| |

পবিত্র মহররম মাসের তাৎপর্য, কারবালার করুণ পরিণতি ও আশুরার শিক্ষা -ড. দেওয়ান রাশীদুল হাসান

ইসলামের ইতিহাসে বিশ্বের মুসলিম চেতনার সবচেয়ে মর্মাস্তিক ও হৃদয়বিদারক কাহিনীর এক জ্বলন্ত সাক্ষী মহররম মাস। আরবী ‘মহররম’ শব্দের অর্থ অলঙ্ঘনীয় পবিএতা। আরবে অনুসৃত প্রথা অনুযায়ী মহররম মাস থেকেই ইসলামী বর্ষ হিজরি সন শুরু এবং সর্বশেষ হচ্ছে জিলহজ মাস । আধুনিক বিশ্বের মানুষ ইতোমধ্যে হিজরি ১৪৪০ সনে প্রবেশ করেছে। অধিক সম্মানিত মাসগুলোর মধ্যে প্রথম মাস মহররম। হিজরি সন মূলত চান্দ্র বর্ষ নির্ভর। চান্দ্র মাস ২৯ ও ৩০ দিনে হয় বিধায় ৩৫ বা ৩৫৫ দিনে পূর্ণ হয়। তাই চান্দ্র বর্ষ ও সৌর বর্ষে সাধারণত ১০ বা ১১ দিনের পার্থক্য হয়। মাসগুলো আরবী হলেও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। হিজরি সনের মাসগুলোর তারিখ ব্যবহার ও চর্চা রাখা মুসলমানদের জন্য কর্তব্য। এখানে মনে রাখতে হবে ইসলামী তারিখ বা চান্দ্র বর্ষের হিসাব রক্ষা মুসলমানদের জন্য ফরযে কেফায়া। মহররম শুধু হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস নয়, এর সঙ্গে জড়িত আছে বহু নবী রসূলদের পূণ্যময় পবিএ ঐতিহাসিক স্মৃতি।
মহান আল্লাহ তা‘আলা বার মাসের মধ্যে মুহাররম, রজব, যুলক্বা‘দাহ ও যুলহিজ্জাহ এই চারটি মাসকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। এই মাসগুলো ‘হারাম’ বা সম্মানিত মাস হিসাবে পরিগণিত। ঝগড়া-বিবাদ, লড়াই, খুন-খারাবী ইত্যাদি অন্যায়-অপকর্ম হ’তে দূরে থেকে এর মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘এই মাসগুলিতে তোমরা পরস্পরের উপরে অত্যাচার করনা’ । মহান আল্লাহ পাক বলেন যে, মাস হচ্ছে বারটি । তন্মধ্যে, জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব- এ চারটি মাস খুবই সম্মানিত ও বরকতময়। এই চার মাস ঝগড়া বিবাদ কলহ-কোন্দল এবং যুদ্ধ বিগ্রহ করা হারাম। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এ মাসগুলোতে তোমরা পরস্পরের ওপর অত্যাচার করো না।’ (সূরাহ তাওবা, ৩৬)। আশুরার মূল ইবাদত হলো রোজা। মুসলমানরা রোজা পালনের মাধ্যমে আশুরার মাহাত্ম্য স্মরণ করে । হাদিস ও ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় মহররম মাসের দশম তারিখকেই আশুরা বলা হয়। মহান আল্লাহ এ মাসেই আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন। আবার এ মাসেই দুনিয়া ধ্বংস করবেন। এ মাসে তিনি তাঁর নবী-রাসূলকে অনেক বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত করেছেন। অনেকের তওবা কবুল করেছেন। ঘটনাবহুল এই ঐতিহাসিক দিনেই (১) হযরত আদম (আ.) এর দোয়া ও তাওবাহ কবুল হয়েছিল। (২) হযরত ইদ্রিস (আ.) কে সম্মানিত উচ্চ স্থানে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল । (৩) হযরত নূহ (আ.) এর নৌকা জুদী পাহাড়ে গিয়ে ঠেকেছিল। (৪) হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর জন্ম, খলিল উপাধি লাভ এবং নমরুদের অগ্নিকুন্ড হতে মুক্তি লাভ করেছিলেন। (৫) হযরত দাউদ (আ.) এর তাওবাহ কবুল এবং তাঁর পুত্র হযরত সোলায়মান (আ.) এর হারানো রাজত্ব পুণরায় ফিরে পেয়েছিলেন। (৬) হযরত আইয়ুব (আ.) এর রোগ নিরাময় হয়েছিল। (৭) আল্লাহ’তায়ালা ফেরাউনকে সদলবলে নীল নদে ডুবিয়ে মেরেছিলেন এবং হযরত মুসা (আ.) কে সহজেই দরিয়া পার করে দিয়েছিলেন। (৮) হযরত ইউনূস (আ.) মাছের পেট হতে মুক্তি লাভ করেছিলেন। (৯) হযরত ঈসা (আ.) কে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল এবং (১০) আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর রুহ মুবারক সৃষ্টি করা হয়েছিল।
ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার শাসন ব্যবস্থা মহানবী হযরত মুহাম্মাদের (সা.) আদর্শের অনুকূলে ছিল না বিধায় ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ৬১ হিজরীর ১০ই মহররম কারবালার ময়দানে হযরত ইমাম হোসেন (রা.) ও ইয়াজিদ বাহিনীর মধ্যে এ অসম যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হযরত হোসেন (রা.)-এর শিবিরে ৩২ জন ঘোড় সওয়ার এবং ৪০ জন সৈন্য ছিল তরবারি চালানোর মতো। পক্ষান্তরে ইয়াজিদের নির্দেশে কুফার গভর্নর চার হাজার রণ নিপুণ সৈন্য পাঠিয়েছিল। এ অসম যুদ্ধে পরাজয় ও মৃত্যু ছিল নিশ্চিত। তারপরও কেন স্বে”ছায় আত্মত্যাগ? কারণ, শর্ত ছিল, হয় ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকার কর, না হয় যুদ্ধ কর। রাসূল (সা.)-এর কলিজার টুকরাসম দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.) একটি মুহূর্তের জন্যও ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকার করে ইসলামী খেলাফতের মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করতে চাননি। এমতাবস্থায় মুসলিম উম্মাহর মধ্যে শান্তি-শৃংখলা স্থাপনের জন্য একটি লিখিত চুক্তি হয়। যেখানে বলা হয়, হযরত মুয়াবিয়ার পর হযরত হোসেন (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। কিš‘ মুয়াবিয়া তাঁর খেলাফত পরিচালনার শেষ সময়ে স্বীয় পুত্র ইয়াজিদকে খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণের প্রস্তাব দেন। তখন জটিল সমস্যা সৃষ্টি হয়। ইয়াজিদ জনমতের কোন তোয়াক্কা না করে নিজেই খেলাফতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। তখন সর্বত্র বিশৃংখলা দেখা দেয়। ইসলামী খেলাফতের মর্যাদাকে ধ্বংস করে রাজতন্ত্রের সূত্রপাতকে বেশিরভাগ মুসলমান সে সময় মানতে পারেননি। যার কারণে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করে এজিদের বিরুদ্ধে। ইয়াজিদ ভাবল, চারদিকের বিদ্রোহ দমন করার চেয়ে বরং হোসেনকে (রা.) যদি দুনিয়া হতে সরিয়ে দেয়া যায় তাহলে সব মামলা চুকে যায়। সাথে সাথে নিজের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব অনায়াসে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ইসলামী খেলাফতে কলঙ্ক সৃষ্টিকারী নরাধম ইয়াজিদ হযরত ইমাম হোসেনকে (রা.) হত্যা করার পরিকল্পনা করল, যিনি বেহেশতের সব পুরুষের সরদার হবেন। এই কথা রসূল (স.) বলেছিলেন, হাসান-হোসেন (রা.) দুই ভাই হবে বেহেশতের সব পুরুষের সরদার। তখন থেকেই রসূলের (সা.) সাহাবীরা তাদেরকে আরো বেশি বেশি মহব্বত করার, খুশি করার চেষ্টা করতেন। তাঁরা কষ্ট পান এমন কোন কাজ কেউ করতেন না।
হযরত ইমাম হোসেন (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-এর পরিবারের সতেরজন শিশু-কিশোর-যুবকসহ মোট ৭২ জন মর্দে মুজাহিদ কারবালার এইদিনে প্রান্তরে ফোরাতের দুকূল ছাপা নদীর কিনারায় এক বিন্দু পানি হতে বঞ্চিত হয়ে শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছিলেন। রসূল (সা.)-এর দৌহিত্র হোসেন (রা.)-এর পবিত্র মস্তক নিষ্ঠুর নরাধম শিমার ছিন্ন করে কুফার গভর্নর দুরাচার ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের দরবারে প্রেরণ করেছিল। এই ঘটনার নেপথ্যে যারা কাজ করছে তারা ইতিহাসের পাতায় ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে। ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর পরিবারবর্গ শাহাদাতের পরপরই ঐসব নেপথ্য নায়কদের করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে হাজারো করুণ ও হৃদয়বিদারক ঘটনার একটি হচ্ছে কারবালার যুদ্ধ। এ যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রারম্ভে হযরত হোসেন (রা.) একটি মর্মস্পর্শী ভাষণ দিলেন, হে লোকসকল ! তাড়াহুড়া করো না। আগে আমার কয়েকটি কথা শোন। আমার কথা যদি তোমরা মেনে নাও এবং আমার প্রতি যদি সুবিচার কর, তাহলে তোমরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মানুষ বলে পরিগণিত হবে। তোমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করে আমার সাথে যে আচরণ করতে চাও তা করে নাও। আল্লাহই আমার একমাত্র সহায়। তিনিই তাঁর সৎ বান্দাদেরকে সাহায্য করে থাকেন। হযরত হোসেনের (রা.)এই কথা শুনে তাঁর শিবিরে কান্নার রোল পড়ে গেল। তখন হোসেন (রা.) হয়ত মনে মনে বলছিলেন, এখনো তো কান্নার অনেক বাকী। যথারীতি যুদ্ধ শুরু হলো। প্রবল বীর বিক্রমে মুসলিম সৈনিকেরা শাহাদাতের পেয়ালা হাতে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রায় দুই হাজার শত্রু সৈন্য খতম করে দিলেন। কিন্তুমুসলিম বাহিনী হতেও ঝরে পড়লো অনেকগুলো তরতাজা প্রাণ।
ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের বা ইয়াজিদের বাহিনী পানির দখল নিয়ে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই হোসেন (রা.) শিবিরে পানির জন্য হাহাকার পড়ে গেল। কাসেমকে কোলে নিয়ে শত্রুদের কাছে এক কাতরা পানি প্রার্থনা করলেন। কিš‘ শত্রু ইয়াজিদের বাহিনী পানি না দেয়ায় তারা মৃত্যুবরণ করল। শিশু পুত্র আলী আকবর ও কাসেমের মৃত্যু হযরত হোসেনকে (রা.) আবারো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করলো। তিনি অনেক শত্রু নিধন করলেন। অবশেষে একটি তীর এসে তাঁর গলা মোবারক অবধি বিদ্ধ হলো। সাথে সাথে ঘোড়ার পৃষ্ঠ হতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। একটানে তীরটি বের করে ফেললেন ও শত্রুদের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকলেন। কিন্তু গন্ডদেশ হতে রক্তক্ষরণ তাঁকে দুর্বল করে ফেলল। এমতাবস্থায় পরপর কয়েকটি তীরবিদ্ধ হলেন হোসেন (রা.)। অবশেষে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। কাফেরেরা তাঁর মস্তক কাটার জন্য ইতস্তত করতেছিল। কিন্তু নিষ্ঠুর পাষন্ড নরখাদক শিমার হযরত হেসেন (রা.)-এর মস্তক কর্তন করে তা নিয়ে ইয়াজিদের দরবারে পৌঁছালো। যুদ্ধে জয়নাল আবেদীন ছাড়া সবাই শাহাদতবরণ করেন।
ইমাম হোসেনের (রা.) শাহাদাতের ঘটনার মূল নায়ক পাপিষ্ঠ ইয়াজিদ। ইয়াজিদের নির্দেশেই কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসেনকে (রা.) শহীদ করা হয়। কারবালার যুদ্ধের পর মুসলিম দুনিয়ায় বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠলো। বিশেষ করে মক্কা-মদীনার অধিবাসীগণ ইয়াজিদের এহেন কুকর্মের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে লাগল। ইতোমধ্যে ইয়াজিদ বাহিনী মক্কা-মদীনা আক্রমণ করে বহুসংখ্যক লোককে শহীদ করল। ইয়াজিদ এক অজ্ঞাত রোগে মারা যায়। তার অনুসারীরা রাতের আঁধারে পাপিষ্ঠ ইয়াজিদকে অজ্ঞাত স্থানে কবর দিয়াছিল। আজ পর্যন্ত কেউ ইয়াজিদের কবরের সন্ধান পায়নি। ইয়াজিদের মৃত্যুর পর তার ছেলের হাতে লোকেরা বাইয়াত গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করল। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। এরপর সে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ৪০ দিন পর মারা যায়।
ইয়াজিদের মৃত্যুর পর মারওয়ান ক্ষমতা দখল করল। এর পরপরই মক্কা-মদীনা ও কুফাসহ সমগ্র আরব বিশ্বে বিদ্রোহ চরম আকারে দেখা দিল। কুফাবাসীরা বেশি অনুতপ্ত ছিল। কেননা তাদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে কারবালা প্রান্তরে এহেন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল। তারা ভাবল, কিভাবে এর প্রায়শ্চিত্ত করা যায়। কুফার গভর্ণর ইবনে যিয়াদ পালিয়ে দামেস্কে চলে যায়। এরপর মুখতার সাকাফী কুফার গভর্ণরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুখতার সাকাফী ইমাম হোসেনের (রা.) শাহাদাতের বদলা নেয়ার জন্য ডাক দিলো। সাথে সাথে সমগ্র কুফাবাসী তার আহবানে সাড়া দিল। শুরু হলো প্রতিশোধ নেয়ার পালা। সর্ব প্রথম সেই নরাধম, পাপিষ্ঠ আমর বিন সাদকে তলব করা হলো, যে ইয়াজিদের বর্বর বাহিনীর সেনাপতি ছিল এবং তারই পরিচালনায় কারবালায় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তার ছেলে এসে বলল, আমার পিতা এখন সবকিছু ত্যাগ করে নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করছে। তিনি ঘর থেকে বের হন না। সাকাফী কোন অজুহাত গ্রহণ করলেন না। তারপর তাকে ধরে এনে পিতা-পুত্রের মাথা কেটে মদীনা শরীফে মুহাম্মদ বিন হানফিয়ার কাছে পাঠিয়েছিল।
ফোরাত নদীর প্রান্তরে হাওলা বিন ইয়াজিদ ইমাম হোসেনের (রা.) মস্তক দেহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে তার নিজের ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। তাকে ধরে এনে হাত-পা কেটে শূলে চড়ানো হলো। তার লাশ জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। শিমার ইমাম হোসেনের(রা.) গলায় ছুরি চালিয়েছিল। মুখতার সাকাফী যখন ইমাম হোসেন (রা.)-এর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারী এক একজনকে হত্যা করছিল তখন পাপিষ্ঠ শিমার কুফা থেকে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। এ পাপিষ্ঠের শেষ রক্ষা হয়নি। সে মুখতার সাকাফীর বাহিনীর হাতে ধরা পড়ল। তাকে দু টুকরা করে মুখতার সাকাফীর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং লাশ কুকুরকে দিয়ে খাওয়ানো হয়েছিল।
হাকিম বিন তোফায়েল হযরত আব্বাস (রা.)-এর শরীর থেকে পোশাক খুলে নিয়েছিল এবং ইমাম হোসাইনের(রা.) প্রতি তীর নিক্ষেপ করেছিল, তাকেও হত্যা করা হয়েছিল এবং তার মাথা বর্শার অগ্রভাগে উঠিয়ে মুখতার সাকাফীর সামনে আনা হয়েছিল। যায়েদ বিন রেকাত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)-এর কপালে তীর নিক্ষেপ করেছিল। তাকে ধরে এনে জীবিত জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমর বিন সবী গর্ব করে বলে বেড়াত আমি হোসাইনের (রা.) সহচর কোন সাহাবীকে হত্যা করার সুযোগ পাইনি বটে, কিন্তু তীর নিক্ষেপ করে অনেককে যখম করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তাকে ধরে সকলের সামনে বর্শার আঘাতে হত্যা করা হয়েছিল। ইয়াজিদের পর এই নরাধম ইবনে জিয়াদ সবচেয়ে জঘন্য অপরাধী। কারবালার ঘটনার সময় এই ব্যক্তি কুফার গভর্ণর ছিল।
পরবর্তী সময়ে কুফার গভর্ণর মুখতার সাকাফী এই নরাধমকে হত্যা না করা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। সে ইব্রাহিম বিন মালেক আলতাবকে এক বিরাট সৈন্যবাহিনী ইবনে জিয়াদকে পরাস্ত করার জন্য প্রেরণ করল। মুসল শহরের নিকটে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। এ যুদ্ধে ইবনে জিয়াদের বাহিনীর পরাজয় ঘটে। ইবনে জিয়াদ পলায়নকালে ইব্রাহিম মালেকের সৈন্যবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। ইব্রাহিম মালেককে সৈন্যরা ইবনে জিয়াদের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। দেহ আগুনে পুড়িয়ে দেয়। মাথা বর্শার অগ্রভাগে তুলে কুফায় নিয়ে আসে। তখন সাকাফী কুফাবাসীর উদ্দেশ্য করে বলে, দেখ আজ থেকে ছয় বছরে আগে এই দিনেই এই জায়গায়, এই জালিমের সামনে ইমাম হোসেন(রা)-এর মস্তক রাখা হয়েছিল। আজ আমার সামনে সেই জালিমের মাথা রাখা হয়েছে। এভাবে মুখতার সাকাফী কারবালার শহীদদের পবিত্র রক্তের যথাযথ বদলা নিয়েছিলেন। ইতিহাস সাক্ষী ইমাম হোসেন (রা.)-কে কারবালা প্রান্তরে যারা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল মাত্র ৫০ বছরের ব্যবধানে তাদের প্রত্যেকের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে করুণ পন্থায় (আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.)।
হজরত আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রমজানের পর সব রোজার (নফল) মধ্যে আশুরার রোজা সর্বশ্রেষ্ঠ’ (জামে তিরমিজি ১/১৫৬)। পবিত্র আশুরার দিন রোজা রাখার ফজিলত সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘আমি আশা করি যে ব্যক্তি আশুরা দিবসে রোজা রাখবে তার এক বছরের গুনাহের কাফ্ফারা (ক্ষমা) হয়ে যাবে।’ (মুসলিম, ১/৩৬৭)। আশুরার দিন রোজা রাখলে ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় রাসুলুল্লাহ (সা.) তার আগের দিন বা পরের দিন আরেকটি রোজা রাখার পরামর্শ দেন (মুসনাদ আহমদ)। আশুরার দিনে হযরত হুসাইন (রা.) এর শাহাদাত ইসলামের ইতিহাসে একটি হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী ঘটনা। কিছু লোক এদিন হায় হাসান, হায় হোসেন বলে আহাজারি করতে থাকে, বুক চাপড়াতে থাকে। এটা পুণ্যের কাজ নয়। হাদিস শরীফে কঠোরভাবে এ কাজ নিষেধ করা হয়েছে। হযরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলে আকরাম সাল্লাললাাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহাজারিকারী এবং শ্রবণকারীর ওপর লানত করেছেন।
আশুরা ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে কারবালা প্রান্তরে বিপথগামী শাসক ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার লেলিয়ে দেয়া বাহিনীর হাতে রসূল (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের (রা.) শাহাদাত বরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। আশুরায় ফজিলত অপরিসীম। আশুরা শব্দটি ‘আশারা’ থেকে এসেছে। এর অর্থ দশ। মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলে। মহররম ও আশুরা আমাদেরকে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন ইমানদারদের জন্য অনুসরণীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার দিনে হজরত আদম (আ.)-এর ওপর ও অন্যান্য নবীর ওপর রোজা ফরজ ছিল। এইদিন দুই হাজার পয়গম্বর ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন এবং দুই হাজার পয়গম্বরের দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছিল। ’ নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার রোজা রাখে, তার আমলনামায় সাত আসমান জমিনের সব অধিবাসীর সওয়াব লেখা হয় এবং যে ব্যক্তি নিজের জন্য দোজখের আগুন হারাম করতে চায়, সে যেন মহররম মাসের নফল রোজা রাখে। ’ অন্য এক হাদিস থেকে জানা যায়, ‘মহররম মাসে যদি কোনো ব্যক্তি রোজা রাখে, তবে প্রত্যেক রোজার পরিবর্তে ত্রিশ রোজার পুণ্য লাভ করবে। ’ হাদীসে মহররম মাসের নফল ইবাদত ও নফল রোজাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন রমযানের পর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রোজা হল আল্লাহর মাস মহররমের রোযা । তিনি আরো বলেছেন রমযানের পর কোন মাসকে যদি গুরুত্ব দিয়ে রোজা রাখতে চাও,তাহলে মহররমকে গুরুত্ব দাও। কেননা , মহররম হলো আল্লাহর মাস। সাহাবীদের তিনি বলেছেন তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইহুদিদের বিরোধিতা করে আশুরার আগে বা পরে আরো এক দিন রোযা রাখ ।
মহররম মাসের সম্মানের বিষয়ে রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর মাস মহররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। কেননা যে ব্যক্তি মহররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত দান করে সম্মানিত করবেন আল্লাহতায়ালা।’ (মুসলিম ইবনে মাজা)। অপর হাদিসে রাসূল (সা. )এরশাদ করেন, ‘রমজানের রোজার পরই আল্লাহ ‘তায়ালার কাছে প্রিয় হলো মহররম মাসের রোজা।’ (মুসলিম)। অপর হাদিসে রাসূলে করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মহররমের প্রথম দশ দিন রোজা রাখে, সে যেন দশ হাজার বছর যাবৎ দিনে রোজা রাখল এবং রাতে ইবাদত করল।’ (বায়হাকি)। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘ফিরে এল আজ সেই মহররম মাহিনা, ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’ মানুষের সমাজে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় পবিএ মহররম মাসে আশুরার দিনটি মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এক বিশেষ স্মারক। মুসলিম ঐতিহ্যের কবি নজরুল ইসলাম মহররমকে ঘিরে কবিতা ও গান রচনা করেছেন প্রচুর। মহররম প্রসঙ্গে কবির রচিত ‘ওগো মা ফাতেমা ছুটে আয়, তোর দুলালের বুকে হানে ছুরি’, ‘ফোরাতের পানিতে নেমে ফাতেমা দুলাল কাঁদে অঝোর নয়নেরে’ ‘মহররমের চাঁদ এলো ঐ কাঁদাতে ফের দুনিয়ায়’, ‘মহররমের চাঁদ ওঠারত আজিও অনেক দেরী’, ‘নীলসিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া’ ও ‘এলো শোকের সেই মহররম’ প্রভৃতি গান। নজররুলের বিখ্যাত কবিতা ‘মহররম’ মোসলেম ভারতে প্রথম প্রকাশিত হয়, যা পরবর্তীতে অগ্নি-বীণা কাব্যে (১৯২২) ছাপা হয়। ভাষা, বিষয় ও উপমা-উৎপ্রেক্ষার স্বাতন্ত্রে রচনাটি পুঁথি সাহিত্যের আধুনিক বিবর্তিত রূপ।

দুনিয়ার লোভ লালসার কাছে আত্মসমর্পন না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিলেন হযরত ইমাম হোসেন (রা.)। নরাধম ইয়াজিদের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জিহাদ করে তিনি মুসলিম জাতির জন্য কেয়ামত পর্যন্ত এক জ্বলন্ত উদাহরণ রেখে গেছেন। ইমাম হোসেন (রা.) কারবালা প্রান্তরে শহীদ হয়ে পৃথিবীতে মানুষের হৃদয়ে আদর্শবাদিতার যে পতাকা উড্ডীন করে গেছেন তা’ চির অম্লান থাকবে। ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মেনে নেয়ার বদলে জীবন বিসর্জন দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, অন্যায়ের সঙ্গে আপোষের সুযোগ নেই। কারবালার স্মৃতি মুসলিম হৃদয়ে কেবল শোকের আবহই জাগায়না বরং সাধনা ও সাফল্যের এক নতুন উদ্দীপনাও জাগিয়ে তোলে। বিশেষতাবে স্মরণীয় ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মহানবী হযরত মুহাম্মাদের (সা.) দৌহিএ হযরত ইমাম হোসেনের (রা.) শাহাদাতবরণ সারা বিশ্বে যুগে যুগে মুসলিম জাতিকে দ্বীনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ ও কোরবানীর জন্য অনুপ্রেরণা যোগাবে।
পরিশেষে বলতে হয় যে, পরিপূর্ণভাবে ইসলামের উপর টিকে থাকতে হ’লে ফিরে যেতে হবে একমাত্র পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর দিকে। মুসলিম জাতি আজ কুরআন-সুন্নাহ থেকে ছিটকে পড়েছে। ফলে বিদ‘আতের কাল মেঘে আচ্ছাদিত হয়েছে ইসলামী শরী‘আতের স্বচ্ছ আকাশ। এ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য শারঈ জ্ঞানার্জন অপরিহার্য। মহররম পবিত্রতা, মর্যাদা, সম্মান ও সুনাম-সুখ্যাতির প্রতীক। আশুরা পূর্ণতাপ্রাপ্তি ও সফলতার প্রতীক; কারবালা বিপদাপদ, বালামুসিবত ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রতীক। মহররম ও আশুরার শিক্ষা ও তাৎপর্যকে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত চিরভাস্বর করে রাখবে কারবালার শহীদদের অবদান।
লেখক ঃ সার্ক স্কলার, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও খ্যাতনামা সাংবাদিক এবং সাবেক ডাইরেক্টর (জনসংযোগ),
বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়