| |

ময়মনসিংহে বিভাগীয় পর্য়ায়ে বাল্য বিয়ে নিরোধ বিষয়ক গোল টেবিল বেঠকে ময়মনসিংহ বিভাগে বাল্য বিয়ে বন্ধে আসুন দায়িত্বশীল হই বিভাগীয় কমিশনার জিএম সালেহ উদ্দিন

মযমনসিংহ জেলা সংবাদদাতা এএইচএম মোতালেবঃ ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার জিএম সালেহ উদ্দিন বলেছেন, অনেক কিছুতেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি ইত্যাদী অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এখনও আমাদের সীমাবদ্ধতাও আছে। এর মাঝে অন্যতম একটি হলো বাল্য বিবাহ। তিনি বলেন ময়মনসিংহ বিভাগের কোনো কোনো জেলায় বাল্য বিয়ের বিষয়টি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে জামালপুর জেলায় এ সংখ্যা খুবই আতংকের বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিভাগীয় কমিশনার বলেন ইউনিসেফ ও সংশ্লিষ্ট অনান্যদের সহায়তায় বাল্য বিয়ে বন্ধে এ বিভাগে বিভিন্ন কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। কোথাও কোনো খবর পেলেই বাল্য বিয়ে বন্ধ করা হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ময়মনসিংহে বিভাগীয় পর্য়ায়ে ‘বাল্য বিয়ে নিরোধ বিষয়ক গোল টেবিল’ বৈঠকে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। ইউনিসেফের সহযোগিতায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর ও মাউশি ময়মনসিংহ অঞ্চল এ গোল টেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।
সভায় প্রধান অতিথি’র বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, কাজীদের কাজে স্বচ্ছতা আনার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন সেবা দানে সুবিধা ও দূর্নীতি রোধে ময়মনসিংহ বিভাগের সকল জেলায় কাজীদের এখন থেকে ইউনিয়ন পরিষদের ভবনে বসার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কাজীদের ১টি ভলিউম রাখারও নিদের্শ দেয়া হয়েছে। এ বিভাগে ১শটি স্কুল তালিকা করে এগুলোতে মনিটরিং এর জন্য দায়িত্ব ভাগ করা হয়েছে। বাল্য বিয়ে রোধে বিভিণœ স্কুলের শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটি এবং অভিভাবকদের নিয়ে মত বিনিময় সভা শুরু হয়েছে। তিনি বলেন কোনো মেয়ে স্কুল অনুপস্থিত থাকলে এ ব্যাপারে শিক্ষকদের খোজঁ নিতে হবে। শিশুদের সাথেও এ ব্যাপারে খোলামেলা কথা বলতে হবে। স্কুল কলেজের ম্যানেজিং কমিটিকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন মাউশি ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপ-পরিচালক হারুন অর রশিদ সরকার। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার জিএম সালেহ উদ্দিন। মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন মাউশি’র পরিচালক (প্রশিক্ষণ) প্রফেসর মোহাম্মদ শামছুল হুদা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইউনিসেফের চীফ ফিল্ড অফিসার (ঢাকা) ওমর ফারুক। বক্তব্য রাখেন এবং উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট জহিরুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শারমীন জাহান, সিনিয়র এএসপি সীমা রানী সরকার, জেলা শিক্ষাা অফিসার রফিকুল ইসলাম, ময়মমনসিঙহ সদর উপজেরা নির্বাহী কর্মকর্তা আনম, ফয়জুল হক, জেলা কাজী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জ্বাক, ইমাম সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব মাওলানা মাহমুদুল হাছান জ্বিহাদী, জেলা সমাজসেবা বিভাগের উপ-পরিচালক আমিনুল ইসলাম, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহ সাইফুল আলম পান্নু, মহিলা টি.টি কলেজের অধ্যক্ষ ফেরদৌস মানুসার বেগম, জিপি, অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন, মুক্তাগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে আফসারী, ময়মনসিংহ জিলা স্কুলর প্রধান শিক্ষক ইউনুছ ফারুকী, জেরা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক ডা. আব্দুর রউফ, ডা.পরীক্ষিত চন্দ্র পাল, স্কাউট ময়মনসিংহ জোনের সহকারী কমিশনার সত্যরঞ্জণ বর্মণ, শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা, শাইরুজ লাবিবা রাইসা প্রমুখ। ইউনিসেফ প্রতিনিধিদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন মনিরা হাসান, পুলক রাহা, মুনতাছির রহমান।
গোল টেবিল বৈঠকের উদ্দেশ্যে বলতে গিয়ে প্রফেসর মোহাম্মদ শামছুল হুদা বলেন, ‘দেশে ১৮ বছরের আগে ৬৪ ভাগ নারীর বিয়ে হয়। বিশ্বে বাল্য বিবাহের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। প্রথম স্থানে আছে নাইজার। দেশের মাঝে আবার সবচেয়ে বেশী বাল্য বিয়ে হয় ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুরে। জামালপুরে জেলায় এ হার ৮১ ভাগের ওপরে’। তিনি বলেন সরকারের ন্যাশনাল প্ল্যান অব এ্যকশন মোতাবেক ২০৪১ সালের মাঝে শিশু বিবাহ বন্ধ করা, ২০২১ সালের মাঝে ১৫ বছরের নীচে শিশু বিবাহ বন্ধ করা এবং ২০২১ সালের মাঝে ১৫-১৮ বছরের বয়সের শিশু বিয়ে তিন ভাগের এক ভাগে নামিয়ে আনার জন্য মাউশি ও ইউনিসেফ ভবিষ্যত কর্মসূচি প্রনয়নের লক্ষে এ বেঠকের আয়োজন করেছে। তিনি বলেন এখন দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে ৫৩ ভাগ মেয়ে। এদের শিক্ষা জীবনে ধরে রাখা আমাদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ।
ইউনিসেফ এর ফিল্ড অফিসার ওমর ফারুক বলেন, এ গোল টেবিলের মতামত নিয়ে পরবর্তী পরিকল্পনা প্রনয়ণ করা হবে। তিনি বলেন মার্চ মাস থেকে শেরপুর জেলায় কাজ শুরু হবে। এরপর নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ জেলায় ও কাজ শুরু হবে। তিনি বলেন শুধু দারিদ্রতা নয়, সনাতন ধারণা এবং মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতাও বাল্য বিয়ের একটা বড় কারন। এ বিষয়টিও সকলের বিবেচনায় রাখতে হবে।
জেলা পরিষদ প্রশাসক অ্যাডভোকেট জহিরুল হক খোকা বলেন, বাল্য বিয়ে সামাজিক ক্যান্সার। এর কুফল সর্ম্পকে মানুষকে জানাতে হবে। প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করতে হবে। তিনি বলেন সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রাখতে পারে মিডিয়া। মিডিয়াকে তাই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সীমা রানী সরকার বলেন, বাল্য বিয়ে বন্ধে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে সকলকেই সচেতন হতে হবে। বিশিষ্ট বুদ্বিজীবি মতীন্দ্র সরকার বলেন, সামাজিক এবং আর্থিক কারণে বাল্য বিয়ে ঘটনা ঘটে। এর সমাধান ঘটলে বাল্য বিয়ে এমনিতেই কমে যাবে। জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মছিরুন নেছা মেয়েদের জন্ম নিবন্ধণ সঠিক ভাবে করার জোর দেন। তিনি বলেন বাল্য বিয়ে বন্ধে তারা জেলার বিভিণœ কাজী, পুরোহিত ও অন্যান্য ধর্মীয় ব্যক্তিদের নামের তালিকা ঢাকায় পাঠিয়েছেন। এছাড়া এ বিষয়ে তারা সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষনও দিচ্ছেন। ইউনিসেফ কর্মকর্তা মনিরা হাসান বলেন, শিক্ষকদের সচেতন করার পাশাপাশি তারা এখন শিশুদেরও এ বিষয়ে সচেতন করে তোলছেন। কাজী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জ্বাক বলেন, ভালুকা এবং ঈশ্বরগঞ্জে ২ জন কাজীকে ১৫ দিন করে কারদন্ড দেয়ার পর ঐ দুই উপজেলায় এখন বাল্য বিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি আইনেরও কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। ইমাম সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব মাওলানা মাহমুদুল হাছান জ্বিহাদী বলেন মসজিদে তারা এ বিষয়ে আলোচনা করতে চান। তবে এর জন্য এ বিষয়ে একটি গাইড বুক দরকার। কর্মশালায় ময়মনসিংহ জেলা সহ জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা জেলা বিভিণœ এনজিও, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিক, নারী সহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন।