| |

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার বর্তমান অবস্থা-সিস্টার মিতা রোজারিও

উন্নত জীবন ও সমাজ গঠনের প্রধান হাতিয়ার হলো শিক্ষা। শিক্ষা ব্যক্তির সহজাত ক্ষমতা, গুণাবলী ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটিয়ে ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ জীবনের অধিকারী করে তোলে। Education is the backbone of a Nation” শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতির চরম শিখড়ে পৌঁছাতে পারে না। একমাত্র শিক্ষাই পারে জাতি তথা মানবসত্ত্বার পূর্ণ ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটিয়ে মানুষকে স্ব-স্থানে সু-প্রতিষ্ঠিত করতে। তাই শিক্ষাকে জাতির মেরুদন্ডের সাথে তুলনা করা হয়েছে। মেরুদন্ডহীন জাতী কখনই মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারে না। সেজন্য উন্নত জাতি হিসেবে পরিচিতি পেতে হলে সকলকে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য বুঝতে হবে এবং সকল স্তরে শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে শিক্ষার আলো প্রতিটি মানুষের ঘরে পৌঁছতে পারে। শিক্ষার আদর্শে মানবজাতি যেন ফিরে পায় পরম জ্ঞানের আঁধার অর্থাৎ মানুষ যেন শিক্ষা লাভে আরো তৎপর হয়ে উঠতে পারে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষ যেন এর মাহাত্ব অনুধাবন করতে পারে। বর্তমান বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুগোপযোগি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে সব সময় দৃষ্টি রাখতে হবে। মানবজীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। ইংরেজী curriculum শব্দটির বাংলা পরিভাষা করা হয়েছে শিক্ষাক্রম। কারিকুলাম শব্দটি ল্যাটিন শব্দ curriculum হতে উদ্ভূত যার অর্থ দৌঁড়ানো বা ঘোড়াদৌঁড়ের নির্দিষ্ট পথ। আভিধানিক অর্থে শিক্ষাক্রম হলো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার একটি শিক্ষাকার্যক্রম। শিক্ষার বিভিন্ন দিক রয়েছে, তবে শিক্ষা বিজ্ঞান হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। ১৯৩০ সালের আগেও শিক্ষার কোন বিষয়ে গবেষণার তেমন কোন শক্তিশালী তথ্য প্রমাণ ছিলনা। কিন্তু শিক্ষা প্রসারের সাথে সাথে পঁৎৎরপঁষঁস বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়।
শিক্ষাক্রম হচ্ছে সমগ্র শিক্ষা কার্যক্রমের রূপরেখা। এটিকে বলা হয় শিক্ষা ব্যবস্থার হৃৎপিন্ড বা কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষার মাধ্যমেই একটি জাতি বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করতে এগিয়ে যায়, আবার জ্ঞানের প্রসার ঘটায়। শিক্ষার মাধ্যমেই একজন শিক্ষার্থী পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে উঠে এবং ফলশ্রুতিতে শিক্ষার বাস্তবতা উপলব্দি করতে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে গমন করে। শিক্ষার ক্রমশঃ ধারণা একজন ব্যক্তির বুদ্ধি বৃত্তির বর্হিঃপ্রকাশ ঘটায় এবং ব্যক্তির সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ সাধন করে মনঃস্তাত্বিক পরিচয় তুলে ধরে। শিক্ষার প্রতিটি স্তরের জন্য শিক্ষাক্রম থাকে। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষা লাভসহ দক্ষতা অর্জন করতে পারে, এমনকি আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতির বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে আরো উন্নত দক্ষতা সম্পন্ন শিক্ষাও লাভ করতে পারে।
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে শিক্ষার বর্তমান বাস্তবতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, অনেক ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষার্থী তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী শিক্ষা পায় না, তখন তারা কষ্ট পায় এবং হতাশাগ্রস্ত হয়ে শিক্ষা ছেড়ে দেয়। এভাবে দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা জীবন থেকে ঝড়ে পড়ে। গত ২৪ মে ২০১৯ খ্রি. তারিখে বিবিসি বাংলা নিউজে প্রকাশিত তথ্য মোতাবেক জানা যায় প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাব শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে গিয়ে ৪১% মেয়ে শিক্ষার্থী ও ৩৩% ছেলে শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন থেকে ঝড়ে পড়ে। এ তথ্য তারা সেভ দ্যা চিলড্রেন সংস্থার জরীপ থেকে নিয়েছিল। এত বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝড়ে পড়া হার রোধকল্পে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। উক্ত প্রতিবেদনে দেখা যায় প্রাথমিক পর্যায়ের ৬৫% শিক্ষার্থীই ভাল করে বাংলা পড়তে পারেনা, ইংরেজী রিডিং পড়ার বিষয়টি না হয় আপতত বাদই দিলাম। তবে শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ার নানান কারণ রয়েছে। এবিষয়ে লেখক-গবেষক ও শিক্ষানুরাগী জনাব অরন্য ই. চিরানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন“ বিভিন্ন কারণে মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলে মেয়েরা ঝড়ে পড়ে তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো- পরিবারের অস্বচ্ছলতা, বাল্য বিবাহ দেওয়া, মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে ইভটিজিং এর শিকার হওয়া, শিক্ষা গ্রহণ করে চাকরি না পাওয়া, শিক্ষার্থী উপযোগি কারিকুলাম না থাকা, অনেক বিদ্যালয়ে আনন্দদায়ক সহপাঠ শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যবস্থা না থাকা ইত্যাদি।” এবিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমানেন বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতি শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে। এ পরিস্থিতি দেশের সর্বত্র একটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু বন্ধ, তা সত্ত্বেও শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন ও ক্রমান্বয়ে সঠিক রূপরেখা ধরে রাখতেই শিক্ষকগণ বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশ মেনে শিক্ষার মান উন্নয়নের স্বার্থে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে,; অনলাইন ক্লাশ, অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া, শিক্ষার্থীদের সামাজিক মাধ্যমে সংযুক্ত রাখা এবং মোবাইল ফোনে খোঁজখবর নেওয়া ইত্যাদি। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ধরণের কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। তথাপিও শিক্ষা প্রসারে ও বর্তমান সমস্যা সমাধানে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। মাঠ পর্যায়ে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগী কাছ থেকে পাওয়া পরামর্শগুলি আমার এ প্রবন্ধে আপনাদের সাথে সহভাগিতা করছি, তাহলো- দুর্বল ছাত্র-ছাত্রী চিহ্নিতকরণ ও বাড়তি সময় দান, ঝড়ে পড়া ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করে পুনরায় বিদ্যালয়ে আনয়নের ব্যবস্থা করা, নিয়মিত অভিভাবকদের সাথে সাক্ষাৎ করা, শিক্ষার্থীর পরিবার পরিদর্শন করা, ¯েœহ-কোমল স্বরে কথা বলা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা, সব সময় পাঠ পরিকল্পনা মাফিক পাঠদান করা, শ্রেনিকক্ষে রিডিং পড়তে দেওয়া, নিয়মিত পড়া আদায় ও পরীক্ষা নেওয়া, বার বার পড়ার বিষয়বস্তু বুঝিয়ে দেওয়া, সময়ের সৎব্যবহার ও সঠিক সময়ে শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ইংরেজী ভাষা শিক্ষায় কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা ইত্যাদি। মাঠ জরীপ থেকে প্রাপ্ত এ সুপারিশগুলি সকল বিদ্যালয়ে বাস্তবায়ন করলে হয়ত অচিরেই শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে বলে আমার বিশ্বাস।
পরিশেষে, বলা যায় যে, Skill is power’’ দক্ষতাই হল উন্নয়নের শক্তি। পৃথিবীতে যে জাতি যত বেশি দক্ষ, সে জাতি তত বেশি উন্নত। দক্ষতা জীবনের ক্ষেত্র তৈরি করে। ব্যক্তি সর্বোপরি শিক্ষিত জাতিতে পরিণত হয়। শিক্ষা ছাড়া গতি নাই আবার শিক্ষা ছাড়া মানব জীবন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ-মহামারী গ্রাম ও শহর উভয় পর্যায়ে শিক্ষার বিস্তারে ব্যাঘাট সৃষ্টি করে। তাই সেই সংকটকালীন মুহুর্তে শিক্ষাকে কিভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় তার জন্য দরকার গবেষণা। তাহলেই হয়তো একদিন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক দুর এগিয়ে যাবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য মানসম্মত উৎপাদনমূখী হয়ে উঠবে।
লেখক: প্রধান শিক্ষক, নলুয়াকুড়ি কুমারী মারিয়া নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ভালুকা, ময়মনসিংহ।