| |

আধুনিক ডিজিটাল সভ্যতায় প্রথম বর্ষপূর্তির স্বমহিমায় উজ্জ্বল বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরাম -ড. দেওয়ান রাশীদুল হাসান

আধুনিক যুগ ডিজিটাল যুগ। প্রাতিষ্ঠানিক উজ্জ্বল ভাবমূর্তি নিয়ে বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরামের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ২২৬১ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই দেশের সিনিয়র নাগরিকদেরকে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আওতায় আনার জন্য ফেসবুকে এই গ্রুপটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত এক বছরে দৃঢ়চেতা সম্মানিত সদস্যরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্বতস্ফুর্তভাবে কাজ করে সংগঠনকে শক্তিশালী পর্যায়ে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন। সবাইকে হৃদ্স্পন্দিত শুভ্র অভিনন্দন। ‘বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরাম’ (Bangladesh Senior Citizens’ Forum-BSCF) এর সদস্যরা গত এক বছরে নিজেদের মধ্যে মিত্রতার বন্ধনকে আরো বৃহত্তরভাবে পারস্পরিক বোঝাপড়ার অনন্ত ও শ্বাশত মহিমায় উজ্জীবিত করেছেন। আনন্দের বিষয় এই যে, ফোরামের সদস্য সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে পুরুষের গড় আয়ু ৭০ এবং নারীদের ৭২ বছর, যা কখনো ৮০ থেকে ৯০ বছরেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব প্রবীণদের সংখ্যা দেড় কোটিরও বেশি, যা’ প্রতি বছর ৪.৪১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালে ষাটোর্ধ্ব প্রবীণের সংখ্যা দাঁড়াবে সোয়া ২ কোটি এবং ২০৫০ সালে ৪ কোটিতে পৌঁছাবে। মানুষ জন্মের পর শৈশব-কৈশোর ও যৌবন পার করে এক সময় বার্ধক্যে উপনীত হয়। এ জীবনটা কারো জন্যই শতভাগ সুখকর হয় না। কারো জন্য সুখকর হলেও অধিকাংশের নিকট সময়টা হয়ে উঠে তিক্ত ও অসহ্য। এ সময় তাদের প্রয়োজন হয় যথাযথ সহযোগী, যার সাথে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে।

বাংলাদেশে প্রবীণদের সংখ্যা ক্রমশ: বাড়তে থাকলেও ভবিষ্যতে এই জনগোষ্ঠির সেবা ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং জনবল এখনও অপ্রতুল। প্রবীণদের প্রতি সম্মান দেখানো সব সমাজেরই রীতি। অধিকার ব্যতীত মানুষ তার ব্যক্তিত্বকে উপলব্ধি করতে পারে না। প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, দায়দায়িত্ব এবং তাদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকতে ইসলাম সবসময় গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন, ‘প্রবীণদের সাথেই তোমাদের কল্যাণ, বরকত রয়েছে’। অন্যত্র রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আমাকে দুর্বলদের মাঝে খোঁজ কর। কেননা, তোমাদের মধ্যে যারা দুর্বল তাদের অসীলায় তোমরা রিযিক ও সাহায্য প্রাপ্ত হয়ে থাক’। তিনি আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা এই উম্মতকে তাদের দুর্বল লোকদের দো’আ, ছালাত ও ইখলাছের মাধ্যমে সাহায্য করে থাকেন’। কারণ, দুর্বলদের ইবাদতে ও দো‘আয় প্রবল একনিষ্ঠতা থাকে, থাকে দুনিয়ার সৌন্দর্য থেকে অন্তরের পরিচ্ছন্নতা। তাদের আগ্রহ, মনোযোগ ও অভিপ্রায় একই দিকে হয়ে থাকে। সে কারণেই তাদের দো‘আ কবুল হয়ে থাকে। বার্ধক্য মানবজীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা। কুরআন মাজীদে খুবই সংক্ষেপে এর স্বরূপ সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘আল্লাহ, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন দুর্বল অবস্থায়, দুর্বলতার পর তিনি দেন শক্তি, শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা’ ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান’। -সূরা রূম (৩০) : ৫৪

অধিক বয়সীদের বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তির সংবাদ দিব না? তারা বলল, হ্যাঁ আল্লাহর রাসূল (সা.)। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে দীর্ঘ আয়ু লাভ করে এবং সুন্দর আমল করে’। অন্য হাদীছে রয়েছে, জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সা.), উত্তম ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, যে দীর্ঘ জীবন পেয়েছে এবং তার আমল সুন্দর হয়েছে। সে আবার প্রশ্ন করল, মানুষের মধ্যে নিকৃষ্ট কে? তিনি বললেন, যে দীর্ঘ জীবন পেয়েছে এবং তার আমল খারাপ হয়েছে’। তাই প্রবীণ যেই হোক না কেন তাকে সর্বাবস্থায় সম্মানের চোখে দেখতে হবে। উপযুক্ত পানাহার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, যথাযোগ্য পোষাক ও মানসম্মত আবাসনের ব্যবস্থা করে তাদের কাছ থেকে দো‘আ নেওয়া প্রয়োজন। রাসূল (সা.) আরো বলেন, ‘নিশ্চয় শুভ্র চুল বিশিষ্ট মুসলিমকে সম্মান করাই আল্লাহকে সম্মান করার শামিল’।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ শাস্ত্রের উপনিষদ (জ্ঞান) শাখায় উল্লেখ, “পিতা স্বর্ণ, পিতা ধর্ম, পিতাহি : পরসংতপঃ পিতোরি প্রীতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্ব দেবতা”। হিন্দুশাস্ত্রে আরো বলা হয়েছে, ‘গর্ভধারিণী মা পিতা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থ ত্রিপিটক গ্রন্থের সূত্র পিটকের মহামঙ্গল সূত্রে উল্লেখ, “পিতা-মাতার প্রতিপালন, সেবা ও ভরণ-পোষণ উত্তম মঙ্গল কর্ম”। মূলত খ্রিস্টান-বৌদ্ধসহ অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থে মা-বাবা এবং প্রবীণ ব্যক্তিদের ভক্তি, শ্রদ্ধা, সম্মান, সেবা যতেœর নির্দেশ রয়েছে। আজকাল সমাজের সকল ধর্মের মানুষ ধর্মীয় জ্ঞানার্জন ও চর্চা হতে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে সমাজের সর্বক্ষেএে অরাজকতা দেখা দিয়েছে। ক্রস-কালচারাল পরিবেশে মেলামেশার অভিজ্ঞতার অভাবে শুধুমাত্র ইন্টারনেট-এ ডিজিটাল মাল্টি কালচারাল ইসলামিক জীবন দেখে তরুণরা গোলক ধাঁধায় পড়ে গেছে। মৌলবাদী ধার্মিক, মডারেট ধার্মিক, সাম্যবাদী ধার্মিক, কিংবা নারীবাদী ধার্মিকদের মত ও আদর্শের ভাষা আমাদের মত সাধারণ জনতা বোঝেনা। মানুষ যদি অন্তরাত্মাকে না চেনে, অন্য ধর্মকে সম্মান করতে না শিখে নিজেকে “সর্বশ্রেষ্ঠ” প্রমাণের জন্য সদা ব্যস্ত থাকে, তাহলে সমাজে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা গড়ে উঠবে না।

বাংলাদেশে একসময় যারা নামী দামী বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক ও চাকরিজীবী ছিলেন, বর্ণাঢ্য ছিল যাদের জীবন, বৃদ্ধ বয়সে এসে নিজ সন্তানদের অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন তারাই। পরিবার ও সন্তান থেকেও যেন ‘সন্তানহারা ইয়াতীম’ হয়ে জীবন যাপন করছেন। অধুনা বিশ্বে প্রবীণরা সবচেয়ে বর্বর যে বিষয়টির মুখোমুখি হয়েছে তা হলো ‘প্রবীণ নিবাস’ কিংবা ‘বৃদ্ধাশ্রম’। এখানে বসবাসরত প্রবীণদের জীবন ইতিহাস এবং বর্তমান অভিজ্ঞতা শুনলে অধিকাংশ ঘটনায় চোখে পানি ধরে রাখাই কষ্টকর। প্রবীণ পিতা-মাতার প্রতি করণীয় সম্পর্কে মহান আল্লাহ পিতা-মাতার প্রতি যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদানের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করো না এবং তোমরা পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহ’লে তুমি তাদের প্রতি উহ শব্দটিও কর না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। আর তাদের সাথে নরমভাবে কথা বল। আর তাদের প্রতি মমতাবশে নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত কর এবং বল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাদের প্রতি দয়া কর যেমন তারা আমাকে ছোটকালে দয়াবশে প্রতিপালন করেছিলেন’ (বনী ইসরাঈল ১৭/২৩-২৪)। অনেক সন্তান বৃদ্ধ পিতা-মাতার সাথে খারাপ আচরণ করে থাকে। এমনকি মারধর পর্যন্ত করে। স্ত্রীকে খুশী করার জন্য বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অচেনা জায়গায় ফেলে আসা, দূরপাল্লার গাড়ীতে তুলে দিয়ে পালিয়ে আসা, ডাক্তার দেখানোর কথা বলে জমি দলীল করে নিয়ে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় বের করে দেয়া, হাসপাতালে ভর্তির কথা বলে বৃদ্ধাশ্রম নামক কারাগারে বন্দী করে রাখার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার কথা মাঝে-মধ্যে অধুনা সোশাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেসবুক, ইউ টিউব, টেলিভশন ও পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়। অথচ মহান আল্লাহর নির্দেশ হ’ল তাদের সাথে এমন আচরণ তো দূরের কথা ‘উহ’ শব্দও করা যাবে না। বরং শ্রদ্ধাভরে নম্রভাবে তাদের সাথে কথা বলতে হবে। সর্বক্ষণ তাদের জন্য আল্লাহর শেখানো দো‘আ পাঠ করতে হবে; যেন তাদের উভয়ের প্রতি মহান আল্লাহ রহম করেন।

অধিকাংশ প্রবীণ মানুষ সামাজিক ও আর্থিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তাই, সিনিয়র সিটিজেনদের সামাজিক সুরক্ষার জন্য সরকারকে আশু নীতিমালা গ্রহণ করে তা’ বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রবীণ এর ইংরেজি প্রতিশব্দটিও বেশ চমৎকার ‘সিনিয়র সিটিজেন’। এই শব্দটিও সমীহ জাগানিয়া। বাংলাদেশের পরিবর্তিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করা প্রয়োজন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অগ্রগতির কথা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির কথা, গ্রামীণ এলাকায় প্রবীণ নাগরিকদের উচ্চহারে ছিন্নমূল হওয়ার বিষয়টিও বিবেচিত হচ্ছে। প্রবীণ পুরুষদের তুলনায় মহিলারা অনেক বেশি সংখ্যায় একাকিত্বের শিকার। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে সমস্ত মানুষ প্রবীণ নাগরিক। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা পদ্ধতি গড়ে তোলার জন্য বিশেষ করে বৃদ্ধা এবং অতিবৃদ্ধ – বৃদ্ধাদের কথাও নব প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটির সদস্যরা ভাবছে এবং এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে ফোরামের সম্মানিত সদস্যরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তবে প্রবীণ সংগঠনগুলোর পাশাপাশি সরকারকে এ বিষয়ে আরও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রবীণ নীতিমালা অনুযায়ী সিনিয়র নাগরিকদের সমাজে বৈষম্যমুক্ত ও নিপীড়নমুক্ত নিরাপদ জীবন যাপনের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলা রয়েছে। একইসঙ্গে বলা হয়েছে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সম্পদ, মর্যাদা, লিঙ্গ নির্বিশেষে মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। সমাজে একজন প্রবীণের অবস্থান অত্যন্ত মর্যাদার এবং সম্মানের। প্রবীণদের একটু ভালো রাখার জন্য এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যেখানে সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ সেবায় ভালো থাকবেন সিনিয়র নাগরিকরা। কর্মকুশলতা ও সৃজনশীলতা দিয়ে সিনিয়র নাগরিকদের অত্যুচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে অনুপ্রাণিত করতে হবে।

বর্তমানে দেশের প্রায় ১৫ লাখ প্রবীণ অবসরকালীন পেনশন ভোগ করছেন৷ ৩৫ লাখ দরিদ্র প্রবীণ পাচ্ছেন বয়স্কভাতা৷ শুনলে লজ্জা পাবেন, জাতীয় পএ-পএিকায় প্রকাশিত েিপার্টে দেখা যায় যে, বেশ কয়েক লাখ প্রবীণ জীবন ধারণ করছেন ভিক্ষাবৃত্তিতে! মধ্যবিত্ত এবং শিক্ষিত প্রবীণদের কিন্তু কষ্টের সীমা নেই৷ এছাড়া প্রবীণ নারী, প্রতিবন্ধী, সমাজবিচ্ছিন্ন এবং উদ্বাস্তু প্রবীণদের কথা ভাবার এবং লাগসই ব্যবস্থা নেয়ার জরুরি প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে৷ দেশের অনেক প্রবীণ যেমন অবসরকালীন ভাতা এবং অনেক দরিদ্র প্রবীণ বয়স্কভাতা পেলেও প্রবীণদের জন্য এখনো অনেক কিছু করা বাকী আছে৷ এখনো তো কয়েক লাখ প্রবীণকে জীবন ধারণ করতে হয় ভিক্ষা করে! দেশের গ্রাম-শহরের প্রতিটি সমাজ প্রবীণবান্ধব করে গড়ে তোলার এখন সময় এসেছে৷ বার্ধক্য বীমা এবং সার্বজনীন নাগরিক পেনশন ব্যবস্থা চালু করা, আরামপ্রদ ও নিরাপদ আবাসন বা প্রবীণনিবাস গড়ে তোলা, পেশাগত ও সাধারণ শিক্ষা পাঠ্যক্রমে বার্ধক্য ও প্রবীণকল্যাণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বর্তমান সরকারকে ভাবতে হবে। এর পাশাপাশি, বিশ্বময় অভিবাসন, নারীশিক্ষা ও কর্মসংস্থান ইত্যাদির সুযোগ অবারিত হবার কারণে সন্তানরা এখন মাতাপিতাকে একাকী রেখে দূরে, বহু দূরে চলে যাচ্ছে৷ আবার, স্বচ্ছল প্রবীণ বা বয়োবৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রী’র পক্ষে স্বতন্ত্র বাড়িতে একাকী বসবাস করার মতো আয়োজন, নিরাপত্তা ও প্রচলন আমাদের দেশ-সমাজ-সংস্কৃতিতে এখনও গড়ে ওঠেনি স্বস্তিময় বার্ধক্যের লক্ষে প্রতিজন প্রবীণের প্রয়োজন পেশাদারী চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা, উপযোগী খাদ্য, ওষুধ, পথ্য, শয্যা, বিনোদন, নিরাপত্তা, সম বয়সীদের সরব উপস্থিতি এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা৷ কিন্তু আজকের বাংলাদেশে উপযুক্ত সবকিছু নিজ বাড়িতে বসে পাওয়া খুবই কঠিন৷ কারণ, নিজেদের বাসা-বাড়িতে প্রবীণ পিতামাতার দেখভালের জন্যে সন্তান সন্ততির সংখ্যা বা উপস্থিতি খুবই কম, সেবাদানকারী মানুষ জোগাড় করাও দুরূহ আর পেশাদার ডাক্তার-নার্স পাওয়া প্রায় অসম্ভব৷ বিশেষ করে নারী, সংসারহীন, সন্তানহীন, একা, কেবল কন্যাসন্তানধারী, গ্রামীণ ও হতদরিদ্র প্রবীণদের নিরাপদ বসবাস এবং মৌলিক চাহিদার প্রতি বিশেষ নজর দেয়া দরকার৷ আমাদের মনে রাখতে হবে, সদস্যরা অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে সার্বক্ষণিক তাঁদের মূল্যবান মতামত প্রদান ও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরামের মত প্রাণপ্রিয় সংগঠনের গতিশীলতাকে অব্যাহত রেখেছেন।

বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরাম একটি অবৈতনিক, অরাজনৈতিক, অলাভজনক ও অসাম্প্রদায়িক সেচ্ছাসেবী সংগঠন। প্রতিষ্ঠার প্রথম বর্ষ পূর্তিতে বিগত এক বছরের মহান সংগ্রামী পথচলার অভিজ্ঞান ও তার পরিণতি অর্থেই বর্তমান সংগঠন। প্রতিষ্ঠার পূর্বেও যেমন ছিল প্রাক-প্রতিষ্ঠা বা প্র¯তুতি পর্ব এবং প্রতিষ্ঠার প্রথম পথচলায় যেমন থাকে প্র¯তুতি পর্বের অভিজ্ঞান, তেমনি সাংগঠনিক দ্বিতীয় পর্যায়ের পথ চলাতেও থাকবে প্রথম পর্যায়ের অভিজ্ঞতা। সিনিয়র সিটিজেনরা সবাই আধুনিক মনস্কতার বহুবিধ অগ্রগতির সাথেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই আজকের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চায়। প্রবীণরা সম্মান ও স্বীকৃতি চান।‘সম্মানের সঙ্গে প্রবীণদের সেবা দিন নিজের বার্ধক্যের প্র¯তুতি নিন’ – এই স্লোগানকে সামনে রেখে সিনিয়র সিটিজেন ফোরামের সকল সদস্য গত এক বছর ধরে স্বতস্ফুর্তভাবে নিরলসভাবে কাজ করছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে অনেক কিছু নিয়ে গবেষণা হয় কিন্তু প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থান নিয়ে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক কোনো গবেষণার উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থার উন্নতি না হলে ভবিষ্যৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠির জন্য যে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে, তা’ বেশ নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

সিনিয়র সিটিজেন ফোরামের গত এক বছরের কার্যক্রমের (২০১৮-২০১৯) মধ্যে রয়েছে সেমিনার, প্রবীণদের নিয়ে আলোচনা সভা, বিশেষ কয়েকটি কমিটি ও সাব কমিটির সভা করে সংগঠনের গঠনতন্ত্র প্রণয়ন, সঞ্চয়পত্র সম্পর্কিত স¥ারকলিপি অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ, কার্য নির্বাহী কমিটি গঠন এবং সাধারণ সভায় সর্বসস্মতিক্রমে সংগঠনের গঠনতন্ত্র চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে। বর্তমানে ফোরামের রেজিস্ট্রেশনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও তথ্য বিনিময় চলছে। বিশ্বায়নের এই যুগে যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে গড়ে উঠছে একক পরিবার প্রথা। আমরা আশা করবো বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া, ফেস বুক, ইউ টিউব, রেডিও টেলিভশন ও সংবাদপত্রের সাংবাদিকরা প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করবেন। গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা কর হলে প্রবীণ সমস্যার ব্যাপকতা কমিয়ে আনা অনেকাংশেই সম্ভব বলে বাংলাদেশের সিনিয়র সিটিজেনরা সুদক্ষ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক কল্যাণ ও সাহায্যার্থে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে অনেক সামর্থ্যবান ব্যক্তি, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা রয়েছেন যারা জনকল্যাণে এগিয়ে এসে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই, বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরামকে সরকারি ও সেরকারি পর্যায়ে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।

আমাদের জীবনে বার্ধক্য অবধারিত এবং অলঙ্ঘনীয়। আমরা সবাই কিন্তু প্রবীণ! রীতিমতো হয়ে গেছি অথবা হচ্ছি! বাংলাদেশের বিরাট সংখ্যক নাগরিক নানা ধরনের প্রতিবন্ধিতা, অটিজমে আক্রান্ত এবং সমাজ বিচ্ছিন্ন৷ আমাদের সাধারণের ধারণা যে, প্রতিবন্ধিতা এবং অটিজম সম্ভবত শিশুদের ব্যাপার৷ বাস্তবতা হলো, এ ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন ব্যক্তিবর্গ একসময় প্রবীণ হবেন৷ আবার, বার্ধক্যে পৌঁছে অনেকেই বিভিন্ন প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত হন৷ প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবন্ধী প্রবীণদের জন্যে আমরা কি ন্যূনতম কোনো কর্মসূচি গ্রহণের কথা ভেবেছি? ভাবিনি৷ এটি আমাদের এক ধরনের বয়স বৈষম্যজনিত গাফিলতি৷ পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, প্রবীণ পুরুষের তুলনায় প্রবীণ নারীরা বেশিদিন বাঁচেন৷ অধিকাংশই আবার বিধবা হয়ে! আমাদের সমাজে তাঁরাই বেশি মাত্রায় অবহেলা, দুর্ব্যবহার এবং বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন৷ এমনকী নিজের ভাই, স্বামী, সন্তানদের কাছ থেকেই! অসহায় প্রবীণার হৃদয়ে এমন অবস্থায় নীরবে ভেসে আসে, ‘‘যখন তোমার কেউ ছিল না তখন ছিলাম আমি, আর এখন তোমার সব হয়েছে পর হয়েছি আমি!” প্রবীণজন কিন্তু ভিন্ন কেউ নন, আমাদেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হিসেবে যে সম্মান ও বিশেষ সুবিধা তাঁদের প্রাপ্য তা’ দিতে আমরা যেন হেলাফেলা না করি। রাস্তা পারাপার বা যানবাহনে ওঠানামায় সহায়তা করা, যানবাহনে তাঁদের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া, হাসপাতাল-অফিস-আদালতে প্রবীণদের অগ্রাধিকার দেওয়া, যানবাহনের ভাড়া ও কেনাকাটায় বিশেষ ডিসকাউন্ট দেওয়া- এভাবেই প্রবীণদের প্রতি আমরা সম্মান দেখাতে পারি। গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সংখ্যায় বাংলাদেশের প্রবীণরা কেবল দ্রুুত বাড়ছেন, তাই নয়; এঁদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর মতো পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক সক্ষমতা ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে৷ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন নায্য দাবী দাওয়া ও চাহিদার প্রেক্ষিতে ‘প্রবীণ কল্যাণ বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয়’ জরুরি ভিওিতে স্থাপনসহ সদাশয় সরকারকে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রবীণদের বাস্তব কল্যাণ বিধানে বর্তমান ফোরামের বিচক্ষণ উদ্যোগ, সাফল্য এবং সুনাম প্রশংসনীয়৷ প্রবীণদের কল্যাণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি চাই বেসরকারি সামাজিক উদ্যোগ, বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধভাবে আর্থিক উন্নয়ন এবং স্বেচ্ছা সেবামূলক কাজে উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তির গতিশীল ও সৃজনশীল নেতৃত্ব।
লেখক: সার্ক স্কলার, প্রশিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক, খ্যাতিমান গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ, প্রবীণ সাংবাদিক
এবং সাবেক ডাইরেক্টর (জনসংযোগ), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ