| |

স্বাধীনতার ইতিহাসে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ¦ল মুক্তিযুদ্ধের মহান বিজয় দিবস-ড. দেওয়ান রাশীদুল হাসান, পিএইচ.ডি.

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি জনবহুল ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বাংলাদেশের অভ্যুদয়। ১৯৪৭ সালে ইংরেজদের শাসন থেকে এদেশ মুক্ত হলেও ফের বাধা হিসেবে দেখা দেয় পাকিস্তানী শোষক গোষ্ঠীর অন্যায় শাসন। বাঙালি বঞ্চিত হতে থাকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে। পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ লুট করে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে গড়ে তোলা হয় সম্পদের পাহাড়। তাদের সে অত্যাচার-নির্যাতনের প্রতিবাদে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে দামাল বাঙালি। ধাপে ধাপে আঘাত হানতে থাকে শাসনযন্ত্রে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৫৬-এর শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মার্চে দুরন্ত বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তির সংগ্রামে। ২৫শে মার্চ কাল রাতে পাকিস্তানী বর্বর বাহিনী শুরু করে নির্মম নিধনযজ্ঞ। এরপর আসে মহান স্বাধীনতার ঘোষণা। দখলদার বাহিনীকে বিতাড়নে শুরু হয় অদম্য সংগ্রাম। ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে জীবন দান করেন লাখো বাঙালি। অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জত-সম্ভ্রমের বিনিময়ে অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর আসে সেই কাঙ্খিত বিজয়। সে সময়ের রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ৪৮ বছর আগের এ দিনে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী হাতের অস্ত্র ফেলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল বিজয়ী বীর বাঙালির সামনে। স্বাক্ষর করেছিল পরাজয়ের সনদে। পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালে একটি সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে লাভ করল ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশ । পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় বাংলাদেশ নামে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাঙালি জাতি পায় লাল-সবুজের একটি জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত এবং মানচিত্র।

বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং দীর্ঘ ন’মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মধ্যদিয়ে তা পরিপূর্ণতা পায়। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতি বিনম্রচিত্তে পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে যার অপরিসীম ত্যাগ ও আপোষহীন নেতৃত্বে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহিদদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে আমরা স্মরণ করি। যাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয়ের দিনটিতে আনন্দের পাশাপাশি বেদনাও বাজবে বাঙালির বুকে। বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতায় জাতি আজ স্মরণ করে জানা-অজানা সেসব লাখো শহীদকে। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করে পেরিয়ে গেল ৪৮টি বছর।

স্বাধীনতা অর্জিত হলেও গত ৪৮ বছর জাতির চলার পথ মসৃণ ছিল না কখনো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়া, দারিদ্র্য ও দুর্নীতি থেকে মুক্তির সংগ্রামের পাশাপাশি একইভাবে চলেছে সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম, যুদ্ধাপরাধের বিচার, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ আন্দোলন। এসব আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যেই মোকাবিলা করতে হয়েছে প্রবল বন্যা, ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের। এই বন্ধুর পথপরিক্রমায় অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু শত বাধা-প্রতিবন্ধকতাতেও হতোদ্যম হয়নি এ দেশের সংগ্রামী মানুষ। হারায়নি সাহস। লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে অব্যাহত আছে বাঙালির এগিয়ে যাওয়া।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কমান্ডার লে. জেনারেল নিয়াজীর রেসকোর্স মাঠে আত্মসমর্পণ দেখবার জন্য একটি খোলা জিপে সশস্ত্র অবস্থায় ঢাকা ক্লাবের সামনের গাছের নিচে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা অপেক্ষা করছিল। বিকাল সাড়ে ৪টার পরে হানাদার বাহিনীর কমান্ডার এলেন। সঙ্গে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। তারা আত্মসমর্পণ দলিলে সই করবেন। কিন্তু সই যে করবেন কোথায় রেখে করবেন! টেবিল তো নেই। টেবিল জোগাড় করে আনার দায়িত্ব দেওয়া হলো এসএসসি পরীক্ষার্থী মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মাহমুদকে । তিনি কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুকে নিয়ে ঢাকা ক্লাব থেকে কাঁধে করে একটা অতি সাধারণ টেবিল রেসকোর্স মাঠে যোগাড় করে আনলেন। ঐ টেবিল আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য ঐতিহাসিক সামগ্রী।

পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের এই ঐতিহাসিক দলিলটি স্বাক্ষরিত হয় রমনার রেসকোর্স ময়দানে(বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান), ৪টা ১ মিনিটে। দলিলে স্বাক্ষর করলেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর পক্ষে কমান্ডার-ইন-চিফ লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, আর যুদ্ধরত পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের কমান্ডার লে. জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী। ঐতিহাসিক সে ঘটনার সাক্ষী হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ছিলেন তখনকার আমাদের বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার কমোডর এ কে খন্দকার, ভারতের পক্ষে সে দেশের তখনকার পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অফ স্টাফ লে. জেনারেল জ্যাকব রাফায়েল জ্যাকব, আর পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় পাকিস্তানি নেভির কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরীফ ও পূর্বাঞ্চলীয় ভারতীয় বিমান বাহিনীর এয়ার ভাইস মার্শাল প্যাট্রিক ডি কলাঘান।

দলিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল নিয়াজী নিঃশর্তে পরাজয় মেনে নিলেন, বাংলাদেশও স্বাধীন হয়ে গেল। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে যুদ্ধ করতে থাকা ৯১ হাজার ৫৪৯ জন পাকিস্তানি সেনা যুদ্ধবন্দী হিসেবে স্বীকৃত হল। ওরা যদি বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে, তবে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধবন্দীর সকল অধিকারই ওরা পাবে। পাকিস্তানি সকল সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনী-ই যুদ্ধবন্দীর মর্যাদা পাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একসঙ্গে এত সৈন্য আর কোথাও আত্মসমর্পণ করেনি।

দলিলে স্বাক্ষর হয়ে গেলে, মানে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলে, সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, ভারতের বেতার কেন্দ্র আকাশবাণীসহ পৃথিবীর নানা রেডিও-টেলিভিশনে সে খবর প্রচার হতে শুরু করল; বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, পাকিস্তান বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী আর ভারতের সেনাদের যৌথ বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছে। অবশ্য ভারতের সেনাবাহিনী বেশিদিন যুদ্ধ করার সুযোগই পায়নি। ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেওয়ার ১২ দিনের মাথায় পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। ঐতিহাসিক মূল দলিলটা ইংরেজিতে লেখা হয়েছিল। আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক দলিলের বাংলা অনুবাদ:-

‘‘পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশি যৌথ বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে, পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের সকল সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণে সম্মত হলো। পাকিস্তানের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ সব আধা-সামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে এই আত্মসমর্পণ প্রযোজ্য হবে। এই বাহিনীগুলো যে যেখানে আছে, সেখান থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সবচেয়ে নিকটস্থ সেনাদের কাছে অস্ত্রসমর্পণ ও আত্মসমর্পণ করবে।

এই দলিল স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার নির্দেশের অধীন হবে। নির্দেশ না মানলে, তা আত্মসমর্পণের শর্তের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে, এবং তার প্রেক্ষিতে যুদ্ধের স্বীকৃত আইন ও রীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আত্মসমর্পণের শর্তাবলির অর্থ অথবা ব্যাখ্যা নিয়ে কোনো সংশয় দেখা দিলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণকারী সেনাদের জেনেভা কনভেনশনের বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করছেন, এবং আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সামরিক ও আধা-সামরিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সুবিধার অঙ্গীকার করছেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীন বাহিনীগুলোর মাধ্যমে বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও জন্মসূত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যক্তিদের সুরক্ষাও দেওয়া হবে।’’

স্বাক্ষর

জগজিৎ সিং অরোরা
লেফটেন্যান্ট জেনারেল
জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ
পূর্ব রণাঙ্গনে ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ বাহিনী
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১

স্বাক্ষর

আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি
লেফটেন্যান্ট জেনারেল
প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জোন-বি
অধিনায়ক, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড (পাকিস্তান)
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১

Instrument of Surrender

The PAKISTAN Eastern Command agree to surrender all PAKISTAN Armed Forces in BANGLADESH to Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA, General Officer Commanding in Chief of the Indian and Bangladesh forces in the Eastern Theatre. This surrender includes all PAKISTAN land, air and naval forces as also all para-military forces and civil armed forces. These forces will lay down their arms and surrender at the places where they are currently located to the nearest regular troops under the command of Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA.

The PAKISTAN Eastern Command shall come under the orders of Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA as soon as the instrument has been signed. Disobedience of orders will be regarded as a breach of the surrender terms and will be dealt with in accordance with the accepted laws and usages of war. The decision of Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA will be final, should any doubt arise as to the meaning of interpretation of the surrender terms.

Lieutenant JAGJIT SINGH AURORA gives a solemn assurance that personnel who surrender shall be treated with dignity and respect that soldiers are entitled to in accordance with provisions of the GENEVA Convention and guarantees the safety and well-being of all PAKISTAN military and para-military forces who surrender. Protection will be provided to foreign nationals, ethnic minorities and personnel of WEST PAKISTANI origin by the forces under the command of Lieutenant- General JAGJIT SINGH AURORA.

Signed by J.S. Aurora and A.A.K.Niazi.

এদিকে বাঙালি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ খলিলুর রহমান নানা সূত্রে জানতে পেরে তার নিজস্ব গ্রন্থ ‘পূর্বাপর’ এ উল্লেখ করেন ‘পাকিস্তানিরাই পাকিস্তানের মৃত্যু পরোয়ানা লিখে দিয়েছে’। সে ক্ষেত্রে পাকিস্তানে অবস্থানরত খলিলুর রহমানের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান হলো বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া। সেই চেষ্টা করেও সফল হননি। ফলে ভবিতব্য মেনে নিয়ে মুক্তির অপেক্ষা করছেন। এরপর ক্রমশ ঘটনা এগোতে থাকে, যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নেয়। বাংলাদেশে এত উথাল পাতাল ঘটনা ঘটছে, প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলছে বাঙালি সেনা পুলিশ ইপিআর এবং সর্বস্তরের মানুষ। বিশ্ব গণমাধ্যম যখন পাকিস্তানিদের পরাজয় অবধারিত বলে প্রচার চালাচ্ছে, তখনো তাদের ভাবখানা হলো, সব কিছু ঠিক হ্যায়। শেষ পর্যন্ত সব কিছু ঠিক হয়নি। বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানিদের লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হতে হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর যখন নিয়াজি আত্মসমর্পণ দলিলে সই করেন, তখন পাকিস্তাানে আটকে পড়া সব বাঙালি সেনা ও বেসামরিক নাগরিককে বন্দিজীবন বেছে নিতে হয়। তাদের জীবন ছিল অসহায়, অমানবিক। তবে এই দুঃসময়ে কিছু পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার সহৃদয় ব্যবহার পেয়েছেন, সে কথা বলতেও ভোলেননি খলিলুর রহমান। আবার এ সময়ে বাঙালিদের মধ্যে কেউ কেউ দালালি করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মেজর কাইউম চৌধুরী, রিয়াজ রহমান এবং বাংলাদেশ থেকে সফরে যাওয়া কাজী দীন মুহাম্মদ প্রমুখ। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হওয়ার কারণে ব্রিগেডিয়ার খলিল পাকিস্তানি সেনা সদর দপ্তরের হাঁড়ির খবরও পেতেন, তাদের মধ্যে দলাদলি, ঈর্ষা ও হিংসা ছিল প্রকটতর। তার চেয়ে বেশি ছিল ক্ষমতার লিপ্সা। পাকিস্তানের দুই সামরিক শাসক আইউব খান ও ইয়াহিয়া খান সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ জাগিয়ে তুলেছিলেন। সেনা কর্মকর্তারা রাজনীতিকদের ঘৃণা করলেও রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভে ছিলেন উন্মুখ।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যার মুখে সারা দেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধ যুদ্ধ। নারকীয় সেই হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হয় বিশ্ববিবেক। যুদ্ধবিধস্ত মানুষের অসহায়ত্ব তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন ভারত। শুধু ২৫-২৬ মার্চের মধ্যবর্তী রাতটিই নয়, তখন থেকে ১৬ ডিসেম্বর সকাল পর্যন্ত পুরো নয় মাসই যেন ছিল মুক্তিকামী বাঙালির জন্য এক দুঃস্বপ্নের কালরাত। গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নারীর সম্ভ্রমহানি, বন্দীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন-নিপীড়ন প্রভৃতির মাধ্যমে পুরো দেশটি এক আতঙ্কগ্রস্ত মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। এসবই শুরু হয়েছিল ঢাকা থেকে এবং দ্রুত তা’ ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। জেলা মহকুমা, থানার শহর বন্দর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ-জেন্ডার-বয়স নির্বিশেষে ওই বর্বর বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়েছে সর্বস্তরের মানুষ। শান্তি কমিটি, রাজাকার এবং আলবদর ও আল শামস বাহিনী গঠনের মাধ্যমে তাদের সহযোগিতা করেছে এ দেশের অবাঙালিরা এবং ধর্মোন্মাদ রাজনৈতিক দলগুলো। একই সঙ্গে বর্বরতার বিপরীতে উপস্থাপিত হয়েছে সাধারণ মানুষের পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস্য সহানুভূতি ও অপার মানবিক মহিমার প্রাণস্পর্শী সব আখ্যান।

একাত্তরে বুদ্ধিজীবীরা তাদের ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি, যুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারকে পরামর্শ প্রদানসহ বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিতে বিপুল অবদান রেখেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রকাশিত হয়েছে অনেক বই, বেরিয়েছে নানাজনের নানামাত্রিক স্মৃতিকথা। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। তিনি ছিলেন প্রবাসী সরকার গঠিত প্ল্যানিং সেলের সদস্য। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের অধিকাংশ ভাষণের লেখক ছিলেন তিনি। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারী বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। ভাবতে বিস্ময় লাগে, এসব কাজ তিনি যখন করেছেন, একটি বিপ্লবী সরকার যখন তাঁর ওপর এসব গুরু দায়িত্ব বহনের ক্ষমতা সম্পর্কে আস্থা স্থাপন করেছে, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৪ বছর। রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থেকেও আনিসুজ্জামান সেদিন যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন, রাজনীতির খুঁটিনাটি চাল সম্পর্কে যে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন, তা’ অনেকের কাছেই শিক্ষণীয় হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ, বিশেষত তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধ পক্ষের নানা প্রয়াস আনিসুজ্জামানের ভাষ্য থেকে লাভ করা যায়। ঘরে-বাইরে তাজউদ্দীন যে কতভাবে বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছেন, এ রচনায় তার আভাস স্পষ্ট। তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, খন্দকার মোশতাক আহমেদরা যে মুক্তিযুদ্ধের সময়েই নানামাত্রিক স্যাবোটাজ করেছেন, তারও ইঙ্গিত পাওয়া যায় ‘আমার একাওর’ (১৯৯৭) আলোচ্য গ্রন্থে। ড. আনিসুজ্জামানের বক্ষ্যমাণ গ্রন্থ থেকে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সম্পর্কে একটা পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায়। যুদ্ধের সময় ভারতসহ বিদেশের কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা আমাদের পক্ষে কাজ করেছে, কারা বিরোধিতা করেছে, এর স্পষ্ট ভাষ্য আছে এ গ্রন্থে। ইউরোপ-আমেরিকার অনেক ব্যক্তি ও সংস্থার সাহায্য-সহযোগের কথাও এখানে পাওয়া যায়। ড. আনিসুজ্জামানের আন্তর্জাতিক সংযোগ যে কত ব্যাপক, এ বই তারও কিছু সাক্ষ্য বহন করে।

উচ্চ শিক্ষা ক্ষেএে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গত ৪৮ বছরে ৪০টি পিএইচডি গবেষণা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টিই হয়েছে বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোয়। বাংলাদেশিরা বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে করেছেন এমন পিএইচডির সন্ধান পাওয়া গেছে পাঁচটি। যে ৪০টি পিএইচডির সন্ধান পাওয়া গেছে, এর মধ্যে ২১টিই হয়েছে ২০০৭ সালের পর থেকে গত বছর পর্যন্ত। আশির দশকে এ নিয়ে কোনো পিএইচডির সন্ধান পাওয়া যায়নি।গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের প্রাপ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত গবেষণার ক্ষেত্রে এমন তথ্যের যথেষ্ট ঘাটতি আছে বলেই গবেষকদের মত। মুক্তিযুদ্ধের যে ব্যাপ্তি ও বহুমাত্রিকতা, সেই তুলনায় উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রে বড় গবেষণা বা পিএইচডির এ সংখ্যাকে নগণ্য বলে মনে করেন গবেষকেরা। তাঁরা মনে করেন, শিক্ষকদের অনীহা, বিভাজিত দলীয় রাজনীতি, প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব এবং তথ্যপ্রাপ্তিতে সরকারি পর্যায়ে বাধা দান পিএইচডি কম হওয়ার কারণ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত প্রথম থেকেই নানাভাবে সহায়তা করেছিল এবং এসব সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে এত দ্রুত জয়লাভ করা কঠিন হতো। এ কথা অনস্বীকার্য, কিন্তু এ-ও মনে রাখা দরকার যে ২৬ মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারই পাকিস্তানিদের ব্যতিব্যস্ত রেখেছিলেন, নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিলেন, ওদের মনোবলকে নিয়ে এসেছিলেন শূন্যের কোঠায়। এটা না করতে পারলে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাত্র ১২ দিনের মাথায় পাকিস্তানিদের পরাজিত করা ভারতীয়দের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। উল্লেখ্য, ভারতীয় স্থলবাহিনী বাংলাদেশে অভিযান শুরু করে ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ এবং আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয় ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসিক অভিযানে পাকিস্তানিরা যখন পলায়নপর এবং মানসিকভাবে পরাজিত, তখন ভারতীয় বাহিনীর অংশগ্রহণ তাদের এই পরাজয়কে কেবল ত্বরান্বিত ও অনিবার্য করে তুলেছিল। মূলধারা ’৭১ গ্রন্থে লেখক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের এসব দুঃসাহসিক অভিযান ও এর ফলাফলের বিস্তারিত বিবরণ দেননি, তাঁর মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল প্রবাসী সরকারের কর্মকান্ড ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি। তবে মুক্তিযুদ্ধের গ্রন্থটিতে তিনি অজানা একটি অধ্যায়ের উন্মোচন করেছেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, বইটিতে এক দিকে যেমন রয়েছে মানবতার চরম লাঞ্ছনার ছবি, তেমনই অন্য দিকে আছে মানবিকতার দৃষ্টান্ত। কাজেই বইটিকে বলা যায় দালিলিকতা ও সাহিত্যিকতার এক অসামান্য নিদর্শন।

অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার মূল স্তম্ভের একটি হলো অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীলতা, যাকে ধর্মনিরপেক্ষতার আবরণে বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এই স্বীকৃতির পেছনে আকাঙ্খা ছিল বাংলাদেশের মানুষের মধ্যকার পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন ও বিদ্বেষের তথা সাম্প্রদায়িকতার চিরতরে অবসান ঘটানো। বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই জাতিগত পরিচয়ে বাঙালি এবং নাগরিকত্বের পরিচয়ে বাংলাদেশী। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কিংবা আদিবাসী কেউ সংখ্যালঘু পরিচয় নিয়ে বাংলাদেশে বাস করতে চায় না। সাম্প্রদায়িকতা আমাদের রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি যেভাবে গ্রাস করেছে একইভাবে আচ্ছন্ন করেছে মনোজগৎ। ধর্ম নিরপেক্ষতা গণতন্ত্র ও মানবিকতার নিরন্তর চর্চা এবং সর্বক্ষেত্রে এর প্রয়োগ ব্যতিত সাম্প্রদায়িকতার মূল উৎপাটন সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন এই সাম্প্রদায়িকতার চরিত্র উদঘাটন, নির্ণয় ও বিশ্লেষণ করে তার মূল উৎপাটনের লক্ষ্যে তরুণ সমাজকে অনুপ্রাণিত ও সংঘবদ্ধ করা। দৈনন্দিন এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ফলে আমরা ধর্ম-বর্ণ ও জাতিগত পরিচিতি নির্বিশেষে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারব। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে। জঙ্গিবাদ দমনে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় সবাইকে কাজ করতে হবে। সব ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা তৈরিতে কাজ করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

মহান বিজয় দিবস আমাদের সোনালি ইতিহাসের একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৭১ সালের এই দিনে ৩০ লাখ শহীদের প্রাণ ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল এ দেশের মানুষের কাঙিক্ষত ‘বিজয়’’ নামের লাল সূর্যটি। এ দিনটি জাতির জন্য পরম গৌরবের। বিজয়ের অনুভূতি সবসময়ই আনন্দের। তবে একই সঙ্গে দিনটি বেদনারও। অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের ফসল আমাদের স্বাধীনতা। আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের। এদিনে আমরা স্মরণ করব ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদেরও। এদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার তথা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সফল নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কোটি কোটি মানুষকে তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন। প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশে এই দিনটি বিশেষভাবে পালিত হয়। সর্বস্তরের জনগণের তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান যারা জাতির বিজয় অর্জনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের জন্য অবদান রেখেছেন।

লেখক ঃ সার্ক কান্ট্রি রিসার্চ স্কলার, আসাম কেন্দ্রীয় বিশ^বিদ্যালয়, শিলচর, ভারত,
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক ডাইরেক্টর (জনসংযোগ), বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ