| |

সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)–ড. দেওয়ান রাশীদুল হাসান, পিএইচ.ডি.

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় উপহার।পবিত্র কুরআন শরীফে মাত্র ২৫ জন নবীর কথা উল্লেখ আছে । তবে পৃথিবীতে ১২৪০০০ ( এক লক্ষ চব্বিশ হাজার) নবী এসেছিল বা আবার কিছু ইসলামিক দার্শনিকরা মনে করেন ২২৪০০০ নবীর আগমন হয?েছিল কিš‘ এর সঠিক তথ্য শুধু মাত্র আল্লাহ জানেন। কুরআনে বলা হয?েছে বিভিন্ন সময?ে বিভিন্ন গোত্রের জন্য আল্লাহ এক বা একাধিক নবী প্রেরণ করতেন। এবং হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)কে সমগ্র মানব জাতির জন্য শেষ নবী হিসেবে প্রেরণ করা হয?েছিল। বিশ্বাস করা হয? সব নবীদের বার্তা একই ছিল । মুসলমানগণ বিশ্বাস করে ঈসা (আঃ) আল্লাহর পুত্র নন বরং তিনি আল্লাহর রসূল। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও মানবজাতির মুক্তির শ্রেষ্ঠ দিশারী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বর একটি জাতিকে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণিত করে পৃথিবীতে অনাগতের জন্যও এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত ¯’াপন করে রেখে গেছেন।
পবিত্র কুরআন ইসলামের আলোকস্তম্ভ, হাদীস তাঁর বি”ছুরিত আলো। ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে কুরআন যেন হৃদপিণ্ড, আর হাদীস এ হৃদপিণ্ডের সাথে সংযুক্ত ধমনী। জ্ঞানের বিশাল ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত তাজা তপ্ত শোণিতধারা প্রবাহিত করে এর অঙ্গ-প্রতঙ্গকে অব্যাহতভাবে সতেজ ও সক্রিয় রাখে। হাদীস একদিকে যেমন কুরআনুল আযীমের নির্ভুল ব্যাখ্যা দান করে, অনুরূপভাবে তা পেশ করে কুরআনের ধারক ও বাহক নবী করীম (সাঃ)-এর পবিত্র জীবনচরিত, কর্মনীতি ও আদর্শ এবং তাঁর কথা ও কাজ, হিদায়াত ও উপদেশের বিস্তারিত বিবরণ। এ জন্যই ইসলামী জীবন বিধানে কুরআনে হাকীমের পরপরই হাদীসের ¯’ান।
আল্লাহ তা’আলা জিবরাঈল আমীনের (আঃ) মাধ্যমে নবী করিম (সাঃ)-এর উপর যে ওহী নাযিল করেছেন, তা হলো হাদীসের মূল উৎস। ওহী-এর শাব্দিক অর্থ ‘ইশারা করা’ গোপনে অপরের সাথে কথা বলা। ওহী দু প্রকার। প্রথম প্রকার প্রত্যক্ষ ওহী যার নাম ‘কিতাবুল্লাহ’ বা ‘আল-কুরআন’। এর ভাব, ভাষা উভয়ই মহান আল্লাহ্?র। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তা হুবুহু প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয় প্রকার পরোক্ষ ওহী এর নাম ‘সুন্নাহ’ বা ‘আল-হাদীস’। এর ভাব আল্লাহ্?র, তবে নবী (সাঃ)তা নিজের ভাষায়, নিজের কথায় এবং নিজের কাজে ও সম্মতির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। প্রথম প্রকারের ওহী রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উপর সরাসরি নাযিল হতো এবং তাঁর কাছে উপ¯ি’ত লোকজন তা’ উপলব্ধি করতে পারত। কিš‘ দ্বিতীয় প্রকারের ওহী তাঁর উপর প্র”ছন্নভাবে নাযিল হতো এবং অন্যরা তা’ উপলব্ধি করতে পারত না।
আখেরী নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কুরআনের ধারক ও বাহক, কুরআন তাঁর উপরই নাযিল হয়। আল্লাহ তা’আলা তাঁর কিতাবে মানব জাতিকে একটি আদর্শ অনুসরণের ও অনেক বিধি-বিধান পালনের নির্দেশ দিয়েছেন, কিš‘ তাঁর বিস্তারিত বিবরণ দান করেন নি। এর ভার ন্যস্ত করেছেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উপর। তিনি নিজের কথা-কাজ ও আচার-আচরনের মাধ্যমে কুরআনের আদর্শ ও বিধান বাস্তবায়নের পš’া ও নিয়ম কানূন বলে দিয়েছেন। কুরআনকে কেন্দ্র করেই তিনি ইসলামের এক পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান পেশ করেছেন। অন্য কথায়, কুরআন মজীদের শিক্ষা ও নির্দেশসমূহ ব্যাক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর করার জন্য নবী (সাঃ) যে পš’া অবলম্বন করেছেন, তাই হ”েছ হাদীস। হাদীসও যে ওহীর সুত্রে প্রাপ্ত এবং তা শরী’আতের অন্যতম উৎস কুরআন ও মহানবী (সাঃ)-এর বাণীর মধ্যেই তাঁর প্রমাণ বিদ্যমান। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী(সাঃ) সম্পর্কে বলেনঃ “আর তিনি (নবী) মনগড়া কথাও বলেন না, এ তো ওহী যা’ তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়” (৫৩: ৩-৪)।
প্রখ্যাত ভারতীয় লেখিকা সরোজিনী নাইডু বিশ্বনবী (সাঃ)’র আদর্শ তথা ইসলাম সম্পর্কে ‘দ্যা আইডিয়ালস অব ইসলাম’ গ্রšে’ লিখেছেন, ‘ন্যায়বিচারবোধ ইসলামের এক অনুপম আদর্শ। যখনই আমি কোরআন অধ্যয়ন করেছি তখন প্রত্যক্ষ করেছি জীবন সম্পর্কিত সমস্ত গতিশীল নীতিকথা যা ভাববাদী অর্থে নয় বরং বাস্তব অর্থেই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার পথনির্দেশনা । ‘ বিশ্বনবী (সাঃ) মানুষের কাছে যে ধর্ম প্রচার করেছেন সে সম্পর্কে এ. জে. টয়েনবি লিখেছেন ‘মুসলমানদের মধ্যে সংকীর্ণ জাতি বা গোত্রীয় চেতনার পরিপূর্ণ বিলোপ সাধন ইসলামের এক অবিসম্বাদী সাফল্য। বর্তমান বিশ্বকে গোষ্ঠী-প্রীতির অভিশাপ থেকে বাঁচানোর জন্যে ইসলামের প্রচার অত্যন্ত জর“রী।’ জর্জ বার্ণার্ড শ বিশ্বনবী (সাঃ)’র অবদান ও আদর্শ সম্পর্কে ‘দ্যা জেনুয়িন ইসলাম’ গ্রšে’ লিখেছেন, ‘ইসলামের মধ্যে যে অসামান্য জীবনী-শক্তি রয়েছে তার জন্যে আমি মুহাম্মদের ধর্মকে সব সময়ই প্রগাঢ় ভক্তি ও উ”চ-সম্মান প্রদর্শন করে থাকি। আজ আমার কাছে স্পষ্ট যে একমাত্র ইসলামই পরিবর্তনশীল মানব-জীবনের সামগ্রীক অব¯’ার সাথে খাপ-খাইয়ে নিতে সক্ষম, যার আবেদন সব যুগেই প্রযোজ্য ও অনুসরণীয়। অসাধারণ প্রজ্ঞাবান ও অত্যাশ্চার্য প্রতিভার অধিকারী এ মানুষ তথা মুহাম্মাদ (সাঃ) কে যতটুকু আমি জেনেছি তাতে অকুন্ঠচিত্তে বলতে পারি, তিনি সমগ্র মানবজাতির ত্রাণকর্তা। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বর্তমান সময়ে যদি তাঁর মতো মহান ব্যক্তি পৃথিবী পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতেন তবে তিনি মানব জাতির সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারতেন, আজকের দিনে যার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশী।’
হাদীস অধ্যয়নের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লামা বদর“দ্দীন আইনী (রঃ) বলেন “দুনিয়া ও আখিরাতের পরম কল্যাণ লাভই হ”েছ হাদীস অধ্যয়নের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ।” আল্লামা কিরমানী (রঃ) লিখেছেন, “কুরআনের পর সকল প্রকার জ্ঞানের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বোত্তম এবং তথ্য তত্ত্ব সমৃদ্ধ সম্পদ হ”েছ ইলমে হাদীস। কারন এই জ্ঞানের সাহায্যেই আল্লাহ্?র কালামের লক্ষ্য ও তাৎপর্য জানা যায় এবং তাঁর হুকুম-আহকামের উদ্দেশ্য অনুধাবন করা যায়। মসজিদে নববীকে কেন্দ্র করে স্বয়ং নবী করীম (সাঃ)-এর জীবদ্দশায় যে শিক্ষায়তন গড়ে উঠেছিল সেখানে একদল বিশিষ্ট সাহাবী ( আহলুস সুফফা) সার্বক্ষণিকভাবে কুরআন-হাদীস শিক্ষায় রত থাকতেন। হাদীস সংরক্ষণের জন্য যথাসময়ে যথেষ্ট পরিমাণে লেখনী শক্তিরও সাহায্য নেয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে কুরআন মজীদ ব্যতীত সাধারণতঃ অন্য কিছু লিখে রাখা হত না। পরবর্তীকালে হাদীসের বিরাট সম্পদ লিপিবদ্ধ হতে থাকে। ‘হাদীস নবী করীম (সাঃ)-এর জীবদ্দশায় লিপিবিদ্ধ হয়নি, বরং তাঁর ইন্তেকালের শতাব্দী কাল পর লিপিবদ্ধ হয়েছে’ বলে যে ভুল ধারনা প্রচলিত আছে তাঁর আদৌ কোন ভিত্তি নেই। অবশ্য একথা ঠিক যে, কুরআনের সঙ্গে হাদীস মিশ্রিত হয়ে জটিল পরি¯ি’তির উদ্ভব হতে পারে- কেবল এই আশংকায় ইসলামী দাওয়াতের প্রাথমিক পর্যায় রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছিলেনঃ “আমরা কোন কথাই লিখ না। কুরআন ব্যাতিত আমার নিকট থেকে কেউ অন্য কিছু লিখে থাকলে তা যেন মুছে ফেলে।”(মুসলিম) কিš‘ যেখানে এরূপ বিভ্রান্তির আশংকা ছিল না মহানবী (সাঃ) সে সকল ক্ষেত্রে হাদীস লিপিবদ্ধ করে রাখতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেন।
আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট উপ¯ি’ত হয়ে বললেন, “হে আল্লাহ্?র রাসূল ! আমি হাদীস বর্ণনা করতে চাই। তাই যদি আপনি অনুমতি দেন, তাহলে আমি স্মরণশক্তির ব্যাবহারের সাথে সাথে লেখনীরও সাহায্য গ্রহণ করতে ই”ছুক।” তিনি বললেনঃ “আমার হাদীস কণ্ঠ¯’ করার সাথে সাথে লিখেও রাখতে পার”(দারামী)। আবদুল্লাহ ইবন আমর(রাঃ) আরও বলেন, “আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট যা কিছু শুনতাম, মনে রাখার জন্য তা’ লিখে নিতাম। কতিপয় সাহাবী আমাকে তা লিখে রাখতে নিষেধ করলেন এবং বললেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) একজন মানুষ, কখনও স্বাভাবিক অব¯’ায় আবার কখনও রাগান্বিত অব¯’ায় কথা বলেন।” এ কথা বলার পর আমি হাদীস লেখা থেকে বিরত থাকলাম, অতঃপর তা রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে জানালাম। তিনি নিজ হাতের আঙ্গুলের সাহায্যে স্বীয় মুখের দিকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ “ তুমি লিখে রাখ । যেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, এই মুখ দিয়ে সত্য ছাড়া অন্য কিছু বের হয় না” (আবূ দাঊদ, মুসনাদ আহমেদ, দারমী, হাকিম, বায়হাকী)। তাঁর সংকলনের নাম ছিল ‘সাহীফায়ে সাদিকা’ ।
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, এক আনসারী সাহাবী রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে আরয করেলেন, হে আল্লাহ্?র রাসুল ! আপনি যা কিছু বলেন, আমার কাছে খুবই ভালো লাগে, কিš‘ মনে রাখতে পারি না । নবী করীম (সাঃ)বললেনঃ “ তুমি ডান হাতের সাহায্য নাও।” তারপর তিনি হাত এর ইশারায় লিখে রাখার প্রতি ইঙ্গিত করলেন- (তিরমিযী, হাদিসটি যঈফ [বাংলা হাদিস]) আবূ হুরায়রা (রঃ) বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (সাঃ)ভাষণ দিলেন। আবূ শাহ ইয়ামানী(রাঃ) আরয করলেন, হে আল্লাহ্?র রাসূল! এ ভাষণ আমাকে লিখে দিন। নবী করীম (সাঃ)- ভাষণটি তাঁকে লিখে দেওয়ার নির্দেশ দেন-(বুখারী, তিরমিযী, মুসনাদে আহমদ)। হাসান ইবন মুনাব্বিহ (রাঃ) বলেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) আমাকে বিপুল সংখ্যক কিতাব (পাণ্ডুলিপি) দেখালেন। তাতে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাদীস লিপিবদ্ধ ছিল ( ফাতহুল বারী)। আবূ হুরায়রা (রাঃ) এর সংকলনের একটি কপি ( ইমাম ইবন তাইমিয়ার হস্তলিখিত) দামেশক এবং বার্লিনের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।
আনাস ইবন মালিক (রাঃ) তাঁর (স্বহস্ত লিখিত) সংকলন বের করে ছাত্রদের দেখিয়ে বলেন, আমি এসব হাদীস নবী করীম (সাঃ)-এর নিকট শুনে লিখে নিয়েছি। পরে তাঁকে তা পড়ে শুনিয়েছি (মুসতাদরাক হাকিম,৩য় খ, পৃ ৫৭৩) রাফি’ ইবন খাদীজা (রাঃ)-কে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হাদীস লিখে রাখার অনুমুতি দেন। তিনি প্রচুর হাদীস লিখে রাখেন (মুসনাদে আহমেদ) । হিজরী দ্বিতীয় শতকের শেষার্ধ থেকে চতুর্থ শতকের শেষ পর্যন্ত হাদীসের চর্চা আরও ব্যাপকতর হয়। এ সময়কালে হাদীসের প্রসিদ্ধ ইমাম-বুখারী, মুসলিম, আবূ ঈসা তিরমিযী, আবূ দাঊদ সিজিস্তানী, নাসাঈ ও ইবন মাজা (রঃ)-এর আবির্ভাব হয় এবং তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দীর্ঘ অধ্যবসায়ের ফলশ্রুতিতে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ছয়খানি হাদীস গ্রš’ (সিহাহ সিত্তাহ) সংকলিত হয়।বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কাল (৭১২ খৃ) থেকেই হাদীস চর্চা শুর“ হয় এবং এখানে মুসলিম জনসংখা বৃদ্ধির সাথে সাথে ইসলামী জ্ঞান চর্চা ব্যাপকতর হয়। ইসলামের প্রচারক ও বাণী বাহকগণ উপমহাদেশের সর্বত্র ইসলামী জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র গড়ে তোলেন। খ্যাতনামা মুহাদ্দিস শায়ক শরফুদ্দীন আবূ তাওয়ামা (মৃ ৭০০ হি) ৭ম শতকে ঢাকার সোনারগাঁও আগমন করেন এবং কুরআন ও হাদীস চর্চার ব্যাপক ব্যব¯’া করেন। বঙ্গদেশের রাজধানী হিসেবে এখানে অসংখ্য হাদীসবেত্তা সমাবেত হন এবং ইলমে হাদীসের জ্ঞান এতদঞ্চলে ছড়িয়ে দেন। মুসলিম শাসনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত ছিল। বর্তমান কাল পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। দার“ল উলূম দেওবন্দ, মাযাহির“ল উলূম সাহারানপুর, মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা, মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া, জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালাবাগ প্রভৃতি হাদীস কেন্দ্র বর্তমানে ব্যাপকভাবে হাদীস চর্চা ও গবেষণা করে চলেছে। এভাবে যুগ ও বংশ পরম্পরায় মহানবী (সাঃ)-এর হাদীস ভাণ্ডার আমাদের কাছে পৌঁছেছে এবং ইনশাল্লাহ অব্যাহতভাবে তা’ অনাগত মানব সভ্যতার কাছে পৌঁছতে থাকবে।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ব্যবসাও করেছেন, সমস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য রেখে গেছেন উত্তম ব্যবসার বিধান । যুদ্ধের ময়দানে রাসুলুল্লাহ ছিলেন অনন্য । তিনি নিজে সশরিরে সতেরোটি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় সব সাহাবিদের ১০ জন করে দল ভাগ করে দিয়ে দিয়ে এক দলে একজন কম থাকায় নিজে যোগদান করেন সেই দলে। ক্ষুধার্ত এক সাহাবি পেটে পাথর বাধা অব¯’ায় রাসুলকে দেখান। রাসুল নিজের পেট দেখান সেখানে ২টি পাথর বাধা ছিলো। রাষ্টপ্রধান হিসেবে রাসুলের জীবনব্যব¯’াও আমদের জন্য অনুকরণীয় । আল্লাহ পাক যেন আমাদের তৌফিক দান করেন রসুলের আদর্শকে ‘আদর্শ মডেল’ হিসাবে গ্রহণ করার ।
মুসলিম সমাজে বসবাসরত সংখ্যালঘুদেরকে ইসলাম কতিপয় বিষয়ের অধিকারী ও নিশ্চয়তা প্রদান করে। মহান আল্লাহ্ কুরআন মাজীদে এ অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য মুসলিমদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নবী মুহাম্মদ (সাঃ) ও সংখ্যালঘুদের কতিপয় অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করছেন। প্রকৃতপক্ষে, এ নিশ্চয়তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হ”েছ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা এবং তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তাদের অধিকারগুলো হ”েছ : ইসলামের মূল বিষয় হলো তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাতে বিশ্বাস। এ তিনটি বিষয় মেনে নেয়ার পর অন্য যে কোন শরীয়ত (যেহেতু রহিত হয়ে গেছে) মেনে নেয়ার সুযোগ নেই। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রসূলের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন শরীয়ত প্রদান আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় কর“ণা। তাই পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে, “আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য শরীয়ত ও স্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি। ই”ছা করলে আল্লাহ তোমাদেরকে এক জাতি করতে পারতেন কিš‘ তিনি তোমাদের যা’ দিয়েছেন তা দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করতে চান” এ আয়াতটিতে আসমানী কিতাবের অনুসারী অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ ধর্মের বিধান পালনের ধারণা ব্যক্ত করা হয়েছে এবং একত্ববাদের অধীনে আল্লাহ যে বিভিন্ন শরীয়ত বা পথ পাঠিয়েছেন তার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। শরীয়তের এই ভিন্নতা মহান আল্লাহর অলৌকিক বিষয়।
মহান আল্লাহ বলেছেন “দীনের ব্যাপারে কোনো জোর জবরদস্তি নেই” কাউকে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য বাধ্য করা যাবে না। স্বাধীনভাবে ধর্ম বা বিশ্বাস ধারণের অধিকার ইসলামে স্বীকৃত। ইসলাম মূলত পরধর্ম সহিষ্ণু। মুসলিম সমাজে বসবাসরত সংখ্যালঘু নাগরিক যদি ইসলাম গ্রহণ না করে, তাকে জোর করে মুসলিম বানানোর অধিকার কোনো ব্যক্তি বা সরকারের নেই । তবে ইসলামের সৌন্দর্য তাদের সামনে তুলে ধরা যাবে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে-‘তুমি কি মানুষদেরকে মুমিন হওয়ার জন্য জবরদস্তি করবে’? তিনি আরো বলেন : ‘আল্লাহকে ছেড়ে তারা যাদের ডাকে, তোমরা তাদেরকে গালি দিও না। তাহলে তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকেও গালি দিবে। উমর (রাঃ) জনৈক খ্রিস্টান বৃদ্ধা মহিলাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলে সে মহিলা উত্তরে বলেছিল ‘আমি মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধা। শেষ জীবনে নিজের ধর্ম কেন ত্যাগ করবো? উমর(রাঃ) এ কথা শুনেও তাকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেননি বরং ‘ধর্মের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। এ আয়াতটি পাঠ করে তার বিশ্বাসের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেন। কারণ, ঈমান বা বিশ্বাসের সম্পর্ক বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে নয়। জিহাদ বা কিতাল কিংবা শক্তি প্রয়োগ দ্বারা বাহ্যিক অঙ্গ-পত্যঙ্গ প্রবাহিত হয়। সুতরাং মুসলিম সমাজে বসবাসরত সংখ্যালঘুরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালনে স্বাধীন । এতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারো নেই। ইসলাম যেভাবে অন্য ধর্মের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়, তেমনি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের অব¯ি’তিও স্বীকার করে। মুসলিম অধ্যুষিত দেশে বিভিন্ন অনুসারীদের বসবাস যেমন ইসলামে স্বীকৃতি তেমনি নিজস্ব উপাসনালয়ে উপাসনা করার নিরংকুশ অধিকারও স্বীকৃত। হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আমাদের এই সুন্দর বাংলাদেশ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমরা বসবাস করে আসছি। কারণ এদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ থাকার কারনেই এই সম্প্রতি ও সৌহার্দপূর্ণ অব¯’ান অব্যাহত আছে। কারণ ইসলাম আমাদের পরধর্ম সহিষ্ণতা শিক্ষা দেয়। ইসলাম অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের নিরাপত্তা বিধানেও বদ্ধপরিকর।
আজকাল অনেকেই যেখানে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ, ঘুষ, চাঁদাবাজির সুযোগ আছে সেখানেই চাকরি খোঁজেন। অনেক মা বাবা মেয়ের বিয়ের সময় যেসব পাত্রের অতিরিক্ত আয় রোজগারের সুযোগ আছে, তাদেরকে পছন্দ করেন। অথচ ইসলামে শিরকের পরে সবচেয়ে কঠিন গুনাহের কাজ হ”েছ অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কোরআন শরীফের বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন-‘শিরককারীকে ক্ষমা করবেন না’ আর অন্যের হক এর ব্যাপারে বলেছেন, ‘যার হক সে মাফ না করে দিলে আমি তা মাফ করতে পারি না’। আল্লাহ সুবহানাতায়ালা যা মাফ করতে পারেন না তা’ যে কত বড় গুনাহের কাজ সহজেই অনুমেয়।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে সে তাদের দলভূক্ত বলে গণ্য হবে।’ অন্য একটি বর্ণনায় খলিফা হজরত উমর রা. বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর দুশমনদের উৎসবগুলোতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাক।’ অন্য বর্ণনায় তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘কারণ এ ক্ষেত্রে আল্লাহর অসš‘ষ্টি নাজিল হয়ে থাকে।’ আরেকটি বর্ণনায় হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেছেন, অর্থাৎ যারা বিধর্মীদের মতো উৎসব করবে, কিয়ামত দিবসে তাদের হাশর ওই লোকদের সাথেই হবে।

মানুষের জীবনে মসজিদের গুর“ত্ব অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন, কলেমা, সালাত, সাওম, হজ্জ, যাকাত হ”েছ দ্বীনের স্তম্ভ । খুঁটি ছাড়া যেমন ঘর তৈরি করা যায় না, তদ্রপ কলেমা, সালাত, সাওম, হজ্জ, যাকাত আদায় না করলে মুসলিম হওয়া যায় না। বর্ণিত কল্যাণকর কাজসমূহের আলোচনা, আহ্বান, প্রেরণা ও তাগিদ দেওয়ার জন্যই মুসলিমদের মসজিদ। মসজিদ আল্লাহ তা’আলার ঘর, আল্লাহ তা’ আলা বলেন, ‘এবং এই যে মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না। বর্ণিত আয়াতে আয়াতে মসজিদকে আল্লাহর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করে উল্লেখ করার মাধ্যমে মূলত মসজিদের মর্যাদা ও গুর“ত্ব ফুটে উঠেছে। মসজিদ পৃথিবীতে সর্বোত্তম জায়গা এবং আল্লাহ তা’ আলার সবচেয়ে প্রিয় ¯’ান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম জায়গা মসজিদ এবং সর্ব-নিকৃষ্ট জায়গা বাজার।’ (সহীহ মুসলিম) আল্লাহ তা’ আলা বলেন, একমাত্র তারাই আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, ওরা হিদায়াত প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’। (সূরা : তাওবা, আয়াত : ১৮)
পৃথিবীতে শান্তি আসার জন্য আদর্শবান মানুষের প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। মানুষের ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবনের চিন্তা ও মানসিকতা কেমন হওয়া উচিত, উপলব্ধি ও অনুভূতি প্রকাশ কেমন হওয়া উচিত, বাহ্যিক আচার ও তৎপরতা কেমন হওয়া উচিত, নিজের ও অন্যের ক্ষেত্রে পছন্দ ও সিদ্ধান্তগত সমন্বয় বিধানের দিকটি কেমন হওয়া উচিত, এ সবকিছুর সুবিন্যস্ত সুসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি ও বাস্তব উদাহরণ হিসেবে সর্বোৎকৃষ্ট অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে আছেন বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, আমাদের প্রিয়নবী, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
লেখক ঃ সার্ক কান্ট্রি রিসার্চ স্কলার, আসাম কেন্দ্রীয় বিশ^বিদ্যালয়, শিলচর, ভারত, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ, খ্যাতিমান সাংবাদিক এবং সাবেক ডাইরেক্টর (জনসংযোগ), বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ ( ঋড়হঃ: ঝঁঃড়হহু গঔ)