| |

শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন মে দিবস -শ্যামল চৌধুরী

মানব সভ্যতার প্রতিটি স্তরে আছে শ্রমিকের শ্রমের অবদান। মানুষের সমস্ত সম্পদ এবং মানব সভ্যতার বুনিয়াদ রচনা করেছে যে শক্তি তার নাম শ্রম। শ্রম শব্দের আক্ষরিক অর্থ মেহনত বা দৈহিক খাটুনি। এ প্রসঙ্গে লেখক ম্যাক্সিম গোর্কি বলেছেন, শ্রম ও সৃজনের বীরত্বের চেয়ে গরীয়ান আর কিছু দুনিয়ায় নেই। কবি নজরুলের ভাষায় শ্রম-কিনঙ্ক কঠিন যা নির্দয় মুঠি তলে ত্রস্তা ধরনী নজরানা দেয় ডালি ভরে ফুলে ফলে। তাই মানুষের সকল প্রকার শ্রমের মর্যাদা দেয়া উচিৎ। মানব জীবনের যে উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে, সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে তাতে শ্রমিকের শ্রমের গুরুত্ব অপরিসীম। শ্রমিক শ্রম দেয় বলেই সভ্যতার চাকা ঘুরে। শ্রম মানুষের কায়িক ক্ষমতা যা উৎপাদনে ব্যয় করা হয়। শ্রমশক্তি এক প্রকার পণ্য। এ পণ্য বিক্রি করার ব্যক্তি যেমন সমাজে আছে। ক্রয় করার ব্যক্তিও সমাজে বিদ্যমান। যারা শ্রমশক্তি বিক্রি করে তারা শ্রমিক। আর যারা শ্রম শক্তি ক্রয় করে তারা মালিক। শ্রমের বিনিময়ে শ্রমিক মজুরি লাভ করে। পুঁজি বিনিয়োগকারী মালিক ও শ্রমিকের উদ্ভব ঘটে আজ থেকে ছয় শত বছর আগে। প্রায় দুশ বছর পূর্বে ইউরোপে কল-কারখানার প্রসার ঘটে। এসময়ে অধিক শ্রম অধিক মুনাফা এভাবে শ্রমিকদের ১৭-১৮ ঘন্টা শ্রম দিতে বাধ্য করা হতো। কারখানায় শ্রমিকদের ক্লান্ত দেহ যাতে টলে না যায় তার জন্য কাজের গোড়ায় তাদেরকে শেকল বন্দি করা হতো। তখন থেকেই এমন অমানুষিক বর্বর অবস্থা থেকে পরিত্রাণ খুঁজতে থাকে শ্রমিক শ্রেণি। এমনি পরিস্থিতিতে লুভ নামে একজন শ্রমিক ত্রাতারূপী নেতার আবির্ভাব ঘটে। কারখানা উদ্ভবের পূর্বে কৃষক জীবনই শ্রেয় ছিল। এমনটিই ছিল শ্রমিকদের আক্ষেপ। কারখানায় যেন তাদের জীবনে কাল হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, শোষণ শৃংখল একদিন খসে পড়বেই। লুভের নেতৃত্বে ১৭৬০ সালে শুরু হয় মেশিন ভাঙার আন্দোলন। ইতিহাসে যা লুভাইড মুভমেন্ট নামে পরিচিত। এখান থেকেই শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে চেতনার বীজ রূপিত হয়। ১৭৯১ সালে ফ্রান্সে ধর্মঘট নিষিদ্ধ করে আইন পাস হয়। প্রথম দিকে অসচেতনতার জন্য কেন ধর্মঘট, কার বিরুদ্ধে ধর্মঘট, এর লক্ষ্য কী এ সম্পর্কে শ্রমিকরা খুব সচেতন ছিল না। নির্বিচারে তাদেরকে দিয়ে ১৮-২০ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করানো হতো। ১৮২০ সাল থেকে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত ১০ ঘন্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট আন্দোলন শুরু হয়। ১৮৬২-৬৩ সালে গড়ে উঠে ট্রেড ইউনিয়ন। ১৮৮১ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার। ১৮৮৪ সালের ৭ই অক্টোবর চতুর্থ সম্মেলনে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হয় যে, ১৮৮৬ সালের ১লা মে থেকে ৮ ঘন্টাকেই কাজের দিন বলে গণ্য করতে হবে। চারদিকেই ছড়িয়ে পড়ে শ্রমিকদের আট ঘন্টার আন্দোলন। শ্রমিকদের আটঘন্টার আন্দোলন বিভিন্ন কল-কারখানায় যেমন: জুতো কারখানায় আটঘন্টার দাবি আদায়ে নাম হয়েছে আটঘন্টা জুতো। এমনিভাবে আটঘন্টা চুরুট ইত্যাদি। ১৮৮৬ সালের প্রথম থেকেই শিকাগো শহরে শ্রমিকগণ আটঘন্টা সমিতি গঠন করে আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে দাবি আদায়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ থেকে ১২৩ বছর পূর্বে ১৮৮৬ সালের মে মাসে আটঘন্টা শ্রম, আটঘন্টা বিশ্রাম ও আটঘন্টা সামাজিক ও পারিবারিক কাজের দাবিতে হাজার হাজার শ্রমিকের আন্দোলনের মুখে আমেরিকার শিকাগো শহরে হে মার্কেটে নির্যাতিত শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে মালিকদের বর্বরোচিত আক্রমণ এবং তৎকালীন সরকারের পুলিশ বাহিনীর নির্বিচার গুলি বর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে মহান মে দিবসের সূচনা ঘটে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, জেল-জুলুম উপেক্ষা করে সংগ্রামী ঐক্যের অধিকার আদায়ের রক্ত¯œাত ফসল মহান মে দিবস। শ্রমিক আন্দোলনের এক স্মরণীয় উপাখ্যান এ দিন। মে দিবস আজ লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের আরাধনার ধন ও পরম পাওয়া। শোষকের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে দৃপ্ত পদে এগিয়ে গিয়ে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন মহান মে দিবস। জন্মলগ্ন থেকেই শ্রমিক শ্রেণির ইতিহাস আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। শ্রমিকের এ রক্ত বৃথা যায়নি। রক্তে অঙ্কিত হয়েছে অধিকার আদায়ের রক্তিম আলপনা। তাবৎ দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণির জাগরণের, ঐক্যের, প্রেরণার ও গর্জে উঠার দিন মহান মে দিবস। পুঁজিবাদী দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্তির দৃঢ় অঙ্গীকার মহান মে দিবস। পৃথিবীর দেশে দেশে মে দিবস আসে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আশা জাগানিয়া সুর লয়ে। মহান মে দিবস শোষক তথা পুঁজিবাদের মহাত্রাস। সমাজতন্ত্র গড়ার দৃপ্ত শপথ। শ্রমিক ঐক্যের এক উজ্জীবন মন্ত্র। শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের তীব্র প্রতিবাদ বলিষ্ঠ প্রতিবাদী চেতনার এক মহা বিস্ফোরণ মে দিবস। রক্তের বন্যায় ভেসে যাওয়া হে মার্কেট চত্বর থেকে রক্তবীজ হয়ে জন্ম নেয় মহান মে দিবস। এ দিবসকে ঘিরে রচনা হয়েছে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠা তথা মুক্তির ইতিহাস। শোষক ও পুঁজির হিং¯্রতম কৌশলী আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বিনির্মাণ করতে হবে অনাগত ভবিষ্যতের এক সুখী সমৃদ্ধ সমাজ। মহান মে দিবস উপলক্ষ্যে এমনটিই হোক সকলের দৃঢ় অঙ্গীকার।