| |

ত্রিশালে চকপাড়া রেজিঃ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এমপিও আজো বন্ধ বিনা বেতনে ১৫ বছর, শিক্ষকদের মানবেতর জীবন যাপন

রফিকুল ইসলাম শামীমঃ
শামছুন্নাহার সহকারী শিক্ষক পদে একটি রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলেন ১৯৮৪ সালে,এখন তিনি ষাটোর্ধ। ১৯৯২ সালে এমপিও ভূক্ত হওয়ার সুবাদে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বেতনের টাকায় চলতো স্বামী ৬ সন্তানসহ পরিবারের সদস্যের সাংসারিক খরচ। ২০০৪ সালে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির দ্বন্ধে স্থগিত হয়ে যায় এমপিও আর বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যালয়টিতে চাকুরী করা ৪ জন শিক্ষকের বেতন। ওই বছরই স্বামীর মৃত্যু হওয়ায় ঘোর অন্ধকার নেমে আসে শামছুন্নাহারের পরিবারে। তারপরও দমে যাননি শামছুন্নাহার। বেতন না পেয়েও শহর হতে প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ও ঔই এলাকার খেটে খাওয়া সাধারন মানুষের ছেলে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে অব্যাহত রেখেছেন পাঠদান। বন্ধ হয়ে যাওয়া বেতন ভাতাদি ছুটার সিদ্ধান্তের আশায় শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের ধারস্থ হয়ে জুতোর তলি খোয়াতে খোয়াতে পার করেছেন ১৫ টি বছর। সংশ্লিষ্টকর্তা ব্যক্তিরা বেশ কয়েক বার আটকে যাওয়া বিষয়টির বিষয়ে পরিদর্শনে এলেই অদৃশ্য কারনে এগোয়নি ফাইল। শেষ পর্যন্ত গত ফ্রেবুয়ারীতে তিনি চলে গেছেন অবসরে। তারপরও তিনি আশা ছাড়েননি বিদ্যালয়টিতে লেখাপড়া করা ছোট ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মায়াও ছাড়েননি। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বন্ধ হয়নি তার স্কুলে আসা যাওয়া।
শিক্ষা অফিস সূত্রে জানাগেছে-১৯৯২ সালে মঠবাড়ী ইউনিয়নের মঠবাড়ী চকপাড়া রেজিঃ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এমপিও ভূক্ত হয়। অজোঁপাড়া গায়ে খেটে খাওয়া অক্ষর জ্ঞানহীন সাধারন মানুষের ছেলে মেয়েদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়াতে ১৯৬৮ সালে প্রধান শিক্ষকসহ তিনজন সহকারি শিক্ষক নিয়ে শুরু হয়ছিল বিদ্যালয়টির পথচলা। পথ চলার ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালে চার কক্ষ বিশিষ্ট একটি পাকা ভবন নির্মিত হয়। নিরক্ষর মানুষগুলোর মধ্যে যখন জ্ঞানের প্রদীপ জ্বলতে শুরু করল ঠিক তখনই প্রধান শিক্ষকও বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটির সভাপতির মধ্যে বাধে দ্বন্ধ। দ্বন্ধ আর রেষারেষির ফলে ২০০৪ সালে স্থগিত হয়ে যায় বিদ্যালয়ের এমপিও। এমপিও স্থগিত হওয়াতে বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষকদের বেতনও। একদিন এর আশু মিমাংসা হবে এই আশায় শিক্ষা বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে শিক্ষকরা যোগাযোগের পাশাপাশি চালিয়ে যান পাঠদান ও বিদ্যালয়ের অন্যান্য কার্যক্রম। প্রতি বছর ওই বিদ্যালয় থেকে সমাপনিতে অংশগ্রহন করেন শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ ২০১৮ সালের সমাপনি পরীক্ষায় অংশ নেয়া ৮ জনই উত্তীর্ণ হয়। বেতন বিহীন ১৫ বছরের গ্লানী নিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করা শামছুন্নাহার এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে অবসরে যান। বিদ্যালয়ের প্রতি মমতা ছাড়তে না পেরে এখনও অবশিষ্ট থাকা একমাত্র শিক্ষিকা নুরুন্নাহারের সঙ্গে পাঠদানে সময় দিয়ে যাচ্ছেন শামছুন্নাহার।
সরেজমিন গতকাল রোববার ওই বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ২০০১ সালে নির্মিত চার কক্ষ বিশিষ্ট পাকা ভবনটির অবস্থাও জরাজীর্ণ। খসে পড়েছে ভবনের ছাদ ও পিলারের আস্তর ও। এই বিদ্যালয়টির ৩ কিলোমিটারের মধ্যে আর কোন বিদ্যালয় না থাকায় ৪ জন শিক্ষকের মধ্যে ৩ জন অবসরে তাই ঝুঁকিপূর্ণ ওই ভবনেই নিয়মিত একজন শিক্ষকের ওপর ভরসা করেই ক্লাস করছেন ১৫২ শিশু শিক্ষার্থীরা।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ওই বিদ্যালয় থেকে ২০০৫ সালে সমাপনি পরীক্ষা দেয়া তিতুমীর কলেজের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী আনোয়ার হোসেনের। তিনি প্রতিবেদককে বলেন আমাদের এই বিদ্যালয়ের কারনেই আমাদের এই অঞ্চলের গরীব অসহায় শিশুরা শিক্ষার আলো দেখতে পেয়েছে। বিদ্যালয়টি টিকে না থাকলে অকালেই ঝরে পড়বে এই এলাকার অনেক শিশু। এই অঁজপাড়া গাঁয়ের সাধারন মানুষগুলো এখনও তেমন সচেতন হয়ে উঠেনি। ২ নারী শিক্ষকের প্রচেষ্টার ফলে বিদ্যালয়ে আসছে শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয়ের ৩ শিক্ষার্থীর অভিভাবক কৃষক খোকা মিয়া বলেন, আমরা গ্রামবাসি খুবই হতাশাগ্রস্থ, কবে না জানি বিদ্যালয়টি পুরোদমে বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের এই এলাকার বাচ্চাদের শিক্ষার এক মাত্র এই বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে সন্তানদের শিক্ষিত করা দুস্কর হয়ে পড়বে।
সদ্য অবসরে যাওয়া শামছুন্নাহার দুচোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আমি এখনও নিয়মিত স্কুলে আসি। বয়সের কারনে চলাফেরা করতে না পারলেও অসুস্থ শরীর নিয়ে ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি করেও এখনো এর কোন সুরাহা পাচ্ছিনা। আমার বেতনের দরকার নেই বেঁচে থাকতে এই বিদ্যালয়টি বাচিয়ে রাখার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।
এ ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ জানান, এটা অত্যন্ত অমানবিক একটা ঘটনা। পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রথম ধাপেই বিদ্যালয়টি সরকারিকরণের আওতায় পড়ে। কিন্তু উপজেলা শিক্ষা বিভাগ, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির পারস্পারিক দ্বন্ধের কারনে এখনো বিদ্যালয়টির এমপিও স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়নি।