| |

আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ -ড. দেওয়ান রাশীদুল হাসান, পি.এইচডি.

মানুষের জীবনে বার্ধক্যের বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। আজকের প্রবীণরাই আমাদের জন্ম দিয়েছেন, প্রতিপালন করেছেন, আর গড়ে তুলেছেন এই আধুনিক সমাজ, নগর সংস্কৃতি আর সভ্যতা। বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন প্রবীণ। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ অধিকাংশ প্রবীণ ব্যক্তিরাই ক্রমবর্দ্ধমান হারে অবহেলিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত এবং বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। প্রবীণের যুক্তি আর নবীনের শক্তি-দুইয়ে মিলে সমাজের মুক্তি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদ এবং চুক্তির ছায়াতলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রবীণ নাগরিকরা বর্তমানে অনেক সুরক্ষিত ও নিরাপদ।
আজ ০১ অক্টোবর ২৮তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এ বছর প্রবীণ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘Celebrating Older Human Rights Champions-2018’ অর্থাৎ ‘মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রবীণদের স্মরণ পরম-শ্রদ্ধায়।’ জাতিসংঘের আহ্বানে ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশে যথাযোগ্য মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে প্রবীণ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। মানবাধিকার সম্পর্কে জাতিসংঘে বক্তব্য পেশের জন্য ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের পতœী ও মানবতাবাদের প্রবক্তা এলিনর রুজভেল্টের সভানেএীত্বে মানবাধিকার সংক্রান্ত একটি কমিশন গঠিত হয়। প্রায় আড়াই বছরের অধিককাল পরিশ্রমের পর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ দলিলটি জাতিসংঘ মানবাধিকার সম্পর্কিত সার্বজনীন ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights) হিসেবে প্রকাশ করে। বিশ্বের সমস্ত সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত নীতিবোধ নিংড়ে নিয়ে জাতিসংঘ সর্বজনস্বীকৃত মানবাধিকার সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। ইতিহাসের আর কোন অধ্যায়েই রাজনৈতিক, নাগরিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিধিবিধান নির্ধারণে অতখানি যতœ ও মনোযোগ নিবদ্ধ করা হয়নি। মানবাধিকার সম্বন্ধে সার্বজনীন ঘোষণায় সংগঠন, প্রত্যক্ষভাবে বা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকারে অংশগ্রহণ, সরকারি চাকরি লাভের ক্ষেত্রে সমানাধিকার, বিশ্রাম ও অবসর যাপনের অধিকার, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বাস্থ্য রক্ষার অধিকার; রোগ, অক্ষমতা এবং বৃদ্ধবয়স ও বৈষম্যে নিরাপওা এবং অভাব থেকে মুক্তির অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী, ৬০ বছর বয়সী মানুষকে প্রবীণ হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশ সরকার দেশের ৬০ বছর ও তার অধিক বয়সীদের ‘জ্যেষ্ঠ নাগরিক’ বা ‘ সিনিয়র সিটিজেন’ ঘোষণা করে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। বিশ্বের উন্নত তো বটেই উন্নয়নশীল অনেক দেশের সরকার ৬০ বছরের উপর বয়সীদের জ্যেষ্ঠ নাগরিক (সিনিয়র সিটিজেন) হিসেবে অনেক আগেই মর্যাদা দিয়েছেন যাতে তাদের দেশের সিনিয়র সিটিজেনরা সম্মানের সঙ্গে জীবন যাপন করতে পারেন। এতে করে বহুলাংশে মর্যাদা বেড়েছে ওই সব দেশের। এ দিকটায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে ছিল। এখন সে যুগের অবসান হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, বয়স্কদের মৃত্যুর হার একদিকে যেমন কমেছে, অন্যদিকে গড় আয়ুও বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০৩০ সালে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যায় ২২ শতাংশ হবে প্রবীণ। ২০৪৪ সালে যা’ কমবয়সী জনগোষ্ঠীকে ছাড়িয়ে যাবে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে বাস করছে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ প্রবীণ। ২০২৫ সালে হবে এর সংখ্যা হবে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ, ২০৫০ সালে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ এবং ২০৬১ সাল নাগাদ হবে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ। আবার প্রবীণ জনসংখ্যার মধ্যে অতি প্রবীণদের (৮০+) বৃদ্ধি হার, মধ্যম প্রবীণ (৭০-৮০) এবং তরুণ প্রবীণদের (৬০Ñ৭০ বছর) চেয়ে দ্রুততর। ২০৫০ সালে এ দেশের শিশু প্রবীণের অনুপাত হবে মোট জনসংখ্যা ১৯:২০ শতাংশ। বিশ্ব প্রবীণ জনসংখ্যা আড়াই গুণ বেড়ে ২০২৫ সালে হবে ১২০ কোটি; আর ২০৫০ সালে প্রায় ২০০ কোটিতে দাড়াবে। সংখ্যায় যে শুধু প্রবীণরা দ্রুত বাড়ছেন তাই নয়, এদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর মতো পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক সক্ষমতা ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা-প্রযুক্তি, জীবন সচেতনতা এবং যাতায়াত-যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নয়নের ফলে মানুষের গড় আয়ুস্কাল অনেক বেড়েছে এবং বর্তমানে তা’ বেড়েই চলেছে। ১৯২১ সালে এ দেশের মানুষের গড় আয়ুস্কাল যেখানে ছিল মাত্র ২০ বছর, বর্তমান তা ৭০ ছাড়িয়ে গেছে। জীবনের সঙ্গে আমরা অতিরিক্ত বছর যোগ করতে পেরেছি, কিন্তু বাড়তি বছরগুলোতে জীবন যোগ করতে পারিনি। তবে বিজ্ঞানীরা বার্ধক্য জয়ের জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সামাজিক সম্মানবোধ ও মানবিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে, করুণা করে নয় বরং শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভালোবাসা আর সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই সকল সন্তান তথা দায়িত্ব প্রাপ্তদের প্রবীণদের সেবায় নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে হবে। অধিকারের প্রশ্নে নয়, বরং তাদের জীবনের শেষ ভাগ যেন সফল, সার্থক, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও আপনজনের সান্নিধ্যে কাটে তা’ নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হতে হবে। কারো জীবনের শেষ সময়টা যেন পরিবারহীন বৃদ্ধাশ্রমে না কাটে। আজ যাদের প্রবীণ বলা হচ্ছে, তাদের জীবনে আমরাও একদিন প্রবেশ করবো। আজকের সন্তান আগামি দিনের পিতা বা মাতা হবে । তাদের জগত আমাদের দেখানো পথেই চলবে। বৃদ্ধাশ্রম যেন কোন বাবা মায়ের শেষ বয়সের ঠিকানা না হয়।
নগর পরিবেশে প্রবীণদের অন্তভর্’ক্তি সুনিশ্চিত করতে হবে। অধিকার মর্যাদার ভিওিতে প্রবীণজনসহ সমাজের সব বয়সীদের নিয়ে সুন্দর নগর জীবন সুনিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘ উদাও আহবান জানিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার পিতাÑমাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। প্রবীণ ব্যক্তিরা কর্মময় জীবনে অত্যন্ত উৎসাহ উদ্দীপনায় এবং আন্তরিকতার সঙ্গে দেশ গঠনে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। প্রবীণদের জীবন সায়াহ্নে তাদের যথাযথ ভাবে দেখাশোনা এবং তাদের কল্যাণ বিধানে পদক্ষেপ গ্রহণ রাষ্ট্র,সমাজ ও পরিবারের অবশ্য কর্তব্য।
পরিবারের একান্তই আপন বাবা, মা, দাদা, দাদীদের প্রতি এভাবেই জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতে প্রতিনিয়তই আমরা বৈষম্য করে যাচ্ছি। এতে কেবল মাত্র প্রবীণরাই বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন তা’ নয়, আমরাও বঞ্চিত হচ্ছি, তাদের অভিজ্ঞতা ও সম্পৃক্ততার সুফল থেকে। এখানে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, এ দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রায় ৭০ বছর বয়সে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে দেশ পরিচালনা করছেন। বর্তমান অর্থমন্ত্রী ৮০ বছর বয়সে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। একইভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রবীণ রাজনীতিবিদগণ, শিক্ষাবিদগণ ও অন্যান্য পেশাজীবিরা যদি বয়স বৈষম্যের শিকার হয়ে কর্তৃত্বের চর্চা বা সক্রিয় না থাকতেন, হয়তো এদেশ অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হতো। সময় এসেছে অন্তত এটা নতুনভাবে অনুধাবন করার যে আমরা প্রবীণদের প্রতি বৈষম্য করছি এবং আমাদের এ চর্চা চলতে না দেয়া।
প্রবীণদের শেষ বয়সে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এদেশে একবারে সংকুচিত। উপরন্ত প্রবীণ বান্ধব শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে কোন পক্ষের কোন আগ্রহ নেই। গণমাধ্যম বিশেষত্ব সংবাদ, সিনেমা, নাটক এবং বিজ্ঞাপণ গুলোতে প্রবীণ মানেই সেকেলে, প্রবীণ মানেই সংকীর্ণতা, প্রবীণ মানেই অসুস্থতা এসব নেতিবাচক দিকগুলো হরহামেশা প্রতিফলিত হয়। প্রসঙ্গত যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এজিং এর এক গবেষণায় বলা হয়, সে দেশের টেলিভিশন প্রোগ্রামে মাঝে মধ্যেই প্রবীণদের এমনভাবে চিত্রায়িত করা হয় যে তাতে মনে হবে প্রবীণরা যেন কেবলই ধীরগতিসম্পন্ন, জরাগ্রস্ত, অসুস্থ এবং দুর্বল চিওের অধিকারী। আনন্দের বিষয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিউটে সম্প্রতি চালু করা হয়েছে ‘বার্ধক্য ও প্রবীণ কল্যাণ’ বিষয়ে ¯œাতকোওর প্রোগ্রাম।
আজকের নবীন আগামী দিনের প্রবীণ। বাধর্ক্যরে হাত থেকে বাচার কোনো সাধ্য না থাকার পরও নিজের বার্ধক্য সম্পর্কে কেউ যেন জানতে চান না, মানতে চান না, ভাবতে চান না। পাশাপাশি, প্রবীণদের কেউ দেখতে চান না, বুঝতে চান না, কাছে যেতে চান না, তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে চান না, প্রবীণদের কল্যাণে কাজ করতে বা টাকা পয়সা খরচ করতে কেউ আগ্রহী হন না। উন্নয়ন পরিকল্পনায় সরকারি কর্তৃপক্ষ অনেক সময় তাদের অধিকার সম্পর্কে নিশ্চুপ থাকেন। বর্তমানে বাংলাদেশে চাকুরি হতে অবসর গ্রহণের বয়স ৫৯ বছর আর গড় আয়ু ৭০ বছর। মাঝখানের এই ১০-১১ বছর দেশের অত্যন্ত মেধাবী, জ্ঞান দক্ষতা অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিশাল এক জনগোষ্ঠীর কর্মতৎপরতা আর তাদের অবদান হতে জাতি বঞ্চিত হচ্ছে।
পল্লী অঞ্চলের তুলনায় বাংলাদেশের শহরবাসী প্রবীণদের অবস্থা বেশি নাজুক। নগর, জনপদের প্রবীণদের পক্ষে যানবাহনে চড়া, অফিস আদালত, ব্যাংক, হাসপাতালে যাওয়া আসা, হাটা চলা করা, রাস্তা পার হওয়া, বাজারঘাট ও দৈনন্দিন কাজকর্ম করা অত্যন্ত কষ্টকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ । প্রবীণদের প্রাপ্য অধিকার, চাহিদা ও সামর্থ্যরে কথা কেউ গুরুত্ব দেয় না বলেই শহরের স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে এবং তা’ হচ্ছে প্রবীণদের জীবন চলার সম্পূর্ণ বিপক্ষে।
বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় সবাই আজ প্রবীণ। প্রবীণদের স্বস্তি, স্বাচ্ছন্দ্য, স্বাধীনতা, আত্মতৃপ্তি, সেবা যতœ ও দেখাশোনার বিষয়টি আজ খুবই ঝুঁকির সম্মুখীন। স্বচ্ছল প্রবীণদের পরিচর্যার জন্য পারিবারিক, সনাতনী, পেশাদার অথবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবাদানকারী ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সরকার যথেষ্ট প্রবীণবান্ধব। ১৯২৫ সালে বিট্রিশ প্রবর্তিত পেনশন ব্যবস্থার ৭২ বছর পরে প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী উদ্যোগে ১৯৯৭ সালে চালু করা হয়েছে বিশ্বনন্দিত বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি, অবসর গ্রহণের বয়স ৫৯/৬০ বছর করা
হয়েছে, অনুমোদিত হয়েছে বহু প্রতীক্ষিত ‘প্রবীণ বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা ২০১৩’ এবং পিতা মাতার ভরণ পোষণ আইন, ২০১৩। পাশাপাশি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘের দেশব্যাপী প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার বার্ষিক বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রবীণবান্ধব সরকারের দূরদর্শী চিন্তার ফলশ্রুতি।
প্রবীণ নর নারী জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের কিছু কার্যক্রম রয়েছে। সবচেয়ে বড় কার্যক্রমটি হচ্ছে বয়স্ক ভাতা, যার আওতায় সাড়ে ৩১ লাখ প্রবীণ নর নারীকে মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা দেয়া হচ্ছে।

বার্ধক্য সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি একেবারেই নগণ্য। একবিংশ শতাব্দীর প্রবীণদের জটিল সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের নিতে হবে বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারি প্রস্তুতি। প্রবীণ দারিদ্র্যÑপীড়িত পরিবারসমূহে সহজ শর্তে বিনা সূদে কৃষিঋণ ও আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মকান্ডে ঋণ প্রদান এবং রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা যাতে দরিদ্র পরিবারসমূহ অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে গড়ে উঠে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সেবাদানের জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, দরিদ্র প্রবীণদের জন্য স্বল্পমূল্যে অথবা বিনামূল্যে ডাক্তার দেখানো থেকে শুরু করে ওষুধ প্রদান, চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহ ও বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।

সম্মানিত প্রবীণদের অধিকারের দিকটি ভেবে এবং সবার বার্ধক্যের কথা মাথায় রেখে জাতিসংঘের ডাকে সাড়া দিয়ে আজকের এই দিনে আসুন নবীন প্রবীণ সবাই মিলে বাংলাদেশের প্রতিটি শহর নগর গঠন – পুনর্গঠন করি। শহর বন্দরে স্বস্তি, স্বাচ্ছন্দ্য এবং তৃপ্তির সঙ্গে প্রবীণদের বসবাস যদি আমরা সুন্দরভাবে নিশ্চিত করতে পারি, তবেই নগরজীবনে একদিন আমাদের বার্ধক্যও হবে সফল নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ। আসুন আমরা শপথ নিই, নগর জীবন থেকে প্রবীণদের বিচ্ছিন্ন করব না। তাঁদের নিয়ে সবাই মিলে আমরা এই দেশকে করব সব বয়সীর জন্য সমান সুরক্ষিত এবং উপভোগ্য এক অনিন্দ্য সুন্দর বাংলাদেশ।
জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন যাপন স্বাচ্ছন্দ্যময় করার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এবং তাঁদের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদেরকে সচেতন করাসহ নানাবিধ জটিল সমস্যা সমাধানে সম্মিলিতভাবে কাজ করার জন্য গত ১৪ জুলাই ২০১৮ ঢাকায় ‘বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরাম’ ( Bangladesh Senior Citizen Forum) নামক একটি ফেসবুক ভিওিক অরাজনৈতিক, অলাভজনক ও সেবামূলক সংগঠন প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। এই ফোরামের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সংগঠনটি দেশের সকল প্রবীণকে একটি পতাকাতলে আনার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে অধিকাংশ প্রবীণ নর নারীরা অবনতিশীল স্বাস্থ্য, আর্থিক দীনতা এবং সামাজিক নিরাপওাহীনতার মধ্যে বসবাস করছে। তাই, প্রবীণদের কল্যাণে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি এবং জনকল্যাণমূলক সংগঠনগুলোকেও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এমতাবস্থায়, নি¤œলিখিত সুপারিশমালা আইনে অর্ন্তভূক্তি করার জন্য প্রস্তাব পেশ করা হলো;
(১) পার্শ্ববর্তা দেশসমূহে প্রবীণদের জন্য বিদ্যমান আইন অনুসরণে প্রবীণ বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা – ২০১৩ এবং ভরণ- পোষণ আইন সংস্কার, সময়োপযোগী, উন্নত এবং আধুনিক করা যেতে পারে।
(২) সিনিয়র সিটিজনদের আর্থিক সমস্যা বিবেচনায় এনে গণ পরিবহনে (সড়ক, রেল, স্টীমার এবং বিমানপথ) তাদের জন্য আসন সংরক্ষণসহ কনসেশন রেটে টিকেট ৪০% অথবা ৫০% রেয়াত প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
(৩) সিনিয়র সিটিজেনদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য সরকারি-বেসরকারী হাসপাতালে বেড ও কেবিন সংরক্ষণসহ কনশেসন রেটে (ন্যূনতম রেটে ২০% ,৪০%) স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা করা যেতে পারে এবং একইভাবে কনসেশন রেটে ফার্মেসী হতে ঔষধ ও পথ্য সামগ্রী পাওয়ার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে । এর পাশাপাশি কনসালটেশনে অগ্রাধিকার ও কনশেসন রেট প্রবর্তন করা যেতে পারে।
৪) আর্থিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাংকে তাদের জন্য হেলপ ডেস্ক এবং পৃথক পৃথক কাউন্টার রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অনুরুপ সুবিধা বীমা এবং এন বি এফ আই (Non Bank Financial Instituion – NBFI) প্রতিষ্ঠান হতেও দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

(৫) বিভিন্ন সঞ্চয়ী স্কীম বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র স্কীমে, পুজিবাজারে,এবং সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত বিভিন্ন প্রকার বন্ড ও লাভজনক প্রকল্পে উচ্চতর হারে বিনিয়োগের সুযোগ প্রবর্তন করা যেতে পারে যাতে সিনিয়র সিটিজেনরা উপকৃত হতে পারে।
৬) সিনিয়র সিটিজেনদের কল্যাণে ‘প্রবীণ কল্যাণ সঞ্চয়পএ’ প্রবর্তনসহ ‘বাংলাদেশ প্রবীণ ওয়েলফেয়ার ব্যাংক’ নামে একটি বিশেষায়িত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।
(৭) সার্কিট হাউজ, ডাক বাংলো, পর্যটন মোটেল এবং বেসরকারি হোটেল-রিসোর্টে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য হ্রাসকৃত মূল্যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৮) বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির উর্ধ্বগতি বিবেচনায় শুধুমাত্র সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য স¦ল্পমূল্যে রেশনিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে।
(৯) আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে আহুত সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আচার অনুষ্ঠানে সিনিয়র সিটিজেনদেরকে আমন্ত্রণ জানানোসহ তাদের আসন সংরক্ষণ এবং তাদেরকে যথাযথ মুল্যায়ন ও মর্যাদা প্রদানের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
(১০) জাতীয় বিভিন্ন সমস্যা, দুর্যোগে সিনিয়র সিটিজেনদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ব্যবস্থা গ্রহণের নীতিমালা প্রবর্তন করা যেতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ট্রেনিং সেন্টারে রিসোর্স পারসন অথবা অতিথি বক্তা হিসেবে সিনিয়র সিটিজেনদেরকে সম্পৃক্ত করার ব্যবস্থা বা পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে।
(১১) ইমিগ্রেশন, পাসপোর্ট প্রাপ্তি, ভিসা প্রাপ্তি, জাতীয় গুরুত্ব সনদপত্র প্রাপিÍর ক্ষেত্রে সিনিয়র সিটিজেনদেরকে অগ্রাধিকার/ বিশেষ বিবেচনায় গণ্য করা যেতে পারে।
(১২) সরকার কর্তৃক সিনিয়র সিটিজেনদেরকে পৃথক স্মার্ট কার্ড অথবা পরিচয়পত্র প্রদানের ব্যবস্থা নিতে হবে।
জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জীবনধারণের সমস্যা কোথায় বলব, আর কোথায় লিখব এ কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরামের সদস্যবৃন্দকে যৌথভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। সিনিয়র নাগরিকদের সমস্যা আধুনিক ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকদের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। কারণ, সরকারের সুদৃষ্টি আকর্ষণ ও জনমত গঠনের নিমিওে জাতীয় সংবাদপত্রগুলিতে পৃথক পৃথকভাবে দেশের প্রবীণ নাগরিকদের সমস্যা ও এর সমাধান সম্পর্কিত বিষয়গুলি প্রবন্ধ Ñ নিবন্ধ আকারে লিখতে হবে। সিনিয়র নাগরিকরা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে থাকে। বিশেষ করে বয়স্ক নির্ধারিত আয়ের মানুষ তাদের জমানো অর্থ এসব জায়গায় বিনিয়োগ করে লাভবান হতে পারে, জনসাধারণের সুযোগ সুবিধা বিবেচনা করে চালু স্কিমগুলোর লাভ অব্যাহত থাকবে, এটি সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা।

প্রবীণদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের থেকে পাওয়া আন্তরিক ভালোবাসা প্রয়োজনের সময় তাদেরকেও প্রচলিত ধর্মীয় রীতি অনুসারে সমভাবে ফিরিয়ে দিতে হবে। রাখতে হবে তাদের স্বাস্থ্য, মানসিক ও পারিপার্শ্বিক বিষয়ের খবরাখবর। প্রবীণ মানুষগুলোর সুস্থ জীবন যাপনের জন্য তাদের বার্ধক্যকে সম্মানজনকভাবে কাটানোর ব্যবস্থা করা প্রতিটি সন্তানের দায়িত্ব হওয়া উচিত। কারণ, তাদের বাদ দিয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রবীণ নাগরিকরা অভিজ্ঞতার সম্পদ, আমাদের কাছে উজ্জীবনী শক্তি হিসেবে চলমান ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের পথ প্রদর্শক।

লেখক ঃ সার্ক কান্ট্রি রিসার্চ স্কলার, আসাম কেন্দ্রীয় বিশ^বিদ্যালয়, শিলচর, ভারত, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ, খ্যাতিমান সাংবাদিক এবং সাবেক ডাইরেক্টর (জনসংযোগ), বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ