| |

হৃদয়ে বাংলাদেশ

সাইফুজ্জামান : মনটা বিষণœ হয়ে যায় চারপাশে তাকালে। চোখের সামনে রাতারাতি হারিয়ে গেল সুন্দর। প্রতিবেশী প্রতিবেশীতে সৎভাব শৈশবে আমরা দেখেছি। মহল্লার সবগুলো পরিবার এক ছিল। আদব কায়দা, শ্রদ্ধা স্নেহ, মায়া মমতা-ভালোবাসা বিনিময়ের সমাজ ভাতৃত্ব, ঐক্য ও সহানুভূতিশীল হওয়ার শিক্ষা দিত। শিক্ষক, প্রতিবেশী, সমাজসেবক মানুষের রুচি তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। সত্যবাদিতা, ভদ্রতা, পরমতসহিষ্ণুতার পাঠ দিত সে সমাজের চেহারার পরিবর্তন হয়েছে। এখন কেউ কাউকে কেয়ার করে না। সবুজ প্রকৃতি, উদার আকাশ, পতঙ্গ, পাখি, মাছ মোহগ্রস্ততার মতো টানত। খেলার মাঠ, সহপাঠী, পাড়ার বিভিন্ন বয়সীদের সঙ্গে সঙ্গে সময় কাটাতে কত না আনন্দের তা আজকের তরুণ প্রজন্মকে বোঝানো কঠিন।
এই ঢাকাও বদলে যেতে দেখলাম দ্রুত। ঝোপঝাড় ঢাকা ‘ঢাকা’ ইমারত ও বিপণি বিতানের শহরে পরিণত হয়েছে। মফস্বল থেকে আসা মানুষ মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। বিচ্ছিন্নতা ও বিষণœতা মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করছে। আততায়ী মৃত্যু ধেয়ে আসছে। নারী-পুরুষের সম্পর্কের টানাপড়েন থেকে বাঁক বদল ঘটছে সম্পর্কের বহু মাত্রিকতার। পরকীয়া ও আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে। মানুষের মন বহুগামী। মানুষ মানুষের সঙ্গে মিলছে কিন্তু শান্তি পাচ্ছে না। একাত্তরের নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আত্মত্যাগ, জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি। এই দেশ অনেক কিছু দিয়েছে প্রতিটি নাগরিককে। সাধারণ মানুষের কর থেকে শিক্ষা, চিকিৎসা ও সেবার অর্থ ব্যয়িত হচ্ছে। এসব সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কিছুই করা হয়নি। মধ্যস্বত্বভোগীরা চেটেপুটে খেয়ে নিচ্ছে সাধারণের প্রাপ্যতাটুকু।
এক সঙ্গে কাজ করছেন যারা তাদের মধ্যে থেকে অনেকের পদোন্নতি হচ্ছে আপনারটা আটকে আছে। রহস্যের জাল ছেঁড়া কঠিন। জুনিয়ররাও আপনাকে ঢিঙিয়ে চলে যেতে পারে। একটুখানি দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিংবা অদৃষ্টবাদীদের মতো ভালো। কিছু অপেক্ষা করছে ভেবে নিজের দুঃখটা ঢাকা যায়। এটাই নিয়তি। পাওয়া না পাওয়া নিয়ে চলছে মানুষের জীবন। মানুষ আপনার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে প্রকৃতি আপনার শূন্য জায়গা পূরণ করে দিচ্ছে। পাখি, মেঘ, নদী, আকাশ, মাছ, আপনার খাওয়ার সামগ্রী জোগান দিচ্ছে যেমন তেমন মানসিক প্রশান্তি আর বেঁচে থাকার অফুরান প্রাণ শক্তির আধার। শৈশব থেকে বয়োবৃদ্ধিকাল পর্যন্ত এই দেশ আপনাকে কতভাবে পুষ্ট করেছে। শিক্ষক, প্রতিবেশী আর সাধারণ মানুষের রক্ত, ঘাম, শ্রম আপনাকে বেঁচে থাকার জন্য সব ধরনের রসদ দিয়েছে। অথচ আপনি ভুলে গেলেন দেশকে, আপনার আত্মার আত্মীয়দের।
সন্তান তার বাবার জন্মভূমি চেনে না। তার দেখা হয় না জাদুঘর, চিড়িয়াখানা, ঐতিহাসিক স্থাপনা। বাংলাদেশ তার অচেনা। ফাস্টফুড, কম্পিউটার, দম বন্ধ করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তকে শিক্ষা দিচ্ছে আত্মকেন্দ্রিক হতে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে বিদেশ। বিদেশে তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়ার মধ্যে কোনো মর্যাদাবোধ নেই এ সত্য তাকে কে শিক্ষা দেবে? তরুণ প্রজন্মের বাসযোগ্য বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারিনি আমরা।
সামাজিক সংগঠন, রাষ্ট্র, বেসরকারি সংস্থা ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষদের মধ্যে ঐক্য রচনা করা জরুরি। মানবিকতার জাগরণ ঘটাতে হবে আজ। সামান্য কারণে রাজনৈতিক মতান্তর ও প্রতিহিংসা পরায়ণতা তীব্র হয়ে উঠেছে। দূরে ঠেলে দিচ্ছে রাজনীতি ও অন্ধ স্বার্থ বুদ্ধি। আমাদের সালে জন্ম দেয়া অনেক রাষ্ট্র অগ্রসর হয়েছে, আমরা পিছিয়ে আছি।
ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান পূর্ব আর বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে যদি তাকিয়ে দেখি অনেক ফারাক। মানুষের উন্নতি, আয় ব্যয় প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার নিঃসন্দেহে অনেক হয়েছে। ষাট, সত্তর দশক আমার চোখে জ্বলজ্বলে। পিতা, চাচা, তাদের সময়ের মানুষরা রাজনীতি সচেতন যেমন ছিলেন, তেমন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে উচ্চকিত ছিলেন। চিন্তা- চেতনায় স্বচ্ছতা ও দেশপ্রেম ছিল তাদের মজ্জাগত। সরকারি দল, বিরোধী দল ছিল। আদর্শিক ভিন্নতা, মত ও পথের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কেউ কারো অমঙ্গল চাইতেন না তারা। দেশে স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের অর্জন অনেক। কিন্তু হিংগ্রতা, মানবিকতার বিপর্যয় দেখে আমরা বারবার আঁতকে উঠেছি।
ছাত্ররাজনীতির নায়করা ষাট দশকে যে অগ্নিবিশ্বাস ও জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তা ইতিহাসের গর্বিত অংশ। ছাত্র নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিরোধী নেতাদের খোঁজখবর রাখতেন সাহায্য-সহযোগিতা করতেন এটা সবার জানা। পরবর্তীতে দেখা গেল রাজনীতির শিবিরে আদর্শিক দ্বন্দ্ব, প্রভাব-প্রতিপত্তির লড়াই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখলের অশুভ প্রতিযোগিতায় মেধাবী ছাত্ররা রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়লেন। মধ্যস্তর, নিম্ন পর্যায়ের অনেকেই রাজনীতিতে আবির্ভূত হলেন। ছাত্রনেতারা টেন্ডারবাজি করে সময় কাটাতে লাগলেন। গাড়ি, বাড়ি, নারী, নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন একদল তরুণ প্রজন্ম লেখাপড়া বাদ দিয়ে রাজনীতি নির্ভর, দলকেন্দ্রিক হয়ে কলহে লিপ্ত হতে থাকল। কত মেধাবী মানুষের ‘মৃত্যু’ হলো সন্ত্রাসীদের হাতে তার হিসাব অজানা। মূলধারার রাজনীতিবিদরা ছাত্রদের নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে শুরু করলেন।
নামী কলেজ থেকে পাস করা অনেক মেধাবী ছাত্রকে আত্মঘাতী রাজনীতির বলি হতে দেখা গেছে। অশুভ ধারার রাজনীতির পাশাপশি সুস্থধারায় রাজনীতি চর্চা যে একেবারে শূন্যের কোঠায় চলে গিয়েছিল এরকম কথা বলা যায় না। আমাদের তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে ক্রিকেট, কম্পিউটারের অভূতপূর্ণ উন্নয়ন ও ব্যক্তি অর্জন অবশ্যই একটি মাইলফলক। তারপরও হতাশা আছে সৃজনশীলতা ও মানবিকতার জাগরণ বড় হয়ে দেখা যায়নি এই সময়ে। তরুণ প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে পিতামাতার স্নেহ ছায়ায়, শিক্ষকদের পরিচর্যায়। ক্ষুদ্র একক পরিবারের সদস্য এই সব ছেলেমেয়েরা মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে চায় না। ফেসবুক, কম্পিউটার গেম ও ইন্টারনেটে ফাঁদে তাদের বেশির ভাগ সময় আটকে যায়। শহরের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা, প্রতিবেশীর খোঁজখবর রাখা তাদের হয়ে ওঠে না; আত্মীয়স্বজনের সুখে-দুঃখে তারা একাত্ম হয় না। বিজ্ঞান, আধুনিকতার অগ্রযাত্রায় আমাদের তরুণদের ধীর অগ্রসর অবশ্যই চিন্তার খোরাক জোগায়।
প্রেসক্লাব, সংগঠন, অফিস দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। সবার আচরণ ঔদ্ধত্যপূর্ণ; যাবেন কোথায়? উনিশ ও বিশ শতকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম, স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন, সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বাঙালির দ্রোহ ও অর্জন ইতিহাসে অনন্য ভূমিকায় উৎকীর্ণ। ছায়ানট, বুলবুল ললিত কলা একাডেমি, উদীচী, প্রগতিশীল সামাজিক রাজনৈতিক সংগঠন গণজাগৃতিতে জোয়ার সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পর জাতীয় ঐক্য রচনা করা জরুরি ছিল। হয়নি। দলমত ও পথের পার্থক্য এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে, কেউ কারো মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকল না। ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি, সংশ্লিষ্ট ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়া একদল মানুষ আমলাতন্ত্রের মতো কাজের দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টির জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে পারল না। কর আরোপ ও সেবা প্রদানের ব্যাপ্তি প্রসারিত করার মতো স্থানে জনস্বস্তি ও সক্ষমতার বিষয়টি ভাবতে হবে।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভ্যাট আরোপ নিয়ে কিছুদিন ছাত্রছাত্রীরা সরব ছিল। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বাস্তব কারণে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থামলেও এখন চলছে শিক্ষকদের কর্মবিরতি।
দেশে উন্নয়নে করণীয় নিয়ে পরিকল্পনা ও সমন্বয় যথাযথভাবে হতেই হবে। বিরোধী দল, সরকারি দলের অংশ। সহিংসতা নয়, দেশ গঠনে প্রয়োজন সহযোগিতা। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, সমাজ, সংগঠন, রাষ্ট্র ও মানুষ অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশ গড়ার নিয়ামক শক্তি। হানাহানি, অশ্রদ্ধাবোধ, প্রভাব প্রতিপত্তি, অর্থ-বিত্ত-বৈভবের প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমরা যে তিমিরে আছি সেই তিমিরেই থেকে যাব। স্বপ্ন বেঁচে আছে। সুপ্ত কাজ করার তাগিদ জাগ্রত রয়েছে। হরতাল, অবরোধ, সহিংসতা জানমালের ক্ষতিসাধন করছে। বাংলাদেশকে আজ গড়ে তুলতে হবে। ষড়ঋতুর এই দেশে মাটি অমূল্য সম্পদ। সাধারণ বীজ থেকে শস্যদানা অঙ্কুরোদগম হয়। মেহনতি মানুষের শ্রমে মেধায় বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে আবার। প্রয়োজন আজ জাতীয় ঐক্য ও মানসিক মুক্তি।