| |

ফুলবাড়িয়া সাব রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতির শেষ কোথায়!

মো: আব্দুস ছাত্তার : সাব-রেজিস্ট্রার, দলিল লেখক, নকল নবীশ, পিয়ন ও দালালদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ফুলবাড়িয়া সাব রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগীরা। সাব রেজিস্ট্রার দুর্নীতিবাজ দলিল লেখকদের সাথে আতাত করে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দলিল সম্পাদনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। সুযোগ সন্ধানি দলিল লেখকরা জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে সরকারী রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। ঘুষ লেনদেনে অতিতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে বলে কানা ঘোষা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে দলিল লেখক ও অফিস স্টাফদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করলেও চাকুরীচুত্য হওয়ার ভয়ে সরাসরি কেউ মুখ খুলছেন না। সরেজমিনে জানা গেছে, দলিল প্রতি অতিরিক্ত ৪/৫ হাজার টাকা গুনতে হয়। এর মধ্যে ১ হাজার টাকা কল্যাণ তহবিল ২ হাজার ৩৬ টাকার রয়েছে আরেকটি হিসাব। ৩ হাজার ৩৬ টাকা হিসাব যখন সামনে আসে তখন কিন্তু কোন দলিল লেখকরাই আসল কথা বলে না। তাঁরা (দলিল লেখক) দলিল গ্রহিতাদের কাছে জমির সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারন করেই টাকার হিসাব দেয়। তারপর কারসাজি করে সবচেয়ে কমমূল্যে জমির দলিল, স্ট্যাম্প, আকডুম বাকডুম খরচ সব মিলিয়ে সীমাহিন দূর্ভোগে উপজেলাবাসি। অনেকে বলে মহুরিদের পেঁচে আমরা অসহায়। অফিস খরচ বলে ২ হাজার ৩৬ টাকার ভাগাভাগিতে দলিল লেখক সমিতি ৮০০ টাকা, নকলনবিশ ২৪০, বাকী ৯৯৬ টাকা সাব রেজিস্ট্রার, অফিস সহকারী (কেরানী), পিয়ন ও অফিস খরচ। প্রতিদিন গড়ে যদি ৪০টি দলিল সম্পাদিত হয় তাহলে ৮১ হাজার ৪৪০ টাকা আয় আসে। আর কল্যাণ তহিবলে জমা হয় প্রতিদিন ৪০টি দলিল হিসাবে ৪০ হাজার টাকা। যদি গত মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রায় ৭০টির মতো দলিল সম্পাদিত হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিদিনকার সরাসরি হিসাব কষেন অফিস সহকারী নামে পরিচিত ইসমাইল হোসেন। তিনি আবার সাব রেজিস্ট্রারের খুব আস্থাভাজন কারণ টাকা আদায়ে খুব কৌশলী তিনি। সেই হিসাবে দলিল লেখকরাও তাকে পছন্দ করে কল্যাণ তহবিলের ১ হাজার টাকা ও ২০৩৬ টাকাও আদায়ের জন্য তাকে মনোনিত করেছেন। অপরদিকে ইসমাইল হোসেন কে দলিলে রেজি: ফিস লেখা ও দেখার কাজটিও করতে হয়। যদিও সরকারীভাবে অফিস সহকারী পদে একজন মহিলা নিয়োগকৃত, তিনি নিয়মিত অফিস করে কাজ করছেন। ব্যাংকে বিভিন্ন চালানের নামে যা হয় তার খবর কেউ রাখেন? স্থানীয় কর, উৎসকর ও স্ট্যাম্প, রেজি: ফিস এ ৪টি চালান লিখতে ব্যাংকে দিতে ৩৭ টাকা হারে ১৪৮ টাকা। অথচ স্বয়ং দলিল লেখকরাই দিচ্ছেন ৮০০ টাকা। স্থানীয় কর আদায় করে ব্যাংক থেকে ডিডি করে আনতে হয়। এ বিষয়টা দেখা শুনা করেন ইসমাইল হোসেনের পুত্র নুরুল ইসলাম। কর আদায়ের সাথে ২শ টাকা রাখা হয় অতিরিক্ত খরচের জন্য। সেখান থেকে ব্যাংকে কমিশন ও ভ্যাট বাবদ ৩৭ টাকা। প্রতি দলিল থেকে তিনি পেয়ে যান ১৬৩ টাকা। প্রতিদিন গড়ে ৪০টি দলিল হলে তিনি গুনেন ৬ হাজার ৫২০টাকা। ছাইফুল ইসলাম দায়িত্বে থাকে উৎসকর (সাফ কাওলা দলিল) ও স্ট্যাম্প সেখানেও ব্যাংক খরচ ৩৭ টাকা। ১৬৩ টাকা হারে তিনিও গুনেন ৬ হাজার ৫২০টাকা। এখানে আবার সাব রেজিস্ট্রারও ভাগ আছে। আনিস রেজি: ফিস আদায় করেন। ব্যাংক খরচ একই। প্রতিদিন গুনেন ৬ হাজার ৫২০টাকা। তিনি আবার সাব রেজিস্ট্রার কাছের লোক। বলা যায় অলিখিত বডি গার্ড। সাহেব আসার আগে এবং যাওয়ার আগে গাড়ির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থেকে সকল কিছু তদারকি করেন। সমুদয় অর্থ সাধারন গ্রামের সহজ সরল নিরীহ দলিল গ্রহিতা মানুষদের না জানিয়ে প্রতারণা করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। চক্রের সাথে অফিসের সবাই জড়িত। অফিসের বাহিরে একটি সিটিজেন চার্টার দেয়া আছে কিন্তু সেটির কোন কার্যকারিতা অফিসে নেই। এমনকি সেই সিটিজেন চার্টারটি দেখার অনুপযোগি হলেও তার দেখার কেউ নেই। ভুয়া কাগজপত্র হলে সাব রেজিস্ট্রার ম্যানেজ করেই দলিল সম্পাদন হয়। বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকান থেকে খারিজ, দাখিলা ও বিআরএস প্রিন্ট করে দলিল হচ্ছে অহরহ। বনের জমি রেজিস্ট্রিতে সরাসরি কথা বলতে হয় সাব রেজিস্ট্রারের সাথে। খাস কামরার দরজা বন্ধ করে দফারফা হয় সেখানে। আর এসব দেখা শুনার জন্য আলাদা লোক বাছাই করে দেয়া আছে তাঁর। সাব রেজিস্ট্রার সপ্তাহে ৪ দিন এবং দেরিতে অফিস করায় সেবা গ্রহিতাদের সীমাহীন দূর্ভোগ পোহাতে হয়। তিনি বিকালে এজলাসে বসলে দলিল নিয়ে শুরু হয় দৌড়াদৌড়ি। অলিখিত একজন পিএস তাঁর। সে দলিল লেখকদের ম্যাসেঞ্জ দেন স্যার উঠে পড়বে দলিল থাকলে তাড়াতাড়ি। আর জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকিতে পিছিয়ে নেই সংশ্লিষ্টরা। আর এ সব জামেলা পোহাতে হয় দলিল গ্রহিতাদের। নিজ নামে যখন জমা-খারিজ করার ভূমি অফিসে যাওয়া হয়, তখন যত্ত জামেলা, এর খেসারত কিভাবে দিতে হয়, যারা ভোক্তভোগি তারা ভালো জানেন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন ম্যানুয়াল-২০১৪ এর অধ্যায়-২৬ এ উল্লেখ আছে যে, সহকারীগণ কর্তৃক দলিল পরীক্ষাকরণ কাঙ্খিত নহে, এই কার্যটি অবশ্যই স্বয়ং নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা কর্তৃক সম্পাদিত হইবে। এরপরও সাব-রেজিষ্ট্রার নিবন্ধন ম্যানুয়াল অনুযায়ী নিজের কাজ নকল নবিশ, উম্মেদার ও পিওনদের দিয়ে করাচ্ছেন। দলিল চেক করার কাজ সাব-রেজিষ্ট্রারের করার নিয়ম থাকলেও তা মানছেন না তিনি। সেবা নিতে আসা ৭০ বছর বয়সী আনসার উদ্দিন নামের এক মুরব্বি বলেন, সকালে এসেছি খাড়ইয়া (দাড়ানো) থাকবার পারতাছি না। রোদের যে তাপ। কি করমু মসজিদের সিড়িতে বসে আছি। দলিল করতে আসা এক যুবক বলেন, দলিল লেখাতে এত লাভ না হলে মহুরি হতে এত মাতামাতি কেন? দেখেন না, মহুরিদের বসার জায়গা হয় না, তারপরও বারান্দায় গাধাগাধি করে বসে আছে। ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন খারিজ ও দাখিলার জন্য মানুষ তাড়াহুড়া করে না। শুনেছি কম্পিউটারের দোকান থেকেই এগুলো বানিয়ে নেয়। অনেক মহুরিরা সব কিছু মিলিয়ে কন্ট্রাক নেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক জানিয়েছেন, ভাই কি করমু সবার যে বাও আমারও সেই বাও। কারণ আমি প্রতিবাদ করে বিপদে পড়মু। এগুলো ব্রিটিশ আমল থেকে হইতাছে ভবিষ্যতেও হবো। যারা প্রতিবাদ করার কথা তারাই প্রতিবাদ করে না। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হলেও আমাদের সেবাগ্রহিতাদের বসার কোন ব্যবস্থা নেই ফলে তাদের অনেক কষ্ট হয়। কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই। অনেক ভিআইপি লোকের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় না করতে পারলে ভিন্ন কৌশলে তা আদায় করা হয়। আমরা সারাদিন কাজ আর কাজ করি। দেখেন না, সিটিজেন চার্টার ছিড়ে গেছে, এটা ঠিক করার সময় হয় না। ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় দেখা যায় সাব রেজিস্ট্রি অফিসের লোকজন ব্যাংকে ঘোরা ফেরা করে, পরে জানতে পারলাম তারা ডিডি ভাঙ্গানোর এসেছে, গ্রাহক চাইলে তো আমরা ডিডি ভাঙ্গাতে বাধ্য। তিনি আরও বলেন সাব রেজিস্ট্রি অফিসে সবাই টাকা খায়। নিউজ করে তেমন কোন ফায়দা হবে না। অভিযুক্তদের সাথে যোগাযোগ করা হলে, স্থানীয় কর আদায়কারী নুরুল ইসলাম বলেন, ২শ টাকার মধ্যে ব্যাংকে কত খরচ যায় সেটা ছাইফুল কাকার সাথে আলাপ করে জানতে হবে। আনিসের মুঠো ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নি। ইসমাইল হোসেনের সরাসরি কথা বলার জন্য গেলে তিনি এ বিষয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান। দলিল লেখক সমিতির সভাপতি মো. আ. মান্নান সরকার বলেন, কল্যাণ সমিতি বাইরের, এখন এটাকা নেয়া হয় না। ২০৩৬ টাকার হিসাব আমার বইসেন দেখাইয়া দিমু নে। সাব রেজিস্ট্রার মো. শামসুল আলমের সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিচয় জেনে বলেন, ব্যস্ত পরে কথা বলি।