| |

ঘাটাইল ভূমি অফিসের অনিয়ম অব্যবস্থাপনায় ভূমিহীনদের জমি-প্রভাবশালীদের দখলে

এ কিউ রাসেল : টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা ভূমি অফিসর অনিয়ম অব্যবস্থাপনায় ১৬ ভূমিহীন পরিবারের বন্দোবস্ত খাস জমি ১০ বছর যাবৎ আটকে আছে প্রভাবশালীদের দখলে। স্থানীয় চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং স্থানীয় সংসদের লিখিত আদেশ থাকলেও ভূমি অফিসের নয়-ছয়ে অন্ধকারেই রয়ে যাচ্ছে বন্দোবস্ত খাসজমি। ফলে বাড়ছে কলহ। মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে পরছে অনেকে। এতে সরকারের পূর্নবাসন কার্যক্রম কলুষিত হয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে।
জানা যায়, দেশের হত দরিদ্র, যাদের মাথা গোজার ঠাঁই নাই সরকার সারাদেশে এইসব ভূমিহীন পরিবারকে গুচ্ছগ্রাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্নবাসন করে আসছে। একই সঙ্গে জীবনমান উন্নয়নের লক্ষে ভূমিহীনদের নামে খাসজমি বরাদ্দ দিয়ে আসছে। এলক্ষে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৯৫ পরিবারকে ৭৬২.৯৫ একর খাস জমি বরাদ্দ দিয়েছেন।
বরাদ্দ দেওয়া এইসব খাস জমি এক শ্রেণির ভূমিদস্যুরা জাল দলিল তৈরি করে ভোগদখল করে আসছে। অনেকেই জাল কাগজ দেখিয়ে কোন কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রভাবশালীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। কেউ কেউ ইউনিয়ন তহশীলদারের সহযোগীতায় ওই সব খাস জমিতে পাকা ঘর-বাড়ি নিমার্ণ করে বাগান বাড়ি বানিয়েছেন। অনেকে রাজনৈতিক দলের প্রভাব খাটিয়ে জবরদখল করে আসছেন। যার ফলে প্রভাবশালীদের দখলে থাকা খাসজমি ভূমিহীনদের মাঝে বরাদ্দ দিলেও শেষে দখল নিতে বিপত্তি ঘটছে।
এভাবে সন্ধানপুর ইউনিয়নে ১৬টি ভূমিহীন পরিবারের বন্দোবস্ত খাসজমি ১০ বছর যাবৎ প্রভাবশালীদের দখলে আটকে থাকলেও কর্তৃপক্ষ নয়-ছয় করে নিচে শিকড় কেটে উপরে পানি ঢালছে।
১লা মার্চ থেকে ৩০মে পর্যন্ত ৩ মাসের অনুসন্ধানে বিভিন্ন সূত্র ভূক্তভোগী ও স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ভূমি অফিস দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অফিসের সার্ভেয়ার হযরত আলি, অফিস সহকারী হবিবুর রহমান সন্ধানপুর ইউনিয়ন তহশীলদার ফজলুল হক এলাকার সংঘবদ্ধ জালিয়াতী চক্রের সাথে আতাতকরে এক সিন্ডিকেট বাহিনী গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেট বাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছে উপজেলার ১২টি ভূমি অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তারা ভূমি মালিকদের ভিন্ন ভিন্ন কায়দায় ফাঁদ তৈরী করে কখনো আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বড় কর্মকর্তারা বড় ভাগ নিলেও তারা থাকেন সন্ন্যাসীর ভূমিকায়। এমন হাজারো অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
যে ভাবে হয়রানি করে থাকে : জান যায়, এই সিন্ডিকেট বাহিনী প্রথমে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাত করে খাস জমি দখলদারের সাথে বিনিময় করে অলিখিত গোপন চুক্তিনামা করে থাকে। পরে টাকার বিনিময়ে তদন্ত ছাড়াই ভূয়া নক্সা তৈরি করে ভূমিহীনদের জমি বন্দোবস্ত দেয়। কিছুদিন পর দখলদারদের সহযোগীতায় বন্দোবস্ত বাতিলের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে দখলদারদের দিয়ে জেলা প্রশাসকের নিকট বন্দোবস্ত বাতিল চেয়ে মিথ্যা অভিযোগ প্রেরণ করায়।
শেষে ওই আবেদনের তদন্তভার উপজেলা ভূমি অফিসে আসলে ভূমিহীনদের হয়রানি করে টাকা নিয়ে থাকে। নিরুপায় ভূমিহীন পরিবার সিন্ডিকেট বাহিনীকে টাকা দিলেও তারা দখলদারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে জমি দখলদারদের ভোগ করার ব্যবস্থা করে দেয়। এভাবে ভূমিহীনদের মাঝে জমি বন্দোবস্ত দেয়ার নাম করে, তদন্তের নাম করে, পরিমাপের নামে, নামজারি করে, দখলদারদের ভোগ করার সহযোগিতা দিয়ে প্রভাবশালীদের স্থাপনা নির্মাণের সহযোগীতা দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে অনেকেই নামে বে-নামে ১-তলা/৩-তলা একাধিক পাকা বাড়ীর মালিক হয়েছেন।
এ বিষয়ে সিন্ডিকেট বাহিনীর প্রধান সার্ভেয়ার হযরত আলীর নিকট জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিবেদককে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, ‘যত কথাই লেখেন না কেন, বড়জোড় বদলি করাতে পারবেন, এর বেশী কিছু করার ক্ষমতা আপনার নেই।’
যেভাবে অদেশ অমান্য করে : অনুসন্ধানে জানা যায়, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ভূমি অফিস ঢাকঢোল বাজিয়ে আইনের ব্যখ্যা মুখে বললেও কাজের বেলায় ফলাফল উল্টো দিকে। এরা এতোটাই বেপরোয়া টাকা ছাড়া উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের লিখিত আদেশও মানেন না।
জানা যায়, ঘাটাইলের উপজেলা নির্বাহী অফিসার আছমা আরা বেগম ২০১৫ সালের ১৯ আগষ্ট কামারচালা গ্রামের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি আলালের জমি বুঝিয়ে দিতে সার্ভেয়ার হযরত আলিকে লিখিত আদেশ দিলেও গত ১০ মাসেও সে আদেশ কার্যকর করেননি। এ বিষয়ে সার্ভেয়ার হযরত আলির নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই জমি অন্যের দখলে থাকায় বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি।’
এভাবে ২০০৮ সালে বগা মৌজার ৯১৮ দাগে ৪.৮০ একর জমি এলাকার ১২জন ভূমিহীন পরিবারে বন্দোবস্ত পায়। ওই জমির দখলদার লিয়াকত আলি মাস্টার গং সরকারি দলের প্রভাব খাটিয়ে ভূমিহীনদের বাড়ী ঘর ভেঙ্গে দিয়ে সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায় এবং ঘরে আগুন দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে মারধর করে তাড়িয়ে দেয়।
এ বিষয়ে ভূমিহীন পরিবার কর্তৃপক্ষের নিকট বার বার আবেদন করলেও কাজের কাজ না হয়ে শুধু চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে জানা যায়। এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আমানুর রহমান রানা ভূমিহীনদের পক্ষে ঘাটাইল ভূমি অফিসে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ নামা পাঠায়। তৎকালীন সহকারি কমিশরার (ভূমি) নাদিরা আক্তার সাংসদের সুপারিশনামা যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সন্ধানপুর ইউনিয়ন তহশীলদার ফজলুল হককে লিখিত আদেশ দিলেও গত ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও সে আদেশের কোন ব্যবস্থা নেননি।
এ বিষয়ে ফজলুল হকের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি খুবই জটিল এতো ঝামেলায় কে জড়ায়।’
যে ভাবে সরকারী আদেশ অমান্য করে : জান যায়, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ভূমি অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা সরকারের চাকুরী করে সরকারের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করলেও এরা নিজেরাই সরকারের আইন মানেন না। ২০১৫ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় দখলদারের হাত থেকে খাস জমি উদ্ধারের জন্য একটি আদেশ জারি করে। ওই আদেশ সারাদেশে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশানারদের কাছে পাঠানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকা খাসজমি উদ্ধার করার কথা। সে অনুযায়ী দেশের অন্যান্যস্থানে উদ্ধার অভিযান জোরদার থাকলেও ঘাটাইল ভূমি অফিস সে আদেশ ১বছরেও চালু করেন নাই। উল্টো ঘাটাইল ভূমি অফিস মন্ত্রণালয়ের আদেশ কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে খাস জমি উদ্ধারের পরিবর্তে দখলদারদের ভোগ করার রাস্তা পাকাপোক্ত করতে বন্দবস্ত বাতিলের পায়তারা করছে।
এ বিষয়ে ঘাটাইলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রভাংশু সোম মহানের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সারা বছর আমাদের উদ্ধার অভিযান অব্যাহত আছে। গত ১বছরে কত একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আপনি সঠিকভাবে তদন্ত করে আমাকে একটি লিখিত রিপোর্ট দিন। কারো ভুল থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো।’
জানা যায়, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ভূমি অফিসে আইনের প্রয়োগ না থাকায় সর্বক্ষেত্রেই চলছে অনিয়ম। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে খোড়া যুক্তি, আইনের ভূল ব্যখ্যা দিয়ে চলছে অফিসের কার্য্যক্রম। তথ্য অধিকার আইনে তথ্য দেয়ার কথা থাকলেও ভূমি অফিস কোন তথ্য দেন না। ২০১৫ সালের ১৫ এপ্রিল ফরম পূরণ করে যথা নিয়মে তথ্যের জন্য আবেদন করলেও গত ১৪মাসেও সে তথ্য দেন নাই। গত ২৮জুন ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত নামের তালিকা চাইলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রভাংশু সোমমহান প্রতিবেদককে সাফ জানিয়ে দেন অফিসের ডকুমেন্ট বাহিরে দেয়া যাবে না। ঘাটাইল উপজেলায় এ পর্যন্ত কতজন পরিবারকে খাস জমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর নিতে ৩ দিন এসিল্যান্ডের সাথে যোগাযোগ করেও নেওয়া সম্ভব হয়নি। এভাবে ভূমি অফিসের লুকচুরি খেলায় অন্ধকারেই রয়ে যাচ্ছে বন্দোবস্ত খাসজমি।