| |

৭০ এর নির্বাচনে বাঙ্গালীর নিরঙ্কুশ বিজয় পাক সেনারা না মানার কারণেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা-কে.এম সফিউল্লাহ্

স্টাফ রিপোর্টার ঃ ময়মনসিংহ মুক্তদিবস ও মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে ময়মনসিংহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নগরীর ছোট বাজার (মুক্তিযোদ্ধা স্বরণী) ঐতিহাসিক মুক্তমঞ্চে সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার প্রথম দিন গতকাল ১০ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) বিকেলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তেব্যে মুক্তিযুদ্ধের ৩ নং সেক্টরের কমান্ডার ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, মুক্তিযুদ্ধ-৭১ এর চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অবঃ কে.এম সফিউল্লাহ্ বীর উত্তম বলেছেন, পাকিস্তানীরা আমাদের বাঙ্গালীদের কখনোই বিশ্বাস করতো না। সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ন স্থানে আমাদের বাঙ্গালীদের দায়িত্ব দিতো না। ৭০’র নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু না হয় সে জন্য পাক সৈন্যরা সবসময় সর্তক অপচেষ্টায় থাকতো। নির্বাচনে বাঙ্গালীদের নিরংকুশ বিজয় মেনে নিতে না পেরে নির্বাচিতদের কাছে ক্ষমতা দিতে গড়িমসি শুরু করে। সূচনা হয় মুক্তিযুদ্ধের । পাক সৈন্যরা কৌশলে বাঙ্গালী সৈন্যদের কাছ থেকে অস্ত্র জমা নেয়ার প্রচেষ্টা চালায়। বেঙ্গল রেজিমেন্টেকে নিরস্ত্র করার জন্য মরিয়া হয়ে পড়ে পাক সৈন্যরা । এদিকে আমরা বাঙ্গালী সৈন্যরাও কোন ভাবেই নিরস্ত্র হতে রাজি নই। এভাবেই চলতে থাকে ওদের ভেতরে ভেতরে বিরোধ। পরবর্তীতে বেতারে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ডাকের ঘোষণা শুনেই আমি মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাই। আমি সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহের দিকে অগ্রসর হই।
আমরা বিভক্ত হয়ে ময়মনসিংহের দিকে এবং টঙ্গীর দিকে রওনা দেই। টঙ্গীর দলটি নিয়ে নরসিংদী-ভৈরব হয়ে ব্রাহ্মনবাড়িয়ার দিকে যাই। রওনা দেই সিলেটের সিমান্তের দিকে। পথে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নিয়ে আলোচনা-পরামর্শ করি। অন্যদিকে জাতীয় নেতাদের অন্যতম তাজউদ্দিন আহমদ ভারতে গিয়ে সরকার প্রধান ইন্দিরাগান্ধীর সঙ্গে আলোচনা করে সহানুভূতির আশ্বাস পান। তাঁরই পরামর্শে স্বাধীন বাংলা সরকার গঠন করা হয়। গঠিত স্বাধীন বাংলা সরকারের প্ল্যান অনুযায়ী আমরা দেশটাকে ১১ টা সেক্টরে ভাগ করে সশস্ত্র যুদ্ধে অবর্তীন হই। তিনটি বিগ্রেড গঠন (এস.কে.জেড) করার মধ্য দিয়ে চলতে থাকে আমাদের গেরিলা যুদ্ধ।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের সভাপতিত্বে আলোচনা অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশেষ অতিথি জাতীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আলহাজ্ব কাজিম উদ্দিন আহাম্মেদ ধনু, ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এডভোকেট মোঃ জহিরুল হক, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব প্রফেসর আবুল কালাম আজাদ পাটোয়ারী, ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবীর, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আনোয়ার হোসেন।
অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম কেন্দ্রীয় সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল মোমেন, ময়মনসিংহ জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আহ্বায়ক আমীর আহম্মদ চৌধুরী রতন, ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী শিল্পী গোষ্ঠির সভাপতি এডভোকেট মোঃ আবুল কাশেম, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড কেন্দ্রীয় সভাপতি শেখ আতিকুর বাবু, সাধারণ সম্পাদক সরকার ফারহানা আক্তার সুমী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান মীর আবু নাসের জয়।
বিশেষ অতিথি জাতীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আলহাজ্ব কাজিম উদ্দিন আহাম্মেদ ধনু বলেন, এদেশে মুক্তিযুদ্ধে বাঙ্গালী যোদ্ধাদের প্রধান রণকৌশল ছিল গেরিলা। সশস্ত্র পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ হয় ভালুকার ভাওয়ালিয়া বাজুর যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে বহু পাক সেনাকে হতাহত করা হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। আজ বঙ্গবন্ধুর কন্যা দেশরতœ মানবতার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সোনার বাংলা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। আসুন আমরাও তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করে উন্নত বাংলাদেশ গড়ি।
বিশেষ অতিথি জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি এডভোকেট জহিরুল হক বলেন আমাদের বাঙ্গালী জাতির জন্য ডিসেম্বর মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমাস জাতির জন্য আনন্দ উদ্দীপনার মাস, বিষন্ন বিষাদের দুঃখের শোকের মাস। এ মাসে পরাজিত পাক বাহিনী অকাতরে দেশের লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছে-ধ্বংসলীলা চালিয়েছে। অবশেষে ওরা বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজিত হয়ে পালাতে শুরু করে। আত্মসমপর্ন করে। পাশাপাশি বাঙ্গালীর বিজয় হয়, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। মুক্তিযুদ্ধে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, আরো অনেক পাবো। মুক্তিযুদ্ধ একটি চলমান প্রক্রিয়া। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের শত্র“রা এখনো সক্রিয়। ওদের ব্যাপারে আমাদের সকলকে হুঁসিয়ার হতে হবে। বর্তমান প্রজন্ম সহ সর্বস্তরের সকলকে দেশপ্রেম ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে ওদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হবে। জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আমাদের আস্থা রেখে তারই নির্দেশে দেশের উন্নয়নের কাজে অংশীদার হতে হবে। ২০৪১ সালে দেশ হবে বিশ্বে অন্যতম উন্নত দেশ।
বিশেষ অতিথি কেন্দ্রীয় সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম যুগ্ম মহাসচিব প্রফেসর আবুল কালাম আজাদ পাটোয়ারী বলেন নবী করিম (স.) এর বংশের সবাই যেমন মুসলিম ছিলেন না তেমনি বাঙ্গালী জাতির কেহ কেহ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। তারা বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সঙ্গে থেকে ও ঘুরে মুক্তিযুদ্ধ ও যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, কাজ করেছে। যেমন করেছে খোন্দকার মোশতাক, জিয়াউর রহমান। এখনো বিরোধীদের অনুচরেরা ঘাপটি মেরে থেকে দেশের বিরুদ্ধে, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে লিপ্ত। কিন্তু বীরের জাতি তা নসাৎ করে দেবে। আর কোনরূপ কনসিডার নয়।
বিশেষ অতিথি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আসালত বলেন, বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েই আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলাম। আর আজ তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত দেশ উন্নয়ন কাজে ঝাপিয়ে পড়ে দেশকে উন্নত করতে হবে। দেশকে দুর্নীতি সন্ত্রাস মাদকমুক্ত করতে হবে।
বিশেষ অতিথি বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবীর বলেন, দেশ আজ স্বাধীন বলেই আমরা মুক্ত মনে মুক্তমঞ্চে কথা বলতে পারছি। এর জন্য আমরা কৃতজ্ঞ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর কাছে। তাদের অবদানের জন্যই আমরা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। আমাদেরকে শুধু ভৌগলিক স্বাধীনতাই নয়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে, দেশকে উন্নত দেশে রূপান্তর করতে হবে। দেশকে মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতি মুক্ত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারন করেই সবাইকে ঐক্যবন্ধ হয়ে দেশের ও দেশের মানুষের উন্নযনের জন্য কাজ করতে হবে। আলোচনা অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করেন পেশাজীবী মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড সভাপতি এবিএম ফজলে রানা।
আলোচনাশেষে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।