| |

আধুনিক বিশ্বে অদৃশ্য শক্তি করোনা ভাইরাস, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও বাংলাদেশে দুর্নীতি -ডক্টর দেওয়ান রাশীদুল হাসান

করোনা ভাইরাস, যার পোশাকি নাম কোভিড-১৯, সেই রোগটিকে এখন বিশ্ব মহামারি ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর নতুন করে দুটি শব্দ সামনে এসেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘কোয়ারেন্টিন’; আর আরেকটি হচ্ছে ‘আইসোলেশন’। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। করোনা ভাইরাস মহামারীর এই যে ক্ষিপ্র গতিতে অপ্রতিরোধ্য বিস্তার তার মূলে রয়েছে এর ভয়ানক ছোঁয়াচে প্রকৃতি। গত ০৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তি ভালমতো বুঝে উঠার আগেই তার সংস্পর্শে জন থেকে বহুজনে রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে এ মহামারী মোকাবেলায় বিশ্বের প্রায় সব দেশই উপদ্রুত এলাকায় লকডাউন আরোপ করেছে। উদ্দেশ্য, সংক্রমণ যেন উপদ্রুত এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়, আক্রান্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইসোলেট ও কোয়ারেন্টিন করা যায় এবং প্রয়োজনমাফিক চিকিৎসাও পরিচর্যা দেয়া যায়। বিশ্বের অনেক দেশই এরই মধ্যে লকডাউন শিথিল করেছে, তবে তা করেছে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আসার পরেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘মৃত্যু যখন অবধারিত সেটাতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি ভয় পাইনি। কখনো ভয় পাবো না। আল্লাহ জীবন দিয়েছেন, একদিন সে জীবন নিয়ে যাবেন। তাই এই নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।’

বাংলাদেশ এখন শীর্ষ করোনায় আক্রান্ত দেশের একটি। এই মহামারির হাল নাগাদ তথ্য প্রকাশ করা ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্যানুযায়ী, সংক্রমণের তালিকায় দেশের অবস্থান ১৯ নম্বরে। গত ০১ সপ্তাহে যে পরিমাণ শনাক্ত হয়েছে তাতে বাংলাদেশ অবস্থান করছে শীর্ষ ১০-এ। আর মৃত্যু কিংবা সুস্থ হওয়া বাদ দিলে বর্তমানে যে পরিমাণ আক্রান্ত আছেন, সেই হিসেবে দেশের অবস্থান শীর্ষ ৭-এ। এই যখন সংক্রমণের উপাত্ত, তখন নমুনা পরীক্ষার হারে তলানিতে বাংলাদেশ। দেশে প্রতি ১০ লাখে ২ হাজার ৮৭৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে এটা ১৯ তম। ২০ নম্বরে আছে মেক্সিকো, দেশটিতে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে ২ হাজার ৮৬৬ জনের। পাকিস্তানে প্রতি ১০ লাখে পরীক্ষা হচ্ছে ৩ হাজার ৬৬৭ জনের আর ভারতে পরীক্ষা হচ্ছে ৩ হাজার ৮৮৯ জনের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত দ্রুত সময়ের মধ্যে যত বেশি মানুষকে পরীক্ষার আওতায় নিয়ে আসা যাবে ততই মঙ্গল। অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে লাভ নেই, কারণ কোনো কোনো দেশে ২৪ ঘণ্টায় লাখের ওপরে করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা করা হয়। সেদিকে না তাকিয়ে দেশে প্রতিদিন অন্তত: ২০ হাজার মানুষকে পরীক্ষা করতে হবে। জানা গেছে, বর্তমানে দেশে যে যন্ত্রের মাধ্যমে কোভিড-১৯ শনাক্তকরণের পরীক্ষা হচ্ছে, তাতে একবারে ৯৪টি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। সময় খরচ হয় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। তাছাড়া টেকনোলজিস্ট কিংবা পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত অভাব তো আছেই। তাই অনেক চেষ্টা করেও পরীক্ষার হার বাড়ানো যাচ্ছেনা। বিশেষজ্ঞদের মত, এই পরিস্থিতিতে র‌্যাপিড টেস্ট কিটই একমাত্র ভরসা। এভাবে নমুনা ল্যাবে পাঠিয়ে অপেক্ষা করে করোনা পরীক্ষায় খুব বেশিদূর যাওয়া সম্ভব নয়।

দুঃখের অনুভূতি সবারই হয়। আমরাও ব্যতিক্রম না। আমরা কি ভাবে বেঁচে থাকি আর থাকব, তা তো দেশ, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, জাতি, রাষ্ট্র, ধর্ম ইত্যাদিতে একই হবার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। বিষন্নতার বুকে পোষা চলমান দুঃখের গল্প থাকুক। বুক পকেটে মনের দুঃখ রাখতে হবে। মানুষ স্বার্থপর। স্বর্ণ-রৌপ্য পরিমাপের মত করে যদি মানব জীবনের সুখ, দুঃখ পরিমাপ করা হয়, তাহলে সুখের চেয়ে দুখের গল্পের পরিমাণই পৃথিবীতে অনেক বেশি হবে। এসব বিষণœতাগুলো নিয়েই আমরা বেশ ভাল আছি। বিষণœতা হতে পারে বিভিন্ন মাত্রা কিংবা গভীরতায়। পৃথিবীতে সুখ-দুঃখের সুতো নিয়ে জীবন তো একবারই যাপিত হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ( ১৯১৪-১৯১৮ ) দরুণ ইউরোপীয় সমাজে যাবতীয় নৈতিকতার মানদন্ড ভেঙে পড়েছিল এবং তাকে ফেরত প্রতিষ্ঠা দেবার আগেই আরম্ভ হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ( ১৯৩৯-১৯৪৫), যে যুদ্ধে মানবসমাজের সমস্ত নীতিবোধের জলাঞ্জলি ঘটে যায় ; আনবিক বোমার বিস্ফোরণের মাধ্যমে নস্যাৎ হয়ে যায় এযাবৎ দার্শনিকদের ‘ভালো, ‘উন্নত’,’সভ্য’, ‘মানবিকতা’ ‘ব্যক্তি চরিত্র’, ‘নৈতিক চরিত্র’ ‘ন্যায়পরায়ণতা’, ‘সততা’, ‘কর্তব্য পালন’, ‘দায়িত্ব’ ‘ভালো মন্দ বিচার’ ‘বিশ্বাস’, ‘হিতসাধন’, ‘মানুষের মঙ্গল’, সহিষ্ণুতা ইত্যাদি বিষয়ক বক্তব্যগুলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও যে আঞ্চলিক যুদ্ধগুলো হয়েছে, তাতেও দেখা গেছে শত্রুপক্ষের নারীদের আয়ত্ব করে ধর্ষণ করাটা সৈন্যদের প্রধান লক্ষ্যগুলোর অন্যতম। ভিয়েৎনাম যুদ্ধে নাপাম বোমায় জ্যান্ত পোড়ানো হয়েছে সেদেশের সাধারণ মানুষকে। সাম্প্রতিক নমুনা তালিবানের দ্বারা আফগানিস্তানে বুদ্ধমুর্তি ধ্বংস, ইরাকে আইসিস বাহিনীর দ্বারা তাবৎ প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন ধ্বংস। নিজেকে প্রকাশ করতে না পারলে কীভাবে উঠে আসবে আমাদের ক্ষোভ, দুঃখের কথা, আমাদের সমবেদনার কথা! সাহিত্য মনকে সমৃদ্ধ করে, উদার করে। কথায় বলে এক সাথে থেকে তিক্ততা বাড়ানোর চেয়ে, দূরে গিয়ে বা আলাদা হয়ে, মানুষকে সম্মান করা অনেক ভালো।

যা বলছিলাম, এই বৈশ্বিক মহামারীর কারণে সারা বিশ্বের আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ড ব্যাহত হয়েছে। বলা যায়, আমাদের নিকট ভবিষ্যৎ ইতিমধ্যেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। কারণ, করোনার আক্রমণ ধীর গতির এবং অসুস্থতা দীর্ঘদিনের। যে মানুষগুলো কয়েকদিন আগে ভাইরাস আক্রান্ত হলো তাদের উপসর্গ মাত্র প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। এমনকি আক্রান্ত মানুষগুলো বাড়িতে নিজেরা বিচ্ছিন্ন থাকলেও তাদের সংক্রমণ ঠেকাতে পারবে না ঐক্যের সুর নাকি বেজে উঠবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা থেকে। কারণ, মানুষ বাইরে বেরিয়ে পড়বে, প্রতিবেশী, দেশি-বিদেশি সবার সাথে সম্পর্ক গড়বে। করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তা’ কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা। মানুষের নিজস্ব অধিকার রয়েছে যতদিন তারা বাঁচবে নতুন নতুন মতবাদের মাধ্যমে তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হবে। লক্ষণহীন করোনা নিয়ে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। এ ধরনের রোগীদের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণের সম্ভাবনা অতি বিরল বলেই মনে করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি ‘ভঙ্গুর’। করোনাকালীন এই সময়ে এখানে সামাজিক বৈষম্য এতটাই প্রকট যে, অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করছেন। বিপরীতে করোনায় আক্রান্ত ভিআইপিদের দেয়া হচ্ছে উন্নত চিকিৎসা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য এখন পর্যন্ত ১১২টি হাসপাতালে বেড রয়েছে ১৩ হাজার ৯শ ৮৪টি। আর সারা দেশের কোভিড রোগীদের জন্য বরাদ্দ আছে সব মিলিয়ে ৪০০টি আইসিইউ বেড, ৩০০টি ভেন্টিলেটর আর ১১২টি ডায়ালাইসিস ইউনিট। গত ১৩ জুন ২০২০ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য বুলেটিন অনুযায়ী বাংলাদেশে কোভিড-১৯ পরীক্ষা করা হয়েছে সর্বমোট ৪,৮৯,৯৬০ জনের; যার মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬,৬৩৮ জনের এবং তাদের মধ্যে আক্রান্ত পাওয়া গেছে ২,৮৫৬ জন। দেশে এখন পর্যন্ত সর্বমোট আক্রান্ত পাওয়া গেছে ৮৪,৩৭৯ জন। মোট সুস্থ হয়ে বাড়ী চলে গেছেন ১৬,৭৪৭ জন; যাদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ৫৭৮ জন। দেশে গত ২৪ ঘন্টায় ৪৪ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। মোট মৃত্যু ঘটেছে ১,১৩৯ জনের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ জুন-এর তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে সুস্থ হওয়ার হার ২১.২%, মৃত্যুর হার ১.৩% এবং সঙ্গনিরোধ (কোয়ারেন্টাইন) ও আইসোলেশনে (রোগ-অন্তরণ) আছে ৭৭.৫%। ওয়ার্ল্ডোমিটারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১০ লাখে কোভিড-১৯ নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ২,৮৭৬ জনের। এখন হার্ড ইমিউনিটির উপর ভরসা খুঁজছে বিশ্ব । হার্ড কথার অর্থ হল জনগোষ্ঠী। আর ইমিউনিটি হল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। সমাজের বেশির ভাগ মানুষের শরীরে যখন কোনও বিশেষ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়, হয় টিকা নিয়ে, নয়তো জীবাণু সংক্রমণের মাধ্যমে, আর তার সুবিধে পেতে শুরু করেন বাকিরাও, তাকেই বলে হার্ড ইমিউনিটি। করোনার বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে কি হবে না। করোনার টিকা এখনও নেই। কাজেই হার্ড ইমিউনিটি হতে হলে, তাকে আসতে হবে সংক্রমণের পথ ধরেই। সেটা কি ঠিক না ঠিক নয়, সেই প্রসঙ্গে এখন দ্বিধাবিভক্ত চিকিৎসক সমাজ। তবে ঢিলেঢালা সাধারণ ছুটি এবং সেই ছুটি প্রত্যাহারের পর অর্থনৈতিক সব কর্মকান্ড চালু করায় এখন সংক্রমণ উর্ধ্বমুখী রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সেই প্রেক্ষাপটে জনসংখ্যা এবং সংক্রমণের হার বিবেচনা করে দেশকে রেড, ইয়োলো এবং গ্রিন জোনে ভাগ করার প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই সম্মতি দিয়েছেন। বাংলাদেশের যেসব এলাকায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার বেশি, সেসব এলাকাকে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করে লকডাউন করা হবে। লকডাউন চলাকালে ওই এলাকায় সাধারণ ছুটি থাকবে।

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সবাইকে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, মুখে মাস্ক পরা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানিয়েছে। কেউ কেউ হ্যান্ড গ্লাভস ও মাস্ক পরলেও অনেকে দু’টির কোনোটিই পরেননি। তবুও বাজারে মোটেও মানা হচ্ছে না শারীরিক দূরত্ব। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে বিপদ আরও বাড়তে পারে। আমাদের অপ্রয়োজনীয় চলাচল, ঘোরাঘুরি বন্ধ করতে হবে। নিজেকে নিরাপদে রাখতে না পারলে এর মাধ্যমে প্রচুর মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে, অনেকের মৃত্যু ঘটবে। বাংলাদেশে সংক্রমণের হার যে উর্ধ্বমুখী, কবে তা কমতে শুরু করতে পারে-এ ব্যাপারে বিশ্লেষকরা এবং কর্তৃপক্ষ এখনই কোন ধারণা দিতে পারছেন না। এদিকে সরকারের একাধিক নীতি নির্ধারক বলেছেন, দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হতে পারে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তারা পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছেন। এখন পৃথিবীতে ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত আসলে এটা কোন দিকে মোড় নেবে, তা’ বলা কঠিন। তাই, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের সবাইকে সার্বক্ষণিক বিধাতার কাছে প্রার্থনা করতে হবে যেন দ্রুত বাজারে প্রতিষেধক এসে যায়।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনুকূলে নিয়মিত অর্থ বরাদ্দের পরও করোনা ভাইরাসের যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বর্তমান বাজেটে যা’ করোনাকালীন যে কোন জরুরি পরিস্থিতিতে খরচ করা যাবে। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেছেন যে, অবশ্যই স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ওপেন সিক্রেট এবং এখন যে বরাদ্দ হচ্ছে, সেই বরাদ্দেরই একটি বড় অংশ জনগণের কোন কাজে লাগে না। বরং দুর্নীতির কারণে নষ্ট হয়। আর এ কারণেই স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের থেকে দুর্নীতি কমানোটাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি মনে করেন। এখন স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ হচ্ছে, সেই বরাদ্দগুলোতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, তদারকি দরকার এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত দরকার যাতে যে টাকাটা বরাদ্দ হচ্ছে সেই টাকাটা যেন ঠিকভাবে ব্যয় হয়, দুর্নীতি যেন না হয়। যদি এই দুর্নীতির ছিদ্র থাকে তাহলে যত বরাদ্দই হোক না কেন, তাতে কোন লাভ হবে না। দুর্নীতি বন্ধ না করে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়িয়ে লাভ নেই।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে দূর্নীতি বোধহয় করোনার চেয়েও অধিক শক্তিশালী। প্রধানমন্ত্রীর বার বার কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণের পরও করোনা সংকটকালে লকডাউন পরিস্থতিতে দেশের হঠাৎ কর্মহীন নিরুপায় অসহায় মানুষের জন্য সরকার যে খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সেই কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে বহু জায়গাতেই প্রকৃত খাদ্য সহায়তা প্রার্থীদের তালিকা প্রণয়ন ও খাদ্য বিতরণে সমন্বয়হীনতা-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি-করা হয়েছে। ওএমএসের চাল কালোবাজারে বিক্রি, ত্রাণের চাল আত্মসাৎ ও চুরি, মজুদদারির ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ দুর্নীতিবাজ, চোর, আত্মসাৎকারী, কালোবাজারি, মজুদদারদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এত দুর্নীতি যে দেশে হয় সেখানের স্বাস্থ্যখাত এর থেকে ভালো কীভাবে হতে পারে। তবে যদি আরো ভালো করতে হয়, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন করে ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। যেরকম ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল স্বাধীনতা বিরোধীদের বা রাজাকারদের জন্য। উপলব্ধি করছি, দেশের উন্নয়নের প্রধান প্রতিবন্ধকতা দুর্নীতি। আমাদের সমাজকেও পরিবেশ, সংস্কৃতি, মেধা ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হতে হবে এবং প্রাচীন প্রথা ও পরিকাঠামোগুলির পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন পথের অনুগামী হওয়ার প্রাসঙ্গিকতা অনুভব করতে হবে।
অতীতে ও বর্তমানে প্রশাসনিক এবং সরকারি পরিষেবার ব্যবস্থায় দুর্নীতি হয়েছে ব্যাপক। তাই, দুর্নীতির সম্ভাব্য সমস্ত পথ বন্ধ করে দিতে হবে। সরকারি পরিষেবা ব্যবস্থাকে সহজ সরল করে তোলা, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ ও ব্যবহার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা তাই বিশেষভাবে প্রয়োজন। উন্নয়নের সুফল পেতে হলে সর্বাগ্রে দুর্নীতি দূর করে বাংলাদেশকে শক্তিশালী ভিতের উপর দাঁড় করাতে হবে। আমরা অনেক কিছু জানি, তবে সেটা কতটা গভীরতর আকার ধারণ করেছে, সেটা কিন্তু বাইরে থেকে হয়তো সেভাবে উপলব্ধি হয়নি। দেখতে দেখতে জটিল সমস্যা বিশাল আকার ধারণ করেছে। প্রকৃত তথ্যের আলোকে এখন সত্যকে আবিষ্কার করতে হবে। অতএব, সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষদেরকে চিহ্নিত করে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে আমাদের জাতীয় জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ও সংস্কার করবেন – দেশ ও জাতি সেই প্রত্যাশা করে।

লেখক: সার্ক স্কলার, প্রশিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক, খ্যাতিমান গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ, প্রবীণ সাংবাদিক এবং
সাবেক ডাইরেক্টর (জপ্রদ), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ