| |

পাঠদান না করিয়ে হাজিরা খাতায় সাক্ষর করেন তিনি ॥ বিদ্যালয়ে অনিয়মিত বেতন নেন নিয়মিত

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা ॥
বিদ্যালয়ে নিয়মিত হাজির না হয়ে ফাকা হাজিরা খাতায় একদিনে ২/৩ দিনের হাজিরার স্বাক্ষর দিয়ে ক্লাস না করিয়ে বিদ্যালয় থেকে চলে গেলেও মাস শেষে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন একজন সহকারী শিক্ষক। তিনি হলেন ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার চান্দের সাঁটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক রাহাত হোসেন শাকিল। উক্ত শিক্ষকের এসব অনিয়মের বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসরিন বিনতে ইসলাম।
স্থানীয় ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গৌরীপুর শহরের নয়াপাড়া মহল্লার বাসিন্দা রাহাত হোসেনে শাকিল ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর কর্মস্থলে তিনি চান্দের সাঁটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেন। সেখানে কয়েক বছর ভালোভাবে চাকরি করার পর হঠাৎ করেই বিদ্যালয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়েন তিনি। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করিয়ে প্রভাব খাটিয়ে হাজিরা খাতায় সাক্ষর করে মাস শেষে বেতন উত্তোলন করতেন। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আব্দুস সাত্তার রহস্যজনক কারণে এ বিষয়ে নিরব ভূমিকা পালন করতো। ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল নাসরিন বিনতে ইসলাম বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। এরপর তিনি রাহাতকে নিয়মিত বিদ্যালয় এসে পাঠদান করার নির্দেশ দেন। আর এতেই রাহাত ক্ষুব্ধ হয়ে প্রধান শিক্ষককে হুমকি দেয়। এরপর চলতি মাসেই রাহাত নিজের ব্যাক্তিগত ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানায় “আমার চাকরি ও আমার নিজের জীবনের কোনো ক্ষতি হলে এর জন্য দায়ী থাকবেন প্রধান শিক্ষক নাসরিন বিনতে ইসলাম ও তার চাচা আব্দুস সাত্তার। ওই স্ট্যাটাসে তিনি নিজের জীবন ভিক্ষা দেয়ার আকুতিও জানান”। পরক্ষণেই প্রধান শিক্ষক ওই স্ট্যাটাসের প্রতিবাদ জানিয়ে রাহাতের বিভিন্ন অনিয়ম ও হুমকির বিষয় নিয়ে নিজের ব্যাক্তিগত ফেসবুকে ওয়ালে স্ট্যাটাসে তুলে ধরলে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনে তোলপাড় হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছরের ৫ মে থেকে ১৬ মে পর্যন্ত পিটিআইয়ে প্রশিক্ষণে ছিলেন প্রধান শিক্ষক নাসরিন বিনতে ইসলাম। আর এই সুযোগে রাহাত হাজিরা খাতায় অগ্রিম সাক্ষর করেন। পরে বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার ইকবাল হোসেন ও মুজাহিদুল হক ঘটনার সত্যতা পেয়ে বিষয়টি লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করে খাতায় লিপিবদ্ধ করেন। সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখ বিকাল পৌনে চারটার দিকে বিদ্যালয়ে গিয়ে হাজিরা খাতায় সাক্ষর করতে চায় রাহাত। কিন্তু প্রধান শিক্ষক বাধা দিলে সে ওইদিন হাজিরা খাতার পাতা ছিড়ে নিয়ে আসে। ১৬ সেপ্টেম্বর উপজেলা শিক্ষা অফিসার মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খান মা সমাবেশ পরিদর্শন করতে গিয়ে বিদ্যালয়ে রাহাতকে অনুপস্থিত পান। রাহাত হেসেনের এসব অনিয়ম ও অনুপন্থিতির বিষয় উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে অবহিত না করার কারণে গত ১৭সেপ্টেম্বর প্রধান শিক্ষককে কৈফিয়ত তলব করেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার। ১৭ ও ১৮ সেপেটম্বরও বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন রাহাত হোসেন। এরপর ২০ সেপ্টেম্বর উপজেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর রাহাতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে লিখিত অভিযোগ দেয় প্রধান শিক্ষক।
প্রধান শিক্ষক নাসরিন বিনতে ইসলাম বলেন, পাঠদান না করিয়ে মাস শেষে রাহাত বেতন উত্তোলন করে। তার অনিয়মের প্রতিবাদ করার কারণে কিছুদিন আগে সে হাজিরা খাতার পাতা ছিড়ে নিয়ে যায়। আমাকেও অকথ্য ভাষায় গাল-মন্দ করে হুমকি দেয়। বিষয়টি আমি মৌখিক ভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানালেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তাই তাকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থি থাকার কারণে শোকজের পাশাপাশি তার অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। এখন তার পরিবার আমাকে ঘটনা মীমাংসা করার জন্য বিভিন্ন ভাবে চাপ প্রয়োগ করছে।
এ বিষয়ে সোমবার দুপরে রাহাত হোসেন শাকিল সাংবাদিকদের জানান, আমি প্রধান শিক্ষকের শোকজের জবাব দিয়েছি। প্রধান শিক্ষক আমার বিরুদ্ধে যে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে সেটা মীমাংসা হয়ে গেছে। আমি আজ স্কুলের মা সমাবেশে আছি। প্রধান শিক্ষক আমার সাথেই আছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা অফিসার মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খান বলেন, রাহাতের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষক লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। বিষয়টি আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো। গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাহাতকে আমরা বিদ্যালয়ে পাইনি। বিনা অনুমতিতে তার কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় কারণ জানতে চেয়ে প্রধান শিক্ষককে শোকজ করে তিন কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
জেলা শিক্ষা অফিসার মোফাজ্জল হোসেন খান বলেন, রাহাত হোসেনর বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ে পাঠদান না করানো ও হাজিরা খাতায় সাক্ষর করে বেতন উত্তোলন করার অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এ বিষয়ে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।