| |

ভূঞাপুরে মাগনা খাম্বায় রমরমা বিদ্যুৎ বাণিজ্য!

এ কিউ রাসেল: বিদুৎ বিভ্রাট নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কষ্টের স্মৃতি খুব বেশি দিনের পুরাতন নয়। এইতো সে দিন ঘনঘন লোডশেডিং আর ঘন্টার পর ঘন্টা বিদুৎ বিচ্ছিন্ন থেকে গ্রাহকগণ কথার ছলে বলতেন ‘বিদুৎ যায় না, মাঝে মাঝে আসে’। তবে গত কয়েক বছর ধরে অতীতের সেই ভোগান্তি আর নেই। বিদুৎ নিয়ে জনগণের ভোগান্তি আর কষ্ট অনেকটাই লাঘব করতে পরেছেন বর্তমান সরকার। কিন্তু চাঁদের কলঙ্কের মতোই এই সাফল্যের মাঝে কাল দাগ হয়ে রয়েছে দুর্নীতি।
সবকিছুর সাথে পেড়ে উঠলেও এই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরাটা যেন অদৃশ্য হাতে বন্দি। যে নড়বড়ে খাম্বায় বহুল আলোচিত হাওয়া ভবনের মতো শক্ত ভবনের ভীত দুর্বল হয়ে গিয়েছিল সেই খাম্বার ভুতগুলিই যেন আবার ফিরে এসেছে নতুন করে। আর এই ফিরে আসা খাম্বা ভুতে সরকারের অভূত সাফল্যে লেপন করছে কালিমার কাল দাগ। এক শ্রেণীর অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণকৃত খাম্বা, তার, মিটার ও টান্সফরমার থেকে মোটা অংকের অর্থ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রের আওতায় বিনামূল্যে বরাদ্দকৃত খাম্বা থেকে গ্রাহকদের কাছ থেকে তারা হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় কোটি টাকা! করেছে মাগনা খাম্বায় রমরমা বানিজ্য! রাঘব বোয়ালদের বাণিজ্যের রশি টানা-টানির খেসারতে বন্ধ রয়েছে প্রকল্পের মালামাল সরবারহের কাজ। এ কারণে বর্তমান সরকারের সাফল্যের সুফলে অংশীদার হওয়ার স্বপ্নটা অধরাই থেকে যাচ্ছে আলো বঞ্চিত হাজারো সাধারণ জনগণের।
এই সকল অনয়িমের প্রতিবাদে গত ২৬জানুয়ারী টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতারিত গ্রাহকগণ। সংবাদ সম্মেলন ও সরেজমিনে যানা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে জাইকার অনুমোদিত প্রকল্প সেন্ট্রাল জোন পাওয়ার ডিষ্ট্রিবিউশন প্রজেক্ট ঘরে ঘরে বিদুৎ পৌঁছে দেয়ার লক্ষে কাজ শুরু করে।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রর আওতায় কার্যাদেশ প্রাপ্ত হয় জেড, এফ এন্টারপ্রাইজ নামক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। তবে জেড, এফ এন্টারপ্রাইজ নিজে কাজ না করে তা বিউবো’র টাঙ্গাইল শ্রমিক লীগের সভাপতি আব্দুল লতিফের স্ত্রীর মালিকানাধীন শামীম এন্টারপ্রাইজ নামক অন্য আরেকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে সার্বিক দায়-দ্বায়িত্ব দিয়ে সাব কন্ট্রাক্টর হিসেবে দ্বায়িত্ব অর্পণ করেন।
এদিকে শামীম এন্টারপ্রাইজ উক্ত কাজটি পেয়ে এবং তা থেকে অধিক মোনাফা হাতিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহল ও ভূঞাপুর বিদুৎ অফিসের বেশকিছু দালালকে তার সাথে অংশীদার করে। এ কাজে প্রভাব বিস্তার করে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল। ঠিকাদার চক্র, স্থানীয় রাজনৈতিক মহল ও বিদুৎ অফিসের কতিপয় অসাধু ব্যক্তি একাত্ব হয়ে শুরু করে খাম্বা বাণিজ্য।
তারা ভূঞাপুর উপজেলার নলুয়া থেকে ৪লাখ টাকা, সিরাজকান্দী থেকে ৬লাখ টাকা, পূর্ণবাসন ২লাখ সার পলশিয়া ৪লাখ টাকা, মাটিকাটা থেকে ২লাখ টাকা, পাথাইলকান্দী থেকে একলাখ ৫০ হাজার টাকা, চরপাড়া ফলদা থেকে ৬লাখ অর্জুনা-চুকাইনগর থেকে ১২লাখ টাকা টেপিবাড়ি থেকে ৬লাখ টাকা, রায়ের বাশালিয়া থেকে ৮লাখ টাকা, চরঅলোয়া থেকে ২লাখ টাকা, বরকতপুর থেকে ৬লাখ টাকা, ভারই থেকে ৮লাখ টাকা, তারাই থেকে ১০লাখ টাকা, নিকলা জনমপাড়া থেকে ৫লাখ টাকা, আগতৈল্লাহ থেকে ১২লাখ টাকা, গোবিন্দাসী থেকে ২লাখ টাকা, ঘাটাইল উপজেলার চর বীরসিংহ থেকে ৬লাখ টাকা, ও গোপালপুর উপজেলার সানেক বয়রা-ফুলবাড়ি-ভালবাড়ি ১৮লাখ টাকা, বলমহাটা- বরশিলা থেকে ১২লাখ টাকা নেয়ার অভিযোগ করেছেন ওই এলাকার প্রতারিত গ্রাহকগণ। খাম্বা, তার, ট্রান্সফরমার ও মিটার লাগিয়ে ঘরে ঘরে বিদুৎ পৌঁছে দেয়ার আশ্বাসে ওই ২৬টি গ্রাম থেকে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর বিদুৎ বিতরণ অফিসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কাজ ও জব অর্ডার মোতাবেক মালামাল সরবারহ বন্ধ থাকায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। মাঠ পর্যায় থেকে বিদ্যুৎ এর চাহিদা থাকায় অসাধু চক্র দুর্নীতি করে থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রজেক্ট অফিস এই দায় এড়াতে পারে না। এমনও হতে পারে তাদের চাহিদা মোতাবেক উৎকচ না পেয়ে মালামাল সরবারহ বন্ধ করে দিয়েছে। তিন জেলার প্রজেক্ট দেখভালের জন্য কর্মকর্তা আছেন মাত্র দু’ থেকে তিন জন। এই লোকবল দিয়ে সঠিকভাবে তদারকি সম্ভব নয়।
টাঙ্গাইল শ্রমিক লীগের সভাপতি আব্দুল লতিফের স্ত্রীর মালিকানাধীন শামীম এন্টারপ্রাইজের সাথে যোগাযোগ করা হলে আব্দুল লতিফ জানান, আমি বা আমার স্ত্রী এই ধরণের অনিয়মের সাথে জড়িত নই। আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করার জন্য এক শ্রেণির লোক মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য পরিবেশন করছে। যারা সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করছে তারাই সমস্ত খুঁটি জোর পূর্বক বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করছে। আর এ কারণেই প্রকল্প কর্মকর্তা ভূঞাপুর সাইটের মালামাল সরবারহ বন্ধ রেখেছেন।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স জেড, এফ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী খন্দকার জাহিদ মাহমুদ বলেন, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের প্রভাবে ও চাহিদা মোতাবেক কিছু স্থানে জব অর্ডার ব্যতিত খুঁটি স্থাপন হয়ে থাকতে পারে। এই প্রকল্পে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোন প্রকার টাকা নেয়া সুযোগ নেই। তা যদি হয়ে থাকে তাহলে প্রমাণ সাপেক্ষ্য যথাযত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। প্রকল্প অফিস সঠিকভাবে তদারকি না করার কারণে কাজে কিছুটা গাফিলাতি হয়ে থাকতে পারে। তারা ২৬টি জবের মধ্যে ১৩টি জব পাশ করলেও মালামাল দিয়েছে মাত্র ২-৩টির আর এ কারণেই জনগণের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এলেঙ্গা প্রজেক্ট অফিসের দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত প্রকৌশলী আবুল কালাম জানান, আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়। লোকবল কম থাকলেও অধিক শ্রম দিয়ে আমরা তার ঘাটতি পূরণ করছি। জব অর্ডার ব্যতিত কিছু স্থানে খুঁটি স্থাপন করায় মালামাল সরবারহ বন্ধ রয়েছে। এছাড়াও ওই এলাকায় গত দুই বছর ধরে বিভিন্ন ধরণের অভিযোগ থাকায় বিভাগীয় তদন্ত কাজ চলছে। তদন্ত কাজ শেষ হলে সে মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।