ওই অবস্থায় সভা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই হুইপ আতিক বলয় সমর্থিত জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খন্দকার নজরুল ইসলাম, ফখরুল মজিদ খোকন ও মিনহাজ উদ্দিন মিনাল, সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ারুল হাসান উৎপল ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট আবুল কাশেম জিপিসহ কয়েকজন নেতা সভায় উপস্থিত হয়ে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ‘একপেশে’ নীতি গ্রহণ না করে সকলের মতামত নিয়ে কমিটি গঠনের দাবি জানান। তা নিয়ে মৃদু তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে যোহর নামাজের কারণে সভার কাজ মূলতবি করা হয়। এরই মধ্যে দু’বলয়ের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতি আরও বেড়ে গেলে দু’পক্ষের মধ্যে টানটান উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং শহরে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। এরপর নামাজ শেষে সুষ্ঠুভাবে সভার কাজ শুরু করতে মাদ্রাসার সাধারণ পরিষদের সদস্যদের রেখে বহিরাগতদের বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে কে বা কারা আগে বের হবে তা নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। ওইসময় কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত দেন যারা আগে আসছে, তারাই আগে বের হবে। এরপর বের হবে পরে যাওয়া লোকজন। ওই সিদ্ধান্তে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে ফের অসন্তোষ। তারপরও আগে প্রবেশ করা নেতা-কর্মীদের অধিকাংশ বেরিয়ে গেলেও অবশিষ্টদের সাথে মাদ্রাসা অফিস গৃহের বাইরে বাদানুবাদ ও হাতাহাতিতে জড়ায় দু’পক্ষের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশের পাশাপাশি সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন দু’বলয়ের উপস্থিত শীর্ষ নেতারা। ওই অবস্থায় জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মিনহাজ উদ্দিন মিনাল লাঞ্ছনার শিকার হন। ওই খবর বাইরে ছড়িয়ে পড়লে তার অনুসারীরা তেরাবাজার সড়কের দক্ষিণ দিক দিয়ে আক্রমণ করে মাদ্রাসায় উপুর্যপরি ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। অন্যদিকে বিপরীত বলয়ের আরও কিছু নেতা-কর্মী ওই সড়কের গোয়ালপট্টি হয়ে উত্তর প্রান্তে অবস্থান নেয়। ফলে আবারও দু’পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পৌঁছে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) খন্দকার খালিদ বিন নূর ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে আরও কিছু পুলিশ সদস্য। কিন্তু এরপরও হামলা অব্যাহত থাকলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়ে সকলকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেটে উভয় গ্রুপের অন্ততঃ ২০ জন আহত হয়। ফলে সভার কাজ শুরু না করতে পেরে আগামী শনিবার পর্যন্ত তা মূলতবি করা হয়।
এদিকে কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে তেরাবাজার মাদ্রাসা এলাকায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও রাবার বুলেট ছোড়ার ঘটনায় দ্রুত শহরে উদ্বেগ-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় দোকান-পাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। সেইসাথে বন্ধ হয়ে যায় যানবাহন চলাচলসহ সাধারণ মানুষের আনাগোনা। পুলিশের টহল জোরদারের কারণে প্রায় ঘন্টাখানেক পর থেকে ওইসব দোকানপাট আবার খুলতে শুরু করে।
লাঞ্ছিত হওয়ার বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মিনহাজ উদ্দিন মিনাল অভিযোগ করে বলেন, দু’পক্ষের পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে তিনি ওই লাঞ্ছনার শিকার হন। এজন্য তিনি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের এক ভাইসহ ২ যুবককে দায়ী করেন। অন্যদিকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর রুমান ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছানুয়ার হোসেন ছানু তার ওই অভিযোগের বিষয়ে বলেন, কঠিন কোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে গেলে ওরকম কোন বিপত্তি ঘটতেই পারে। এরপরও একজন সিনিয়র নেতার দাবি অনুযায়ী বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানে তাকে আশ্বস্ত করেই দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে তেরাবাজার মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল ওয়াদুদ অদু ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম স্বপন বলেন, মাদ্রাসার সকল কর্মকা-ে যারা সহযোগিতা করে আসছেন, তাদের নিয়েই সাধারণ সভা আহবান করা হয়েছিল। কিন্তু এতদিন যারা সহযোগিতা দূরে থাক, বিরোধিতা করে আসছিলেন তারাই সভা প- করতে ওই হামলার মত ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে।
এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৫ রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ও ৬২ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোড়া হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শহরে জোরদার করা হয়েছে পুলিশী টহল।