| |

জাতীয় অধ্যাপক শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সংগ্রাম: শিক্ষা একজনের,জ্ঞান আমাদের সবার -ডক্টর দেওয়ান রাশীদুল হাসান

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিএশিল্পী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন একাধারে বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের পথিকৃৎ, সফল শিল্পী-শিক্ষক, বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান ধারক-বাহক ও সেবক এবং মানবতার প্রেমিক। নিজ প্রচেষ্টায় তিনি কলকাতায় গিয়ে সরকারি আর্ট স্কুলে ভর্তি হন এবং ছাত্র অবস্থাতেই তরুণ শিল্পী হিসেবে সারা বাংলায় সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার মাধ্যমে মানবতাবাদী শিল্পী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। দেশভাগের প্রেক্ষাপটে ১৯৪৮ সালে ঢাকায় একটি শিল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার নেতৃত্ব দান তার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন। তার বিখ্যাত চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা, সংগ্রাম, সাঁওতাল রমণী, ঝড়, কাক, বিদ্রোহী ইত্যাদি। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে গ্রামবাংলার উৎসব নিয়ে আঁকেন তার বিখ্যাত ৬৫ ফুট দীর্ঘ ছবি নবান্ন। চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য জনসাধারণ্যে তিনি ‘শিল্পাচার্য’ অভিধা লাভ করেন। অনুমান করা হয়, তার চিত্রকর্মের সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। বাংলাদেশের চিত্রকরদের মধ্যে তিনি শিল্পগুরু বিবেচিত। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে এই কীর্তিমান শিল্পীর ৮০৭টি চিত্রকর্ম সংগ্রহে আছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সংগ্রহে আছে প্রায় ৫০০ চিত্রকর্ম। এছাড়া, পাকিস্তানের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় তার বিপুল পরিমাণ চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। এমন কি তার পরিবারের কাছে এখনো প্রায় চার শতাধিক চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। ময়মনসিংহের সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত চিত্রকর্মের সংখ্যা ৬২টি। জয়নুল আবেদিন ছিলেন সাধারণ আটপৌরে মানুষের শিল্পী। সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র, দুঃখ-বেদনা ছিল এ মহান শিল্পীর ছবির উপজীব্য। তিনি একাধারে ছিলেন নিসর্গপ্রেমিক, অন্যদিকে তার রঙ-তুলিতে ফুটে উঠেছে দ্রোহের ভাষা। শিল্পাচার্যের ‘৪৩-এর দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা তুলে ধরার পাশাপাশি তৎকালীন ব্রিটিশ রাজের এ দেশের মানুষের প্রতি চরম অবহেলা এবং মানুষের দুর্দশা লাঘবের ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। একইভাবে ১৯৭০ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মহাপ্রলয়ের পর বঙ্গবন্ধু যেমন ছুটে গিয়েছিলেন দুর্গত মানুষের পাশে, শিল্পী জয়নুল আবেদিনও সেদিন ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তিনিও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দুর্গত এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেখান থেকে ফিরে শিল্পী আঁকলেন তার বিখ্যাত ছবি ‘মনপুরা-৭০’। ৩০ ফুট দীর্ঘ এ শিল্পকর্মে শিল্পী সাইক্লোনের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ়চিত্তের ইঙ্গিতও প্রতিভাত করেছেন। জীবনাশ্রয়ী বাস্তবানুগ শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কৃতিত্ব সর্বজন স্বীকৃত। সাধারণ মাটির মানুষের বিচিত্র জীবনের বিভিন্ন দিক এবং নিসর্গ, নবান্ন, দুর্ভিক্ষ, জলোচ্ছ্াস, যুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও জীবজন্তু ইত্যাদি অনায়াসে তার শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।
ময়মনসিংহ শহরের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহমান পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে একটি দোতলা দালান আশ্রয় করে ১৯৭৫ সালে এই সংগ্রহশালাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলা ১৩৮২ সালের ১লা বৈশাখ তারিখে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এই সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন। সে সময় দেশব্যাপী জয়নুল আবেদিনের বিভিন্ন শিল্পকর্ম সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আর তাই প্রথম দিকেই শিল্পীর নিজের এলাকা তথা ময়মনসিংহে এই সংগ্রহশালাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। উদ্বোধনের পর ৭ জুলাই তারিখে সংগ্রহশালার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৬ সালে সংগ্রহশালাটি নতুন করে সাজানো হয়। নীচতলায় ব্যবস্থাপনা কক্ষসমূহ এবং দোতলায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছবির গ্যালারী স্থাপন করা হয়। মূল ভবনের পেছন ভাগে ব্যবস্থাপকদের বাসস্থানের সঙ্গে সঙ্গে ৩টি কুটির স্থাপন করা হয়েছে যা শিল্প রসিকদের সাময়িক আবাসনের জন্য ব্যবহার করা হয়।
একটি দোতলা ভবন বিশিষ্ট যে জমিতে এটি অবস্থিত তার মোট আয়তন হচ্ছে ৩.৬৯ একর। পুরো চত্বরটি গাছগাছালি পরিবেষ্টিত। যে ভবনটিতে সংগ্রহশালা অবস্থিত ইংরেজ আমলে তা’ ছিল জনৈক ইংরেজ বার্ডেন সাহেবের বাড়ী। তার কাছ থেকে বড়লাটের (ভাইসরয়) কাউন্সিল সদস্য জনৈক নলিনীরঞ্জন সরকার বাড়ীটি কিনে নেন। নলিনীরঞ্জন ১৯৪৭-এ দেশ বিভাগের পর ভারতে চলে যান। এরপর সরকার বাড়িটি অধিগ্রহণ করে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এটি ছিল ঊর্ধতন সরকারি কর্মকর্তাদের সরকারি বাসভবন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরও কয়েক বছর এটি একইভাবে পড়ে থাকে। ১৯৭৫ সালে সরকারী সিদ্ধান্তক্রমে এটিকে সংগ্রহশালায় রূপান্তরিত করা হয়। জয়নুল আবেদিনের মনেও একটি সংগ্রহশালার ধারণা অনেক আগে থেকে বিদ্যমান ছিল। ১৯৫০-এর দশকে তিনি বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেক দুর্লভ ছবির সংগ্রহের কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেদিক দিয়ে বলতে গেলে এই সংগ্রহশালাটির প্রতিষ্ঠা ছিল শিল্পাচার্যের স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নামে প্রায় ২০০০ আসন বিশিষ্ট একটি বিশাল দৃষ্টিনন্দন অডিটরিয়াম রয়েছে। এটি উদ্বোধন করেছিলেন তদানীন্তন ভাইস-চ্যান্সেলর আন্তজার্তিক খ্যাতিসম্পন্ন কৃষি বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এ. কে. এম. আমীনুল হক।
কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অভ আর্টস। চারিদিকে সবাই শুধু শিল্প নিয়েই মত্ত। এদিকে কেউ মানুষের ছবি আঁকছে তো ঐদিকে কেউ প্রকৃতির। কারও হাতে রং তো কারও হাতে চারকোল। জয়নুল আর চোখ ফেরাতে পারেন না। কী সুন্দর স্কুল! কী সুন্দর সবার চিন্তা ভাবনা। এখানে খাতার পাতায় ছবি এঁকে ফেললে কেউ বকুনি দেয় না, বরং সবাই যার যার মতো কাগজ নিয়ে মনের ভাবনাকে তুলে ধরতে ব্যস্ত। বাড়ি ফিরে আর তো জয়নুলের মন বসে না। এ কেমন স্কুলে তাকে যেতে হয়! এই পড়ালেখা তো আর জয়নুলের ভাল লাগে না। তার মন জুড়ে শুধুই কলকাতার সেই আর্টস স্কুল। আচ্ছা এই দিকে এমন একটা স্কুল তৈরি হতে পারে না? ধারে কাছে? তাহলেই তো জয়নুল সেই স্কুলে যেতে পারে। জয়নুলের সেই স্কুল তৈরির স্বপ্ন পূরণ করতে হয় জয়নুলকেই। তবে তা অনেক পরের কথা। কলকাতা ঘুরে এসে অনেক ভেবে চিন্তে জয়নুল ঘোষণা দিলেন এই স্কুলে আর সে যাবে না। এই লেখাপড়া তার ভালো লাগে না। সে কলকাতায় যেতে চায়। আরও আঁকা শিখতে চায়। জয়নুলের বাবা তো খুব রেগে গেলেন। সামনে তার মাধ্যমিক পরীক্ষা। সে সব বাদ দিয়ে এ আবার কী ধরণের আবদার! সবার অমতে এবং সবার সাথে অভিমান করে ১৯৩৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা বাদ রেখেই জয়নুল চলে গেলেন কলকাতা। তিনি আর্ট স্কুলে পড়বেন মানে পড়বেনই। তবে সবাই যে অমত করেছিল এমন না। জয়নুলের মা ছেলের উপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। তিনিই নিজের গহনা বিক্রি করে ছেলেকে কলকাতা পাঠান। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৮ দীর্ঘ পাঁচ বছর জয়নুল কাটান কলকাতার গভার্মেন্ট স্কুল অফ আর্টসে। সেখানে তিনি চিত্রকলা শিখেন অন্য ধরণের শিল্পকলাও শিখেন। তবে এখানে এসেও জয়নুলের মন পরে থাকে তার বাড়ি পূর্ববঙ্গে। যেখানে গাছ পালা মাটি মাছ পাখি সব থাকে জয়নুলের চিন্তা জুড়ে। তার মন ভেসে বেড়ায় প্রিয় ব্রহ্মপুএ নদে। তবে তাই বলে জয়নুল তার লেখাপড়ায় ফাঁকি দেন না। তিনি প্রাণ উজাড় করে শিল্প শিখে নেন। আর ১৯৩৮ সালে তার মা জয়নাবুন্নেসার মুখ উজ্জ্বল করে কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অভ আর্টসের ড্রয়িং এ্যান্ড পেইনটিং ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে স্নাতক পাশ করেন। সে বছরই জয়নুলের একটা ছবি সর্ব ভারতীয় চিত্রকলা প্রদর্শনীতে খুব সাড়া ফেলে দেয়। জলরঙে আঁকা ছবিটা ছিল ব্রহ্মপুএ নদের, এই নদকে জয়নুল তার হৃদয়ে নিয়ে ঘুরেন। ছবিটি এতই জনপ্রিয় হয় যে জয়নুল এই ছবির জন্য স্বর্ণপদক লাভ করেন।
আমাদের দেশের শিক্ষা-দীক্ষার সব ক্ষেত্রেই পাশ্চাত্য বিশেষ করে ইউরোপীয় রীতি অনুসরণের প্রয়াস খুব বেশি। তখন সময়টাও ছিল অবিভক্ত ভারতের বৃটিশ ইংরেজ শাসন। তাই সবখানইে তাদের প্রাধান্য। চিত্রকলার ক্ষেত্রেও এর ব্যাতিক্রম ছিল না। তবে ইউরোপীয় রীতির এই অন্ধ অনুসরণ জয়নুল মেনে নিতে পারতেন না। তিনি স্বাধীনভাবে আঁকতে চাইতেন। এই স্বর্ণ পদক প্রাপ্তির মাধ্যমে তার নিজের তৈরি স্বাধীন ধারাও একটা স্বীকৃতি পেয়ে যায়। এরপর জয়নুল আর পিছনে ফিরে তাকাননি। প্রতিদিন নিজের মতো এঁকে তিনি বেশ ভালো সময় কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎ ১৯৪৩ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ লাগে। কলকাতার পথে পথে দেখতে পাওয়া যায় হাড্ডিসার দরিদ্র মানুষের শব দেহ। গ্রামাঞ্চলের মানুষের অবস্থা আরও খারাপ। ডাস্টবিনের পাশে বসে মানুষ আর কুকুর উচ্ছিষ্ট খাবার খাওয়ার যুদ্ধে নেমে যায়। এই দুর্ভিক্ষের জন্য অনেকটাই দায়ী ছিল তৎকালীন ইংরেজ শাসকেরা। তারা এই দেশের মানুষের সম্পদ নিয়ে গিয়ে নিজেদের দেশ সাজিয়েছে সাড়ম্বরে। এদিকে এদেশের মানুষ সামান্য বেঁচে থাকার খাদ্যটুকুর অভাবে গণহারে মরে যাচ্ছে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে উত্তাল হতে থাকে সমগ্র ভারত। জয়নুলও তার প্রতিবাদের পথ খুঁজে নেন ছবি আকার মধ্য দিয়ে। খুব সামান্য কিছু উপকরণ, প্যাকিং পেপার, চাইনিজ কালি আর তুলির আঁচড়ে রেখাচিত্র এঁকে জয়নুল তার ক্যানভাসে তুলে আনেন দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা। দুর্ভিক্ষ শেষ হয়। তবে ভারত থেকে ইংরেজদের উৎখাত করার আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। ইংরেজরা যাওয়ার সময় দেশ ভাগ করে রেখে যায়, ভারত ও পাকিস্তান। জয়নুল আবার ফিরে আসেন তার নিজ ভূমি পূর্ববঙ্গে। এর নাম এখন বাংলাদেশ।
জয়নুল ফিরে এসে দেখলেন তিনি পূর্ববঙ্গকে যেমন রেখে গিয়েছিলেন এখানকার শিল্পকলা এখনও সেখানেই পড়ে আছে। এখনও যদি ছোট কোনো জয়নুলের চিত্র শিল্পী হওয়ার শখ জাগে তার ঘরের পাশেই কোনো স্কুল নেই। দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে কেউ চাইলেই এখন কলকাতা গিয়ে পড়তে পারবে না। জয়নুল আবার মাঠে নামেন তার ছোটবেলার সেই শখকে অন্য হাজার কচি শিল্পীর মধ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে। ১৯৪৮ সালে পুরানো ঢাকার জনসন রোডে যেখানে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রয়েছে তখন সেখানে তখন ছিল ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুল। সে স্কুলের একটা জীর্ণ বাড়িতে জয়নুল আবেদিন মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে গভর্নমেন্ট আর্ট ইন্সটিটিউটের যাত্রা শুরু করেন। জয়নুল আবেদিন ছিলেন এর প্রথম শিক্ষক। ১৯৫১ সাল নাগাদ স্কুলটা সেগুন বাগিচার একটা বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৬ সালে অবশেষে শাহবাগে একটা স্থায়ী জায়গা পায় জয়নুল আবেদিনের সেই আর্টের স্কুলের স্বপ্ন। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এই স্কুলকে প্রথম শ্রেণির সরকারি কলেজের মর্যাদা দেন। তখন এর নাম হয়, পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়। স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত এই নামেই দিব্যি ইন্সটিটিউট চলতে থাকে। এই ইন্সটিটিউট থেকে আরও অনেক নামী ও গুণী কারু শিল্পী, ছবি আঁকিয়ে বের হতে থাকেন। জয়নুল আবেদিন ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এই কলেজের অধ্যক্ষ পদে থাকেন। দেশ স্বাধীনের সংগ্রামেও এই কলেজের ছাত্র ছাত্রীরা খুব জোরালো ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে এই কলেজের নাম হয় বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়। লোকে একে আর্ট কলেজ নামেই চিনত। ১৯৮৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর জয়নুলের সেই স্বপ্নের আর্ট স্কুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদ হিসাবে গৃহীত হয়। আজ আমরা এটিকে চারুকলা ইন্সটিটিউট নামে চিনি। পহেলা বৈশাখে এই চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়।
জয়নুল আবেদিন ছিলেন সাধারণ আটপৌরে মানুষের শিল্পী। সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র, দুঃখ-বেদনা ছিল এ মহান শিল্পীর ছবির উপজীব্য। তিনি একাধারে ছিলেন নিসর্গ প্রেমিক, অন্যদিকে তার রঙ-তুলিতে ফুটে উঠেছে দ্রোহের ভাষা। শিল্পাচার্যের ‘৪৩-এর দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা তুলে ধরার পাশাপাশি তৎকালীন ব্রিটিশ রাজের এ দেশের মানুষের প্রতি চরম অবহেলা এবং মানুষের দুর্দশা লাঘবের ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। একইভাবে ১৯৭০ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মহাপ্রলয়ের পর বঙ্গবন্ধু যেমন ছুটে গিয়েছিলেন দুর্গত মানুষের পাশে, শিল্পী জয়নুল আবেদিনও সেদিন ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তিনিও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দুর্গত এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেখান থেকে ফিরে শিল্পী আঁকলেন তার বিখ্যাত ছবি ‘মনপুরা-৭০’। ৩০ ফুট দীর্ঘ এ শিল্পকর্মে শিল্পী সাইক্লোনের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ়চিত্তের ইঙ্গিতও প্রতিভাত করেছেন। জীবনাশ্রয়ী বাস্তবানুগ শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কৃতিত্ব সর্বজনস্বীকৃত। সাধারণ মাটির মানুষের বিচিত্র জীবনের বিভিন্ন দিক এবং নিসর্গ, নবান্ন, দুর্ভিক্ষ, জলোচ্ছাস, যুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও জীবজন্তু ইত্যাদি অনায়াসে তার শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। কাকতালীয় হলে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের সঙ্গে শিল্পী জয়নুল আবেদিনের অনেক মিল খুঁজে পাই আমরা। দ’ু’জনেরই জন্ম গ্রামে। ছাত্রাবস্থার একটা সময় তাদের কেটেছে ময়মনসিংহে। আমাদের জাতীয় কবি এবং শিল্পাচার্য তৎকালীন পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একই বছর অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে মারা যান। দু’জনকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ সংলগ্ন চত্বরে সমাহিত করা হয়। একজন শব্দের কারুকার্যের মাধ্যমে অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করেছেন। অন্যজন রঙ-তুলির আঁচড়ে সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বঞ্চনাকে তুলে ধরেছেন।
জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশে চারুকলার বিস্তারের জন্য আরও অনেক কাজ করেছেন। তার প্রচেষ্টাতেই নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে লোকশিল্প জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়। ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুএ নদের পারে বেড়ে উঠা জয়নুল তার ভিতরে থাকা শিল্পী সওা দিয়ে বার বার পৃথিবীকে নাড়া দিয়েছেন। তার আঁকা দুর্ভিক্ষের ছবি, সংগ্রাম, ঝড়, সাঁওতাল রমণী অনেক সুনাম অর্জন করে। ১৯৭০ সালে তিনি বাংলাদেশের নবান্ন উৎসব নিয়ে ৬৫ ফুট দীর্ঘ একটি ছবি আঁকেন। সেই ছবিটির নাম ‘নবান্ন’। এটি জয়নুলের বিখ্যাত একটি সৃষ্টি। ঢাকার আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্যই শুধু নয়, পূর্ব বাংলায় চারুকলার পুরোধা হিসেবে অবদান রাখার জন্য তাকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বলে লোকে চিনে। কোন মানুষ যদি বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরে যায় তবে তিনি দেখবেন ৩৬ নম্বর গ্যালারিটি তার শিল্পকর্ম দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। ২০১৬ সালে এটি জাতীয় জাদুঘরে যোগ করা হয়েছে। এর নাম শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন চিত্রশালা।
বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলা আন্দোলনের পথিকৃৎ জয়নুল আবেদিনের নাম বাঙালির কাছে বোধকরি সবচয়ে বেশি চেনা নাম। জয়নুল আবেদিন ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার কেন্দুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। জয়নুলদের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার কেন্দুয়ায়। এখন এই কেন্দুয়া কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কিন্তু জয়নুল যখন জন্ম নিয়েছেন সেটা ময়মনসিংহ ছিল। তার বাবার নাম তমিজউদ্দিন আহমদ। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তার মায়ের নাম জয়নাবুন্নেছা। তার নয় ভাই বোনের মধ্যে জয়নুল আবেদিন ছিলেন সবার বড়। ১৯৪৬ সালে জয়নুল আবেদিন ঢাকা নিবাসী তৈয়ব উদ্দিন আহমদের কন্যা জাহানারা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি তিন পুত্রের জনক। তার জ্যৈষ্ঠ পুত্র সাইফুল আবেদিন স্থপতি। বর্তমানে তিনি আমেরিকা প্রবাসী। দ্বিতীয় পুত্র খায়রুল আবেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল বিষয় নিয়ে এম. এ. এবং কনিষ্ঠ পুত্র মঈনুল আবেদিন(মিতু) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পানি-সম্পদ বিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করেন। ১৯৩৮ সালে চিত্র প্রদর্শনীতে তিনি নিখিল ভারত স্বর্ণপদক লাভ করেন। তিনি ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সবচেয়ে বড় খেতাব হেলাল-ই-ইমতিয়াজ, ১৯৬৮ সালে ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্রদের তরফ থেকে ‘শিল্পাচার্য’ উপাধি এবং ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে জাতীয় অধ্যাপকের সম্মান লাভ করেন।
আধুনিক শিল্পকলার জনক জয়নুল আবেদিন ১৯৭৬ সালের ২৮ মে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। তবে অসাধারণ প্রতিভাবান শিল্পী জয়নুল আবেদিনের অবদান এতই বড় যে এটা শুধু পৃথিবীতে সীমাবদ্ধ রাখা যায়নি। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন কর্তৃক ৯ জুলাই, ২০০৯ বুধ গ্রহের একটি জ্বালামুখ তার মানব সভ্যতায় মানবিক মূল্যবোধ ও উপলদ্ধিকে গভীরতর করার প্রেক্ষিতে ‘আবেদিন জ্বালামুখ’ নামে নামকরণ করা হয়। বর্তমান বাংলাদেশের প্রতিথযশা সিনিয়র প্রায় সকল শিল্পীই তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা পেয়ে ধন্য ও ঋদ্ধ হয়েছেন। তাঁর মানবিক গুণাবলীর জন্যও তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন।
জনপ্রিয় ও গুণী, বাংলাদেশের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা আর গভীর ভালোবাসা।

লেখক: সার্ক স্কলার, প্রশিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক, খ্যাতিমান গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ, প্রবীণ সাংবাদিক এবং
সাবেক ডাইরেক্টর (জনসংযোগ), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ