| |

সড়ক ই আয়ের উৎস ফুলবাড়িয়ার কানা আজহারের

মো: আব্দুস ছাত্তার : ফুলবাড়িয়া টু আছিম যাওয়ার পথে কানার পুলে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটির আয় দিয়ে চলে ৫ সদস্যের সংসার। অভাবের তাড়না তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। কেমন চলছে তার সংসার বলতেই হেসে দিয়ে বলে ভালাই (ভালই)।

ফুলবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণ পূর্বে আছিমের রাস্তায় প্রায় ২ কিলোমিটার এগুলেই একটি কালভার্ট। যা আঞ্চলিক ভাষায় পুল বলা হয়। ১০/১২ বছর যাবত পুলের সন্নিকটে দাঁড়িয়ে এক কানা যুবক। সেই থেকে পুলটির নামকরণ হয়ে যায় কানার পুল। কানা যুবকটির নাম মো. আজহারুল ইসলাম, মাতা খোদেজা খাতুন, পিতা মো: ইয়াকুব আলী, গ্রাম- কৈয়ারচালা। খোদেজা খাতুনের ৩ ছেলে ও ২ মেয়ে তার মধ্যে আজহার দ্বিতীয়। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তার জন্ম। জন্মের পর থেকেই আজহার এর চোখের উপরের অংশে একটি মেচ (মেছতা) ছিল। তখন তার বয়স ২/৩ বছর। একদিন বাড়ীতে খেলতে খেলতে হঠাৎ পড়ে গিয়ে মেচ গলে যায়, শুরু হয় রক্তপড়া। মুহুর্তের মধ্যে চোখ সামনের দিকে চলে আসে। বিভিন্ন লোকের পরামর্শে বিভিন্ন ডাক্তার দেখানো হয়েছে। সবশেষ চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা: কে আর ইসলাম সাহেবের কাছে নেয়া হলে তিনি অপারেশন করা নিরুৎসাহিত করে বলেন, টাকা খরচ করলেও দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভবনা খুবই কম। সে থেকে আজহার অন্ধ। বাবা কানা ছেলেকে নিয়ে মানুষের ধারে ধারে অনেক গিয়েছেন সাহায্য-সহযোগিতার জন্য। বাবা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করলে অন্ধ পরিবারে আরও কালো মেঘের ছায়া নেমে আসে। ছোট ভাই সুমন কিছু দিন মানুষের ধারে ধারে ঘুরেছেন কিন্তু এ পেশা মানুষ ভালো চোখে দেখে না, নানা রকম কথাবার্তাও বলে। আজহারের চাচা-জেঠা ও এলাকাবাসীর পরামর্শে বাড়ীর সামনে সড়কের উপড়ে থাকা ব্রীজের উপর মানুষের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য বসিয়ে দেয়া হয়। ১৩/১৪ বছরের টগবগে কিশোর প্রথমদিকে একটি বস্তা বিছিয়ে মানুষের দয়ার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকতো। বৈরি আবহাওয়া নিবারণের জন্য কাগজ টানানো হলেও পরবর্তীতে সেটি বাঁশের চাটাই দিয়ে পলিথিনের মাধ্যমে বেদেদের ঘরের মতো বানানো হয়। এরপর সময়ের বিবর্তনে সেটি এখন টিনের ছাপড়া। ছাপড়া ঘরে ছোট একটি বাক্সও দেয়া আছে। প্রতিদিন সকাল ৭/৮ টার দিকে ঐ ছাপড়া ঘরে কানা আজহার কে তার আম্মা দিয়ে যান। বেশির ভাগ সময় তার মায়ের সাথে আসা হয় এ ছাপড়া ঘরে। আজহার মাকে আম্মা বলে মুখ ভরে ডাকেন। মায়ের সাথে ছেলে অন্ধ হওয়ার গল্প শোনা গেছে কিন্তু সংসারে অভাব আছে তেমনটি কথায় বুঝা যায়নি।

হাসি হাসি মুখে দৈনিক স্বদেশ সংবাদ’র সাথে কথা হয় দু:খিনী মায়ের। ভিটেমাটির তিন শতাংশ জমি ছাড়া আর কিছুই নেই তার সোনার টুকরা আজাহরের। ৬/৭ বছর আগে প্রতিবন্ধি আজহারকে বিয়ে করানো হয় একই উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামে। তার ঘরে জন্ম নেয় নিস্পাপ দুই শিশু আসাদুল (৪), মারুফা (২)। বর্তমানে আজহার এর সংসারে ৫ সদস্য। সরকারী অনুদান বলতে ৩ মাস পর পর প্রতিবন্ধি ভাতার ২ হাজার করে টাকা পেয়ে থাকেন।

৪/৫ বছর আগে বিদ্যানন্দ গ্রাম থেকে পুরাতন একটি ঘর স্থানীয়দের সহযোগিতা কিনে এনে দু’চালা ঘরে বাস করেন অন্ধ আজহার এর পরিবার। টিনে মরিচা পড়ায় ফাঁক ফোঁকর দিয়ে রাতের জোসনা, বৃষ্টির পানি ও শীতের তীব্রতা তারা হাড়ে হাড়ে টের পান। আজহারের মা খোদেজা খাতুন আরও জানান অন্যের কাছ একটি বকনা গরু বর্গা (লাভের অংশ অর্ধেকে) নিয়ে লালন-পালন করছেন। পাঁচ সদস্যের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কানা আজহার। কিভাবে চলবে তাদের সংসার এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমাদের আল্লাহ আছে। অনেক মাইনসে (মানুষ) দয়া করেন বলে আমরা খাবার পাইতাছি। পুলাডা (ছেলে) একদিন সড়কে না গেলে খাওন (ভাত) জুটে না। তাদের আশা সরকার ও বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে সংসারটিকে একটি গতি ও উপার্জনশীল করতে চেষ্টা করবে।

আজহারের স্ত্রী হাবিবা জানান, সামান্য জমিতে একটি ঘর নির্মাণ, দুধওয়ালা ২টি গাভী ও কিছু হাঁস-মুরগীর ব্যবস্থা এবং তা রাখার জন্য একটি কুড়ে ঘর পাওয়া গেলে অনেক উপকার হতো।

অন্ধ আজহার বলেন, ঘরে খাড়াইলে (দাড়ালে) বেশি ট্যাহা (টাকা) পাই। হাতে দিলেই বুইজা (বুঝি) হালাই (ফেলি) কয় ট্যাহার (টাকা) নোট। মাইনষের লেইগা দোয়া করি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার লীরা তরফদার জানান, নিরীহ এ সংসারটির খোঁজ খবর নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সকল ধরনের সহযোগিতা করা হবে।