| |

মৌ চাষ করে দেশ বিদেশে মধু রপ্তানী করছেন ভালুকার শওকত হায়ত খান

শেখ আজমল হুদা মাদানী : ভালুকা উপজেলার কাচিনা গ্রামের মহর আলী খানের পুত্র শওকত হায়ত খান মৌ চাষ করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে মধু রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করছেন। তিনি ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ ও সাতক্ষিরা জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমান পদ্ধতিতে মৌচাষ কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। টাঙ্গাইল জেলার বাসাইল উপজেলার মিয়াবাড়ী গ্রামে সরিষা ক্ষেতের পাশে ২৫০ টি মৌমাছির বাক্স স্থাপন করে মধু চাষ করে এ বছর প্রচুর মধু পেয়েছেন। ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলাধীন কাচিনা বাজারে মেসার্স খান মৌ প্রতিপালন প্রকল্প নামে রপ্তানি মুখী মান সম্মত প্রাকৃতিক মধুর গোডাউন রয়েছে।
মৌচাষী শওকত হায়ত খান জানান ১৯৯৫ সালে তৎকালীর বেসরকারী সংস্থা প্রশিকা থেকে কেনাডিয়ান এপিস মেলিফেরা জাতের মৌমাছি সংগ্রহ করে তিনি ভ্রাম্যমান পদ্ধতিতে মৌসুমী ফুলের সাহায্যে মৌচাষ শুরু করেন। আস্তে আস্তে মৌচাষে সফলতা আসতে শুরু করে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় ৮৫০ টি বাক্সে ১৮ জন শ্রমিকের মাধ্যমে মৌমাছি পালনের মাধ্যমে তিনি মৌচাষ করে মধু উৎপাদন করছেন। সরিষা, লিচু, ধনিয়া ফুলের আবাদী এলাকায় বাক্স স্থাপন করে মধু উৎপাদন করছেন। প্রতি কেজি মধু বিক্রি আসে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। তিনি জানান এলাকায় মৌমাছি থাকলে বিভিন্ন ফসলের পরাগায়ন ও ১৫% কীটনাশক সুবিধা পাওয়া যায়।
এ পর্যন্ত তিনি ২৫ টন মধু উৎপাদন করেছেন। তার উৎপাদিত মধু ভারত, জাপান, ইতালি, কানাডা সহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হয়ে থাকে। আমাদের দেশে রবিশস্য, গাছপালা ও ফুল-ফলে মৌচাষ করা হয়। কিন্তু মধু উৎপাদনের সময়কাল হিসেবে নভেম্বর-জানুয়ারী (সরিষা ফুলের মধু), ফেব্র“য়ারি (রাইসরিষা, কলাই, ধনিয়া, কালজিরা), মার্চ (লিচু), এপ্রিল-মে (খলিসা, গড়ান, কেওড়া, বাইন ফুল বা সুন্দরবনের ফুলের মধু) উৎপাদন করা হয়। অর্থাৎ নভেম্বর থেকে মে-এই ৭ মাসকে মোটামুটি মৌচাষের মাধ্যমে মধু উৎপাদনের আদর্শ সময় ধরা হয়। তবে কোন কোন সময় সেপ্টেম্বর মাসে বড়ই ফুল থেকে মধু পাওয়া যায়। তিনি জানান সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তার মৌচাষ প্রকল্প আরও উৎপাদনমুখী করে মধুর চাহিদা পূরন করতে পারবেন।
বিটিভির মাটি ও মানুষের অনুষ্ঠানের উপস্থাপক দেওয়ান সিরাজ, বাংলাদেশ মৌ চাষী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. এবাদুল্যাহ আফজাল, সিডষ্টোর বাজার শাখার এক্রিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপক খলিলুর রহমান, মেসার্স খান মৌ প্রতিপালন প্রকল্পের অর্থসচিব দেলুয়ার হোসেন (দুলু), মেসার্স খান মৌ প্রতিপালন প্রকল্পের মাননিয়ন্ত্রক ররুল আমীন ও জহির উদ্দিন আহাম্মেদ (জয়) এ প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন।
মধু মৌমাছির তৈরী এক প্রকার উপাদেয় খাদ্য। শ্রমিক মৌমাছিরা ফুলের মিষ্টি রস শুষে নেয় এবং তা জমা করে পাকস্থলীর উপরে এক বিশেষ অঙ্গে রাখে যাকে মধুথলি বলে। ফুলের মিষ্টি রস মধুথলিতে জমা করার সময় এর সঙ্গে লালা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন উৎসেচক মেশায়। এর ফলে মিষ্টি রস পরিবর্তিত হয়ে আংশিক মধু তৈরী হয়, যা চাকে এনে ঢেলে দেয় মধু রাখার খোপগুলোতে। তরুণ শ্রমিক মৌমাছিরা এ সময় ছুটে এসে ঐ মধু আবার মুখে ভরে এবং তাদের লালার সংগে মিশিয়ে তৈরী করে আসল মধু এবং তা জমা করে খোপে। শ্রমিক মৌমাছিরা জোরে ডানা নেড়ে খোপে রক্ষিত মধু থেকে বাড়তি পানি সরিয়ে দেয়। ফলে এক সময় ফুলের মিষ্টি রস হয়ে যায় ঘন মধু, যা জমা রাখে নিজেদের ও বাচ্চাদের খাবার হিসাবে। মধু জমা রাখার পর খোপগুলোর মুখ মোম দিয়ে বন্ধ করে দেয়। শ্রমিক মৌমাছির পেটের তলায় পকেটের মত ভাজ থাকে মোম গ্রন্থি। সেখানে তৈরী হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র্র পাতের মত মোম কণা। এ মোম দিয়ে শ্রমিকেরা বানায় বাসা। বাক্সবন্দীর প্রথম ৩/৪ দিন কৃত্রিম খাবার যথা চিনির ঘন সরবত বা সিরাপ দেবার প্রয়োজন হয়। এরপর মৌমাছিরা নিজেদের খাবার নিজেরা সংগ্রহ করে থাকে। কখনো কখনো পরিবেশে খাবার ঘাটতি পড়লে ও কৃত্রিম খাবার দেওয়ার প্রয়োজন হয়।