| |

আধুনিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় উৎসব পহেলা বৈশাখ -ড. দেওয়ান রাশীদুল হাসান

বাংলাদেশ হাজার বছরের পুরানো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলছে। আধুনিক পৃথিবীর প্রায় সকল জাতিসওার ঐতিহ্যের একটি অনিবার্য অংশ নববর্ষ। প্রতিটি জাতি ও সভ্যতা সংস্কৃতির মাধ্যমে খুঁজে পায় তার নিজস্ব অনুভুতি এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্য । বাংলাদেশী ও বাঙালি জাতি হিসেবে, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আমাদের এমন একটি উৎসব হল পহেলা বৈশাখ । বাঙালির সহ¯্র্র বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রীতি-নীতি, প্রথা, আচার অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক । ইংরেজি এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়। শহরে তো বটেই, বাংলা নববর্ষের উৎসবটি গ্রামবাংলার মানুষের কাছেও কিন্তু খুবই আপন। কারণ বাংলা নববর্ষের এই উৎসবটি আসলে গ্রাম থেকেই এসেছে । এ উৎসবটি আমাদের গ্রামবাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্য হলো ‘শুভ নববর্ষ’। কারণ, সংস্কৃতির বৈচিএ না থাকলে আমাদের মধ্যে একঘেঁয়েমি আসতে বাধ্য। সংস্কৃতির এই বহুত্ব আমাদেরকে আনন্দ দেয়, সুখী রাখে। প্রত্যেক সংস্কৃতি আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং মূল্যবোধে সমৃদ্ধ।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি বলতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশের গণমানুষের সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য, ভোজনরীতি, পোষাক, উৎসব ইত্যাদির মিথস্ক্রিয়াকে বোঝানো হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই এই সংস্কৃতি ভারতীয় সংস্কৃতির কাছ থেকে ধার করা কিংবা প্রভাবান্বিত। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এক অনন্য ও অন্যতম জাতীয় উৎসব পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সঙ্গীতানুষ্ঠান । পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের পর পর ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃতপক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়,অশ্বথ্থ গাছ। ১৯৬০ এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা।এরপরও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর বিশ্বায়নের প্রভাবে এর ভাষা ও সংস্কৃতি নানা ভাবে বিনিষ্ট হতে চলছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলনেও পহেলা বৈশাখ এক নতুন মাত্রা যোগ করে। তৎকালীন আইয়ুব সরকারের আমলে রবীন্দ্রসঙ্গীত তথা বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার বিরোধিতার প্রতিবাদস্বরুপই বৈশাখের প্রথম দিনে ছায়ানট রমনার বটমূলে নববর্ষ পালনের আয়োজন করে। পরে ক্রমশই এ অনুষ্ঠান বিপুল জনসমর্থন লাভ করে এবং স্বাধীকার আন্দোলনের চেতনায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নীতির বিরুদ্ধে ও বাঙালি আদর্শের লালনে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় বাংলা নববর্ষ পালিত হতে থাকে। স্বাধীনতা উওরকালে সংস্কৃতি অঙ্গনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন একটি বিশেষ গুরুত্বপুর্ন বিষয়ে পরিণত হয়। বর্তমানে বাংলা নববর্ষ জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।
হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বার মাস অনেককাল আগে থেকেই পালিত হতো। এই পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকার এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন ভারতবর্ষেও পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়– এবং ত্রিপুরা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হতো । এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিওে পালিত একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিলনা। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ, কারণ, প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হত।
ভারতবর্ষে মুঘল সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর স¤্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা’ কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হত। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল স¤্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। স¤্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিওি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বির্নিমাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহনের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন,পরে ”বঙ্গাব্দ” বা বংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।
মুঘল স¤্রাট আকবরের সময়কাল থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রজারা প্রত্যেকেই বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভুমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রুপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন ‘হিসাব বই’ বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বানিজ্যিক এলাকা,সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনো অনেকাংশে প্রচলিত আছে,বিশেষত স্বর্নের দোকানে। বাঙালিরা এই দিনে নিজেদের বাড়ি ঘরের সবকিছু ঘষে মেজে ঝকঝকে তকতকে পরিস্কার করে রাখে।
বাংলাদেশের যেসব স্থানে বৈশাখী মেলা বসে সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: নারায়নগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, রংপুরের পায়রাবন্দ, দিনাজপুরের ফুলছড়ি ঘাট এলাকা, মহাস্থানগড়, কুমিল্লার লাঙ্গলকোট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মহেশপুর, খুলনার সাতগাছি, ময়মনসিংহÑটাঙ্গাইল অঞ্চল, সিলেটের জাফলং, মনিপুর, বরিশালের ব্যাসকাঠিÑবাটনাতলা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, টুঙ্গীপাড়া ও মুজিবনগর এলাকা। ঢাকার নিকটবর্তী শুভাঢ্যার বৈশাখী মেলা, টঙ্গীর ¯œানকাটা মেলা, মিরপুর দিগাঁও মেলা, সোলারটেক মেলা, শ্যামসিদ্ধি মেলা, ভাগ্যকুল মেলা, কুকুটিয়া মেলা এবং রাজনগর মেলা উল্লেখযোগ্য । দিনাজপুরের ফুলতলি, রানীশংকৈল,রাজশাহীর শিবতলীর বৈশাখী মেলাও বর্তমানে বিরাট উৎসবের রুপ নিয়েছে।
কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরানো উৎসবে বিলুপ্তি ঘটেছে,আবার সংযোগ ঘটেছে। অনেক নতুন উৎসবের। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে পুণ্যাহ উৎসবের বিলুপ্তি ঘটে। তখন পহেলা বৈশাখ ছিলো জমিদারদের পুণ্যাহের দিন। ঢাকার ঘুড়ি ওড়ানো এবং মুন্সিগঞ্জের গরুর দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল এক সময় অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ন। কিন্তু এ দুটিসহ ঘোড় দৌড়, ষাড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, পায়রা ওড়ানো, নৌকা বাইচ, বহুরুপীরসাজ ইত্যাদি গ্রামবাংলার জনপ্রিয় খেলা বর্তমানে আর তেমন প্রচলিত নেই। বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন আঞ্চলিক অনুষ্ঠানের মধ্যে চট্টগ্রামের বলীখেলা এবং রাজশাহীর গম্ভীরা প্রবল উৎসাহÑউদ্দীপনায় অনুষ্ঠিত হয়।
প্রকৃতপক্ষে, মানব সভ্যতার অগ্রগতি ও উন্নয়নের পথ ধরে সব কিছুতেই লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। বর্তমানে নগরজীবনে নগর সংস্কৃতির আদলে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্নভাবে নববর্ষ উৎযাপিত হয়। পহেলা বৈশাখের প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। এ সময় নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে উদ্যানের কোন বৃহৎ বৃক্ষমূলে বা লেকের ধারে অতি প্রত্যূষে নগরবাসীরা সমবেত হয়। নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করে। এদিন সাধারনত সব শ্রেনীর এবং সব বয়সের মানুষ ঐতিহ্যবাহী বাঙ্গালী পোশাক পরিধান করে।
নববর্ষকে স্বাগত জানাতে তরুনীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরে; আর ছেলেরা পরে পাজামা ও পাঞ্জাবি। কেউ কেউ ধুতি-পাঞ্জাবিও পরে। এ দিন সকালবেলা পানতা ভাত খাওয়া একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। সঙ্গে থাকে ইলিশ মাছ ভাজা। এভাবে লোকজ বর্ষবরণ প্রথাগুলির কোন কোনটির অনুসরণের মাধ্যমে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অনেকটা সংরক্ষিত হচ্ছে।
বাংলা নববর্ষ ও চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় Ñ সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। বৈসাবি হলো পাহাড়ীদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরারা বৈসুক বলে আখ্যা বৈসুক বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা বৈসাবি নামেই পরিচিত। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু এই নামগুলির আদ্যক্ষর নিয়ে বৈসাবি শব্দের উৎপওি। বছরের শেষ দুদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন এ তিনদিন মিলেই মূলত বর্ষবরন উৎসব বিজু পালিত হয়। পুরনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ উপলক্ষে পাহাড়ীরা তিনদিন ব্যাপী এ বর্ষবরন উৎসব সেই আদিকাল থেকে পালন করে আসছে। এ উৎসব উপলক্ষে পাহাড়ীদের বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আদিবাসী মেলার আয়োজন করা হয়।
নববর্ষের দিন মারমা উপজাতীয়রা আয়োজন করে ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল’ বা পানি খেলা। পানিকে পবিত্রতার প্রতীক ধরে নিয়ে মারমারা তরুণ তরুণীদের পানি ছিটিয়ে পবিত্র ও শুদ্ধ করে নেয়। পাহাড়ীদের মধ্যে পানি উৎসবটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীরা বৈসাবি উৎসবকে তিনটি ভাগে পালন করে। প্রথম দিনটির নাম ফুলবিজু। এ দিন শিশুকিশোররা ফুল তুলে ঘর সাজায়। দ্বিতীয় দিনটি মুরুবিজু । এ দিনে হয় মূল অনুষ্ঠান । এ দিন নানারকম সব্জির সমন্বয়ে এক ধরনের নিরামিষ রান্না করা হয়, যার নাম পাজন। এটি বৈসাবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা ও মিষ্টান্ন ও তৈরি করা হয়। অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য এদিন সবার ঘরের দরজা খোলা থাকে।
স্মরণাতীত কাল থেকে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ দেশের লোকজ ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়ে আছে। বৈশাখী মেলা বা উৎসব এদেশে বছরের সর্ববৃহৎ ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব এবং বাঙালি সংস্কৃতির একান্ত নিজস্ব ও অবিচ্ছেদ্য অংশ । এ উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা বর্ষপঞ্জি, দেশের উৎপাদনশীলতা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিওি। বর্ষপঞ্জিটি কৃষিচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এ সংযোগ এতই অবিচ্ছেদ্য যে, বাংলা নববর্ষ ’ফসলি বর্ষ’’ বা ’ফসল বর্ষ’ নামেও পরিচিত ছিল। এ উৎসবে কোনো ধর্মীয় প্রভাব নেই এবং এটা অবাধে সংস্কৃত ও ফার্সি আরবী ঐতিহ্য থেকে গৃহীত । নববর্ষ মানেই পুরনো, জীর্ণ এক অস্তিত্বকে বিদায় দিয়ে সতেজ, সজীব নবীন এক জীবনের মধ্যে প্রবেশ করার আনন্দানূভুতি। এ উৎসব সার্বজনীন অর্থাৎ বাংলা হিন্দু মুসলমান, বৌদ্ধ খ্রিস্টান নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালি জাতির। ধর্মীয় সংকীর্ণতার বৃও অতিক্রম করে বছরের প্রথম দিনটি যে আমাদের জাতীয় চেতনার ধারক হয়ে উঠেছে, তা’ মনে রেখে নববর্ষের মাধ্যমে সচেতনভাবে নতুন মাত্রিকতা যোগ করতে হবে। বাংলাদেশে বসবাসকারী উচ্চবিও, মধ্যবিও বা দীন দরিদ্র কৃষক থেকে শুরু করে বাংলা ভাষাভাষি মানুষের প্রাণের উৎসব এটি। তবে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রভাবে দেশীয় সংস্কৃতেিত আজ মহা বর্পিযয় নেমে এসেছে।
সুখ-শান্তি সমৃদ্ধি ও কল্যাণের প্রত্যাশা নিয়ে পহেলা বৈশাখে গ্রাম-নগর, বন্দর নির্বিশেষে বাংলার সব মানুষ নববর্ষের উৎসবে যোগ দেয়। পরস্পরের বাড়িতে যাওয়া আসা, শুভেচ্ছা বিনিময়, খাওয়া দাওয়া, নানা রকম খেলাধূলা ও আনন্দ – উৎসব মেলা প্রদর্শনী মিলে সারা বছরের অন্যান্য দিন থেকে পহেলা বৈশাখ দিনটি সম্পূর্ন স্বতন্ত্র ও গৌরবমন্ডিত হয়ে ওঠে। বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বায়নের ধ্বংসাত্মক প্রবাহের মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিএ সংরক্ষণ করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলা সার্বজনীন পহেলা বৈশাখের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের মানুষের মাঝে সব ভেদাভেদ দূর হয়ে যায়। নতুন আশা ও উদ্দীপনার নতুন বছর বাঙালি সংস্কৃতির উজ্জল দিক বাংলা নববর্ষ আমাদের অস্তিত্ব ও অনুভবের সঙ্গে মিশে থাকে। সারাবিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও নাগরিক বাঙালির জীবনের সাংস্কৃতির অঙ্গ পহেলা বৈশাখ এখন জাতীয় চেতনারই একটি অংশে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস ঐতিহ্যে ও আধুনিক জীবন সংস্কৃতিতে উৎসব আয়োজনের শ্বাশত আন্তরিকতায় নববর্ষের নবীন প্রাতে আমাদের অন্তর বিকশিত ও সুন্দর হউক, পরমতসহিষ্ণুতা, সদ্ভাব, ভ্রাতৃত্ববোধ, বিবেক এবং মনুষ্যত্বের দীক্ষায়। সংস্কৃতির চর্চা মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়। দেশের সংস্কৃতি জগৎকে সমৃদ্ধ করে, সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে সবার অন্তরকে আলোকিত করে। তাই, বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখ জাতীয় প্রগতির আলোয় ধারাবাহিকভাবে উন্মোচিত।
লেখক: সার্ক রিসার্চ স্কলার, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, আসাম বিশ^বিদ্যালয়, ভারত, খ্যাতনামা জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট সাংবাদিক