| |

কিশোরগঞ্জে আজ “কানকাটি গণহত্যা দিবস”

নজরুল ইসলাম খায়রুলঃ কিশোরগঞ্জে আজ শুক্রবার ‘কানকাটি গণহত্যা দিবস’। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্যিুদ্ধে সারা বাংলাদেশের ন্যায় কিশোরগঞ্জ জেলার বেশ কয়েকটি স্থানে পাকবাহিনী তাদের এদেশীয় দালাল, রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনীর যোগসাজশে গণহত্যা সংঘটিত করেছিল। এই গণহত্যার মধ্যে ১১ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের কানিকাটি গ্রামের বর্বরোচিত গণহত্যা অন্যতম। পার্শ্ববর্তী বড়ইতলা গ্রামের গণহত্যার ভয়াবহতা ও ব্যাপকতা আরো অনেক বেশি হলেও কানকাটি গ্রামের তদানীন্তন ছাত্র নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বর্তমান অবসর প্রাপ্ত সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বাবু সুধীর চন্দ্র সরকারের একই পরিবারের ৬ জনকে হত্যার মধ্য দিয়ে এই গণহত্যার নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার মাত্রা বড়ইতলার গণহত্যাকেও হার মানায়। তাই প্রতিবছর এই দিনটি আসার আগেই এইদিনের স্মৃতি স্মরণ করে এলাকাবাসী এবং সুধীরচন্দ্র সরকারের পরিবারের স্বজনরা শোকে ভারাক্রান্ত হয় এবং এলাকাবাসী ১১ সেপ্টেম্বর সুধীরচন্দ্র সরকারের পুরাতন বসতভিটায় স্মরণসভা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। স্মরণ সভায় গণহত্যায় নিহত শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ঘাতকদের প্রতি তীব্র ঘৃণা, ধিক্কার ও নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সেই ভয়াবহ দিনের কথা আলোচিত হয় ।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র ৩ মাস ৫ দিন আগে ঘাতকরা এই হত্যাকান্ড সংঘটিত করেছিল। ১৬ ডিসেম্বর তাদের চূড়ান্ত পরাজয় ও আত্মসমর্পনের দিন পর্যন্ত তারা তাদের হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও ঘৃণ্য নারী ধর্ষণ চালিয়ে যায়। সারা বাংলাদেশে তারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।

আমাদের মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়েরা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে ৭১-এর ২৫ মার্চের রাত থেকেই দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে নিয়োজিত হয়। সমগ্র বাঙালিজাতি বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এই নব্য বর্গীদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে মরণপণ লড়াই চালায়। ঐ অবরুদ্ধ নয় মাস পাকিস্তানী বাহিনী তাদের এদেশীয় দালাল, রাজাকার, আল-বদর ও আল শামস বাহিনীল যোগ-সাজশে নিরীহ বাঙালিদের ওপর যে নির্যাতন ও লুটপাট চালায়, বাঙালি নারীর সভ্রম নিয়ে যে লাম্পট্য দেখায়, তা বর্ণনাতীত। অবশেষে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের ঋণে ও লাখ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি মহান স্বাধীনতা।
১৯৭১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কানকাটি গ্রামে ভোরের সূর্য তখনো উদিত হয়নি। পাকবাহিনী অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে গ্রামটি ঘিরে ফেলে ঘরে ঘরে অগ্নিসংযোগ করে উল্লাসে মেতে ওঠে। তাদের লক্ষ্য এলাকার স্বনামধন্য মুক্তিযোদ্ধা ও সংখ্যালঘু পরিবার সুরেশ চন্দ্র সরকার পরিবার তারা তাদের দালাল রাজাকারদের সহযোগিতায় সুরেশ চন্দ্র সরকার সহ তাঁর পরিবারের ৬ জন হর্ষবর্ধন সরকার, বিশ্বনাথ বর্ধন সরকার, জ্ঞান চন্দ্র নন্দী, জয়চন্দ্র নন্দী, মধুসূদন নন্দীসহ বেশ কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যায়। সে রাতেই গচিহাটার ধুলদিয়া রেল সেতুতে দাঁড় করিয়ে পাকবাহিনী তাদের ওপর প্রথমে পাশবিক নির্যাতন চালায় এবং পরে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে।

ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেন সুরেশ চন্দ্র সরকার পরিবারের একমাত্র সদস্য তৎকালীন কলেজ পড়–য়া সুধীর চন্দ্র সরকার। বর্তমানে রোগে-শোকে জর্জরিত অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের স্নেহধন্য যাকে সে সময় সারাক্ষণ শত্র“দের কবল থেকে দেশ মুক্তির তাড়নায় তাড়িত করতো। পরিবার-পরিজন হারিয়ে এ হৃদয় বিদারক হত্যাযজ্ঞে শহীদ সুরেশ চন্দ্র সরকারের ছেলে সুধীর চন্দ্র সরকার সেদিন শোকে মুহ্যমান হলেও প্রতিবাদে ছিলেন উচ্চকিত। শোককে তিনি শক্তিতে পরিণত করে উদ্যত হয়েছিলেন শত্র“ মোকাবেলায়। স্বপ্ন দেখছিলেন দেশ শত্র“মুক্ত হয়ে স্বাধীন হবে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে হত্যাকারী এবং তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর বিচার হবে। ৩ মাস ৫ দিন পর ঠিকই সুধীরচন্দ্র সরকারের স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়। আজ দেরিতে হলেও সর্বোচ্চ আদালতের বিচারের রায়ে স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে দেখে জীবন সায়া‎েহ্ন উপনীত সুধীর চন্দ্র সরকার অনেক খুশি। জীবদ্দশায় বাকীদেরও দ্রুত বিচার দেখে যেতে চান বলে তিনি জানান।
গত বেশ কয়েক বছর যাবত সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের কানকাটি গ্রামে ‘কানকাটি গণহত্যা দিবস’ স্মরণসভা বাস্তবায়ন কমিটি উদ্যোগে নানা কর্মসূচরি মধ্যদিয়ে পালিত হয়ে আসছে। এতে কানকাটি গ্রামে শহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার প্রয়াসে নির্মিত স্মৃতিসৌধে ভোরে পুষ্পস্তবক অর্পন এবং বিকেলে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। কিশোরগঞ্জের রাজনীতিক, সাংবাদিক, লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও সমাজের বিশিষ্টজনেররা এতে অংশ গ্রহণ করেন। স্মরণসভার মধ্যদিয়ে নতুন প্রজন্ম এই ভয়াবহ হত্যাকান্ড সম্পর্কে জেনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ঘাতকদের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রদর্শন করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারে। তাই প্রতিবছর স্মরণ সভার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে স্মরণসভা বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক এলাকার আওয়ামীলীগ নেতা ও বিশিষ্ট সমাজসেবক মোঃ চাঁন মিয়া বলেন, সুধীরচন্দ্র সরকার এখন জীবন সায়া‎েহ্ন উপনীত। পরিবার পরিজন হারিয়ে তিনি এই গণহত্যার ভিকটিম। তিনি যখন আমাদের মাঝে বেঁচে না থাকবেন, আমি যখন বেঁচে থাকবো না তখনো যেন স্মরণসভার আয়োজন করা হয় সেটি নিশ্চিত করার জন্য নতুন প্রজন্মকে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও কানকাটি গণহত্যা দিবস’ সম্পর্কে জানতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কানকাটি গণহত্যা দিবস উদযাপন বাস্তবায়ন কমিটির সমন্বয়কারী সহকারী অধ্যাপক মোঃ সামিউল হক মোল্লা বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, কানকাটি গণহত্যাসহ অসংখ্য গণহত্যায় নিহত শহীদদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন স্মরণসভার আয়োজন করে এ সকল শহীদদের নাম বিনম্র শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় এবং সম্মানের সহিত উচ্চারিত করা আমাদের যেমন কর্তব্য, তেমনি পবিত্র দায়িত্বও বটে ।