| |

গৌরবময় প্রকাশনার ২৭ বছর বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরে আধুনিক সাংবাদিকতার শীর্ষে প্রগতিশীল জাতীয় দৈনিক স্বদেশ সংবাদ- ড. দেওয়ান রাশীদুল হাসান

মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগে, একে অন্যের সঙ্গে বোঝাপড়ায় সাংবাদিকতার অতুলনীয় অবদানের কারণেই সাংবাদিকতাকে আধুনিক সমাজ বসিয়েছে তার শ্রদ্ধার আসনে। আমাদের দেশের সাংবাদিকতা এখন অনেক সমৃদ্ধ। তবু মাঝে মাঝে সাংবাদিকতায় নানা দুর্বলতা দেখা যায়। এই দুর্বলতাগুলো যেন আর না থাকে, সে ব্যাপারে পর্যালোচনা করে নানা পদক্ষেপ নিতে হবে। যথাযথ পর্যালোচনা ও সময়োচিত পদক্ষেপ না নিলে এসব দুর্বলতা সাংবাদিকতায় থেকেই যাবে। আমাদের দুর্ভাগ্য, সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেস ইনস্টিটিউট, গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট কেউই পেশাগতভাবে  সাংবাদিকতার মান উন্নয়নে সক্রিয় নয়। সাংবাদিক শুধু নিজের নৈতিকতাই দেখবে না, সরকারি কর্মকর্তারও নৈতিকতা দেখতে হবে। কোনো বিশেষ স্বার্থে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা নৈতিকতা বর্জিত আচরণ করলে তা সংবাদপত্র উন্মোচন করবে। যদি সংবাদপত্র তা উন্মোচন না করে তাহলে এই অনৈতিক আচরণই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। তখন সংবাদপত্র হবে এই অনৈতিকতার সহযোগী। অনৈতিক কাজ বোঝার মতো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সাংবাদিকের থাকতে হবে। কারণ, সংবাদপএ হচ্ছে জনগণের প্রতিষ্ঠান। আর  সাংবাদিকদের  দায়িত্ব হলো  সমাজের  অগ্রগতি ও উন্নয়নে  সক্রিয় অবদান রাখা। সমাজ  সংস্কারের  কাজে সংবাদপএ সবচেয়ে কার্যকর ভ’মিকা রাখতে পারে। মৌলিক কাজের জন্য প্রয়োজন সময়, মনোযোগ এবং পরিশ্রম। সাংবাদিকতার মানেই হচ্ছে মানুষকে নতুন কিছু বলা, এমন কিছু বলা যেটা তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে, পাঠককে  ধরে রাখবে।
যোগাযোগ ও উন্নয়ন আন্তঃসম্পর্কিত। যোগাযোগ তাত্ত্বিক উইলবার শ্র্যাম  বলেছেন, যোগাযোগ হলো একটি মৌলিক সামাজিক প্রক্রিয়া, যা পরিবর্তনে  অন্তর্নিহিত শক্তি হিসেবে কাজ করে। উন্নয়ন অনেকগুলো অনুষঙ্গের সমষ্টি। এসব অনুষঙ্গের পারস্পরিক শক্ত বুননে যোগাযোগ প্রধানতম নিয়ামক।  যোগাযোগ উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে গতিশীল এবং প্রত্যাশিত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত  করে। শ্র্যাম আরও বলেন, যখন কোনো সমাজে উন্নয়ন বা পরিবর্তন ঘটে, সেখানে যোগাযোগ প্রবাহমান থাকে। বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গণযোগাযোগের প্রায়োগিক ধরন হিসেবে  উন্নয়ন যোগাযোগের বিকাশ ঘটে। যোগাযোগ সম্পর্কিত কলা ও  বিজ্ঞানের এ সমন্বিত ব্যবহার উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে গতিশীল করে তোলে।
আধুনিক সাংবাদিকতায় সৃজনশীল লেখালেখি পেশা হিসেবে স্বীকৃত।  সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা। সাংবাদিকদের জাতির বিবেকও  বলা  হয়ে থাকে। হলুদ সাংবাদিকতা করে এ পেশার অমর্যাদা করা যাবেনা।  সততা, বস্তনিষ্ঠতা ও পক্ষপাতহীন হয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার (Print and Electronic Media) সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু সেই সাংবাদিকদেরকে  আজ  লাঞ্ছিত করা হয়। নির্যাতনের স্বীকার হতে হয় সাংবাদিকদের। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু সাধারণতঃ শহর-বন্দর-নগর। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ভিতর থেকে সাংবাদিকদের লেখার জন্ম । যদিও চরম দারিদ্রতাকেই সাংবাদিকরা  মেনে নেন। তবুও প্রতিটি অভাবই  যেন তার জীবনকে সততার আলোয়  উদ্ভাসিত করে যায়। একদিকে সামাজিক দায়িত্ববোধ অন্যদিকে সামাজিক প্রথাগত উৎপাদনে অনীহা-এই দু’য়ের মাঝখানে ঘটতে থাকে একজন সাংবাদিকের টিকে থাকা ও লেখার যুদ্ধ। সাংবাদিকদের যুদ্ধ সামগ্রিক শোষিত বঞ্চিত সমাজের পক্ষে হলেও সমাজের দ্বারা সবচাইতে নিগৃহীত তিনি । এই সংকট থেকে যে দায়বোধের জন্ম নেয় তাই একজন প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিককে এগিয়ে যাবার সামর্থ যোগায়। একদিকে গড্ডালিকা প্রবাহের জনগণ, অন্যদিকে রাষ্ট্রের রক্ত চক্ষুকে  উপেক্ষা বা মোকাবেলা করেই একটা জীবন কাটাতে হয় সাংবাদিকদেরকে। প্রচলিত জীবনের প্রতি অনীহা ও আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ¯্রােতে সভ্যতা ও ইতিহাস নির্মাণে নতুন জীবন অনুসরণেই সৃজনশীল সাংবাদিকতার পথ । শুদ্ধতা ও সমৃদ্ধির পথে মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী মিডিয়া, এর বিরাট একটি অংশ জুড়ে আছে খবর। এছাড়া, তথ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনোদনের  মত বিষয়গুলো তো রয়েছেই।
স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থেকেও গণতান্ত্রিক পন্থায় সকল মত ও পথকে  নিরপেক্ষভাবে ধারণ করার অনন্য নজির ‘দৈনিক স্বদেশ সংবাদ।’ অনেক প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে প্রতিষ্ঠার পর হতেই বাংলাদেশের প্রধানতম এ জনপ্রিয় পত্রিকাটি দেশ ও জনগণের পক্ষে ইতিবাচক ভুমিকা রেখে যাচ্ছে। নির্ভীক, সৎ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত নিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরের ছোটবাজার  হতে প্রকাশিত ‘দৈনিক স্বদেশ সংবাদ’  দেখতে দেখতে ২৬ বছর পেরিয়ে ২৭ বছরে  পদার্পণ করল। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে স্বদেশ সংবাদ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনসহ আঞ্চলিক খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে ১৯৯৩ সনের ১ অক্টোবর প্রথম আত্মপ্রকাশ করে লেটার প্রেস দিয়ে। বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর সংবাদ প্রকাশে সর্বাধুনিক চার কালার অফসেট মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন  নতুনত্ব আনার প্রত্যয়ে প্রকাশনার ২৭ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করছে বাংলাদেশের অন্যতম পত্রিকা স্বদেশ সংবাদ। ইতিবাচক ও গঠনমূলক সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে নির্ভীক সাংবাদিকতার  উজ্জ্বল নিদর্শন স্থাপন করেছে এই দৈনিক পত্রিকাটি। গত পচিশ বছরে সাধারণ মানুষের মুখপত্র হিসেবে বস্তুনিষ্ঠ খবর পরিবেশনে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সংবাদপত্র জগতে নতুন মাত্রা যোগ করে  বস্তুনিষ্ঠ নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে পাঠকের মনে স্থান করে নিয়েছে। আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে স্বদেশ সংবাদ অনলাইন সংস্করণে (www.swadeshsangbad.com)  সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নির্ভরতা বাড়িয়েছে।  সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে পত্রিকাটির প্রতিবেদন আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আমরা আশা রাখছি। স্বদেশ সংবাদ যে ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে সৎ সাংবাদিকতা ও নির্ভিকতায়, সেই ভাবমূর্তি ও গৌরবময় ঐতিহ্য আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।
সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় গণমানুষের আশা আকাঙ্খার বাস্তব চিত্র ও যে খবর স্বদেশ সংবাদ তুলে ধরেছে সেটি বাংলাদেশের সংবাদপত্র  জগতে এক ব্যতিক্রমী  সংযোজন। দেশের গণ মানুষের আশা আকাঙ্খা,স্বাধীনতা ও সাবভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সঠিক ও নির্ভুল খবর প্রকাশের মধ্য দিয়ে স্বদেশ সংবাদ আরো বহুদূর এগিয়ে যাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। লক্ষ্য করেছি, এ পত্রিকার সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, নিবন্ধ ও প্রবন্ধে দেশ-বিদেশের সঠিক চিত্র প্রতিফলিত হয়। অধিকন্তু, পত্রিকাটিতে  শিক্ষা, বিজ্ঞান, রাজনীতি, স্বাস্থ্য ও  ধর্মসহ বিভিন্ন  ইস্যুতে  দৃঢ়তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা বলে।
সাম্প্রতিককালে মোবাইল সাংবাদিকতা নিয়ে বাংলাদেশে এখন ইউজার জেনারেটেড কনটেন্টের ভান্ডার তৈরি হয়েছে। নিউজ রুমগুলো যদি এই বিশাল পরিমাণ কনটেন্ট থেকে সুনির্বাচিত কনটেন্টগুলো প্রকাশ করতে পারে, তাহলে সাংবাদিকতায় একদম নতুন একটি ধারার সূচনা হবে। এখানে এখনো অনেক সংবাদমাধ্যম ওই মানে পৌঁছাতে পারেনি। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামের ভিডিও সম্পাদনা বা ওই জাতীয় কাজে আলাদা টিম তৈরি করার জন্য এখনো যথেষ্ট লোকবল তৈরি হয়নি। বাংলাদেশে এখন একটি বড় সমস্যা হলো ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি। কোথাও আগুন লাগলে মানুষ ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করতে শুরু করে। কিন্তু পরে দেখা যায়, সেগুলো বছর তিন-চারেকের পুরোনো ফুটেজ। মানুষ মৃত্যু  নিয়েও গুজব ছড়ায়।  মোবাইল সাংবাদিকতার ধারণাটা নতুন। কেউ যদি একটি সহজে বহনযোগ্য ডিজিটাল যন্ত্রের সাহায্যে ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা সম্পাদনা করে খবর আকারে প্রকাশ করে, তাকেই মোবাইল সাংবাদিকতা বলে। মোবাইল ডিভাইসটি হতে পারে একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা, গো-প্রো বা একটি সেলফোন। হতে পারে একটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রযুক্তিও। কেউ কেউ মোবাইল সাংবাদিকতাকে সেলফি সাংবাদিকতাও বলছেন। ফেসবুকের সবচেয়ে বৃহৎ বৈশ্বিক বাজার যুক্তরাষ্ট্র নয়, ভারতে এই বাজার দ্বিগুণ গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায়ও ফেসবুকের বাজার দ্রুত বাড়ছে।  আমাদের মনে রাখতে হবে যে  বাংলাদেশে মোবাইল সাংবাদিকতার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ  রয়েছে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বা সোশাল মিডিয়ার কারণে সংবাদ মিনিটে পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর এক  প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। পক্ষান্তরে, প্রিন্ট মিডিয়া হিসেবে  ঁেবচে থাকার লড়াই  যেন আরো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবুও পাঠকদের ভালবাসার বন্ধনে  স্বদেশ সংবাদ আজো দৃপ্ত প্রত্যয় নিয়ে ভবিষ্যত পানে এগিয়ে চলেছে। এদিকে সম্প্রতি  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সরকার সাংবাদিক ও সংবাদপএের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করা দরকার  সবই করেছি।’  অপরদিকে, পেশাদার গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা  অভিমত ব্যক্ত করেছেন, সাংবাদিকরা সরকারের শক্র না। আবার সরকারও সাংবাদিকদের শক্র  না। বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্প এবং সাংবাদিকতা পেশাকে নিরপেক্ষ এবং জবাবদিহিতামূলক করার লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ও উদ্যোগে ১৯৭৪ সালে প্রেস কাউন্সিল এ্যাক্ট প্রণীত হয়। বঙ্গবন্ধু নিজেও কিছুদিন সাংবাদিকতা পেশার সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ছিলেন দৈনিক ইওেহাদ পত্রিকার পূর্ব পাকিস্তান প্রতিনিধি। তবে তিনি নিজেই যে সংবাদকর্মী বা সাংবাদিক ছিলেন, সেকথা কখনও কোন ভাষণে তিনি উল্লেখ করেননি। এ তথ্যটি জানা যায় ২০১২ সালে প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থ থেকে।
পাঠক হিসেবে আমরা  যতদূর জানি অদূর ভবিষ্যতে ধারাবাহিকভাবে খবরের কাগজটিকে আরো উন্নততর করার জন্য এর প্রশাসনিক  ব্যবস্থাপনা ও সম্পাদকীয় বিভাগ আন্তরিক প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। একটি নিরপেক্ষ পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে  আধুনিক বিশ্বের সাংবাদিকতার  নীতিমালা অনুসারে এর উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে  পএিকা কর্তৃপক্ষ। একটি সংবাদপত্রকে তার সাহসী ভূমিকা দিয়েই পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে হয়। দলমত নির্বিশেষে সবার মতামত প্রকাশের শীর্ষ স্থানীয় পত্রিকা হিসেবে স্বদেশ সংবাদ দেশ মাতৃকাকে এগিয়ে নেওয়ার পথে আরো বলীয়ান হোক। একটি সংবাদপত্রের আয়ু নির্ভর করে তার পাঠক সংখ্যার ওপর।  আর পাঠক সংখ্যা নির্ভর করে বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর । প্রতিটি সংবাদপত্রের কিছু দর্শন থাকে, প্রকৃত তথ্য ও সত্য খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে সেই দর্শন প্রভাব ফেলে। কারণ, আমাদের মনে রাখতে হবে পাঠকই সংবাদপত্রের শেষ বিচারক।
বর্তমানে সংবাদপত্র অন্য ব্যবসা থেকে পৃথক। সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। এডমন্ড বার্ক সর্বপ্রথম সংবাদ মাধ্যমকে ‘ফোর্থ এস্টেট’ বলে অভিহিত করেন। এই স্তম্ভের ভার সবাই বহন করতে পারে না। অর্থবল থাকলেও দেখা যায়, নৈতিক শক্তি সবার থাকে না। সংবাদপত্র জগতে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় হলো স্বাধীন সংবাদপত্র। সংবাদপত্রের সব প্রতিবেদন বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। তথ্য প্রমাণ থাকতে হবে। প্রতিবেদনে সব পক্ষের বক্তব্য থাকতে হবে। এগুলো ছাড়া কোন প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তা স্বাধীনতার অপব্যবহার বলে বিবেচিত হবে। সত্য প্রকাশই পাঠকের কাছে সংবাদ পত্রের  প্রধান অঙ্গীকার । শেষ বিচারে সাংবাদিকদের সাফল্য নির্ভর করবে জনস্বার্থের বিষয়গুলো তুলে ধরার মধ্যে । এই  দীর্ঘ সমযে স্বদেশ সংবাদ তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি। যদিবা কিছুটা ক্রুটি বিচ্যুতি থেকে থাকে, তারপরও অকপটে বলা যায় যে, স্বদেশ সংবাদ তার অভীষ্ট লক্ষ্যপথে চলার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। এ চেষ্টা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে এ প্রত্যাশা রাখছি। অনেক সময় দেখা যায়, কলুষিত সাংবাদিকতার বিষবাষ্প নিভিয়ে দিচ্ছে এই পেশার পবিত্রতা আর সৌন্দর্যের আলো। সেসব কলুষিত ব্যক্তির অন্যায় অপরাধ এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ জানাই। একশ’ বছর আগে সাংবাদিক-সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার বলেছিলেন, ‘সৎ সাংবাদিকের কোন বন্ধু থাকতে নেই।
  কখন কীভাবে সংবাদপএ বা পএ-পএিকার উদ্ভব হয়েছিল তা’ বলা মুশকিল। তবে ইতিহাস থেকে এর ছিঁটে ফোটা তথ্য পাওয়া যায় যে, প্রাচীণ রোমে জুলিয়াস সিজারের সময় ( ৪৪ খ্রি:পূ:) সরকারি ঘোষণা জনসম্মুখে টাঙ্গিয়ে রাখা হতো। স¤্রাট অশোকের  সময় ভারতবর্ষে পাহাড় ও পাথর খোদাই করে  রাজকীয় আদেশ ও ঘটনা লিখে রাখা হতো। গুপ্ত, পাল, সেন  ও সুলতানি আমলে  তা¤্রলিপি, পাটব¯এ ও রেশমি  ব¯েএ শাসকগণ  তাদের সংবাদ প্রচার করতেন। এ গুলোকে সংবাদপএ হিসেবে বিবেচনা করা না গেলেও এগুলোকে সংবাদপএের সূচনার পথ  প্রদর্শক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।  মোগল আমলে সংবাদপএের বেশ প্রচার ও  প্রসার ঘটেছিল। বিশেষ করে বাদশাহ আলমগীরের রাজত্বের সময় সংবাদপএের বেশ স্বাধীনতা ছিল। এ সময় হাতে লেখা  সংবাদপএের মাধ্যমে রাজা প্রজার ঘনিষ্ঠ  যোগাযোগ গড়ে ওঠে। ভারতবর্ষে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জানুয়ারি প্রথম ছাপার অক্ষরে সংবাদপএ প্রকাশিত হয়। সংবাদপএটির নাম ছিল বেঙ্গল গেজেট। সম্পাদক ছিলেন  জেমস অগাস্টাস হিকি। এরপর উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণ বা রেনেস’ার প্রভাব সংবাদপএ ও সাময়িকপএের ক্ষেএেও এক বিকাশমান অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৮৪৭ খ্রীস্টাব্দে  জমিদার কালীচরণ রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায়  ব্রিটিশ  সরকার  নিয়ন্ত্রিত  বাংলাদেশের  রংপুর  জেলা  থেকে  ‘রংপুর বার্তাবহ’   প্রকাশের  মধ্য  দিয়ে  এদেশে সংবাদপত্র  প্রকাশের  যাত্রা শুরু। এর  পর এই জেলা থেকেই  প্রকাশিত  ’দিন প্রকাশ’ এবং কুষ্টিয়া থেকে কাঙাল হরিনাথ সম্পাদিত   ‘গ্রামবাংলা প্রকাশিকা’ সংবাদপত্র শিল্পকে পাঠকের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যায়।
আজ বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতায় এক বিশেষ ধারা বা প্রবাহ উন্নয়ন সাংবাদিকতা। উন্নয়ন সাংবাদিকতা বিষয়টি ইংরেজিতে ‘ডেভেলপমেন্ট জার্নালিজম’ হিসেবে পরিচিত। উন্নয়ন সাংবাদিকতা নেতিবাচক বিষয় বর্জন করে ইতিবাচক বিষয়কে উৎসাহিত করে। বিংশ শতাব্দীতে উন্নয়ন সাংবাদিকতা ধারণাটি সাংবাদিকতায় বিশেষ এক সংযোজন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত সাংবাদিক   ওয়াল্টার লিপম্যান মনে করেন, ‘যেখানে সাংবাদিকরা জনগণ ও নীতিনির্ধারণী এলিটদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে, সেটিই উন্নয়ন সাংবাদিকতা। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যায় তিনি  আরও বলেছেন, ‘যেখানে গণমাধ্যমকর্মীরা সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে এলিট শ্রেণি-সবার কথা শুনে, দেখে এবং জনগণকে শোনার, দেখার এবং পড়ার ব্যবস্থা করে দেয়। সরকার, পলিসি মেকার ও জনগণের  মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে সরকারের সঙ্গে জনগণ যোগাযোগ করে এবং  সরকারও জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এর মধ্য দিয়েই কার্যকর উন্নয়ন  ঘটানো সম্ভব হয়। ষাটের দশকের সাংবাদিক তারজি বারীন্দ্র বিত্তচি প্রথম ‘উন্নয়ন সাংবাদিকতা’ সংক্রান্ত ধারণার উদ্ভাবন ঘটান। তার উদ্যোগে লোস  বার্নোস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক মাকার্তো চাক্লি ‘ডেপথ নিউজ’ নামে একটি ফিচার সার্ভিস সংস্থা শুরু করেন। প্রথাগত সাংবাদিকতার বদলে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে সাহায্য করাই এ সংস্থার  প্রধান কাজ ছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের অন্যতম আলোচনা টেকসই উন্নয়ন। বিশ্বনেতারা টেকসই উন্নয়নের জন্য ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। ২০১৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বদ্ধপরিকর বিশ্বের ১৯৩টি দেশ। বাংলাদেশ এই ১৯৩টি দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ এখনো উন্নত দেশে রূপান্তরিত হতে পারেনি। তাই দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে উন্নয়ন কার্যক্রম সংঘটিত হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্প, উন্নয়ন ফলাফল, উন্নয়ন প্রকল্পের দুর্নীতি, অনিয়ম, সাফল্যের সংবাদসহ সচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন অগ্রগতিতে, মানুষের জীবনমান উন্নয়নে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনে উন্নয়ন সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। ওয়াচডগ হিসেবে গণমাধ্যম চলমান ঘটনাকে নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করে। তুলে ধরে সামাজিক অন্যায্যতা-অসংগতি। সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এশিয়ার বহু দেশে উন্নয়নের  প্রধান শক্তি এখন উন্নয়ন সাংবাদিকতা। যে পথে এখন বাংলাদেশের  গণমাধ্যমের পথচলা।
আজকের মিডিয়া এখন রীতিমত শক্তিশালী, জনমত তৈরিতে বড় ধরণের ভুমিকা রয়েছে ব্যবসায়িক মিডিয়ার।  সংবাদপত্রের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে টেলিভিশন  চ্যানেল । সঙ্গে রয়েছে এফ.এম.রেডিও, ওয়েবসাইট। পরিসংখ্যান  বলছে,  বর্তমানে দেশের প্রায় সব মানুষের কাছেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পৌঁছে গেছে সংবাদ মাধ্যম। আজকের মিডিয়া শুধু সংবাদ বা বিনোদন দেয়না, সংগঠকের ভুমিকা পালন করে।  সরকারি তথ্য অনুসারে দেশে অনুমোদন রয়েছে ৪৪টি টেলিভিশন চ্যানেল,  ২২টি এফ এম, ৩২টি কমিউনিটি রেডিও, ১,১৮৭টি দৈনিক পত্রিকা, শতের ওপর অনলাইন পত্রিকা। এখন চলছে মাল্টিমিডিয়ার যুগ, সাংবাদিকতায় এই মাল্টি প্লাটফর্ম (রেডিও,টেলিভিশন ও সংবাদপত্র , এ সবের  অনলাইনের সংস্করন সোসাল মিডিয়া ইত্যাদি)  এখন অনেক । চলতি পথের প্যান্টের পকেটে থাকা কিংবা হাতের মুঠোই থাকা ‘স্মার্ট ফোনই’ এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত  দ্রুত গতির সংবাদ উৎস। আমাদের দেশের  পএ-পত্রিকা, টেলিভিশন ও তাদের অনলাইন সংস্করণ চালুর মাধ্যমে এই দ্রুত গতির দৌড়ে আপামর জনগণের স্বার্থে সাংবাদিকরা নিজেদের যুক্ত করে নিয়েছেন।’ আজকাল মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ক্ষুদে বার্তা প্রেরণ, ছবি, ভিডিও ধারণ ও আপলোড করার জন্য সাংবাদিকতা আরো  সহজ হয়েছে।
প্রকাশনার ২৭ বছরে পা রাখছে আজ পাঠক প্রিয় স্বদেশ সংবাদ। এই পথ চলাতে কখনো সহজ আবার কখনো  বেশ কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। বিগত ২৬ বছরে অর্জন বা প্রাপ্তি  বলতে পৃষ্ঠপোষক, বিজ্ঞাপনদাতা ও  পাঠকদের আন্তরিক সহযোগিতা। দীর্ঘ এই পথ চলতে চলতে অনেকে বন্ধু হয়েছে, আবার মুখোশ উন্মোচন  করতে গিয়ে বিভাজনের অপ্রিয়  অধ্যায়ও রয়েছে। সংবাদ কর্মীরা করেছে অক্লান্ত পরিশ্রম, অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে  পার করতে  হয়েছে  কঠিন সময়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরের শীর্ষ স্থানীয় জাতীয় দৈনিক পত্রিকা স্বদেশ সংবাদ  বাংলাদেশের ইতিহাসের ক্রম বিবর্তনে বলিষ্ঠ অবদান রেখেছে। গণতান্ত্রিক সকল আন্দোলন সংগ্রামে  জনস¦ার্থে  দৈনিক স্বদেশ সংবাদের  যেমন অবদান রয়েছে, তেমনি সচেতন পাঠক তৈরিসহ কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গঠনেও পত্রিকাটি  আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রথিতযশা সাংবাদিকÑসম্পাদক শ্রী জগদীশ চন্দ্র সরকার  ও প্রকাশক মোঃ গোলাম রসুল তালুকদার কর্তৃক প্রকাশিত দৈনিক স্বদেশ সংবাদ সাহসিকতার সঙ্গে সত্য প্রতিবেদন প্রকাশ করে চলেছে। স্বদেশ সংবাদ তার দীর্ঘ ২৭ বছরের যাত্রা পথে দেশের জন্য অনেক কল্যাণকর কাজ করেছে। আমাদের দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এই অর্জন সামান্য নয়। অগ্রসরমান বাংলা সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বে দেশের মুদ্রণ মাধ্যমে (Print Media) স্বদেশ সংবাদের ভুমিকা অগ্রগণ্য। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাই হোক স্বদেশ সংবাদের পথ চলার প্রেরণা ও প্রাণশক্তি।  প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী   উদযাপনের  এই গৌরবময় শুভ মূহুর্তে সম্পাদক, প্রকাশকসহ স্বদেশ সংবাদ পরিবারের  সকল সংবাদকর্মী, সম্মানিত পৃষ্ঠপোষক, অগণিত শুভানুধ্যায়ী, বিজ্ঞাপণদাতা এবং পাঠকদেরকে জানাই আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিবাদন। শুদ্ধতা ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এবং গণতন্ত্রকে শক্ত ভিওি দেওয়ার লক্ষ্যে প্রগতিশীল জাতীয় ‘দৈনিক স্বদেশ সংবাদে’র ঐতিহাসিক ভূমিকা নি:সন্দেহে  প্রশংসনীয়। নব্বুই এর  দশকে ‘দৈনিক স্বদেশ সংবাদ’  সাংবাদিকতার জগতে পদার্পণ করে। উজ্জ্বল ভাবমূর্তি নির্মাণ করে একটানা ২৬ বছর পেরিয়ে ২৭ বছরে প্রবেশের পথে সাংবাদিকতা পেশায় মেধা, যুক্তি বোধ, পেশাদারিত্ব, দায়িত্বশীলতা, অসাম্প্রদায়িক চিন্তা- চেতনার নিরবচ্ছিন্ন চর্চায় কর্মরত সংবাদকর্মীরা নিজেকে এবং বাংলাদেশের স্বনামধন্য এই সংবাদপত্রকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ক্স লেখক: সার্ক স্কলার, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
   আসাম কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর, ভারত ও খ্যাতনামা সাংবাদিক