| |

টাঙ্গাইলের যমুনা কেড়ে নিচ্ছে শত শত ঘরবাড়ি ॥ পানি উন্নয়ন বোর্ড অন্ধ ভূমিকায়

বিভাস কৃষ্ণ চৌধুরী ॥ টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের ৪টি ইউনিয়নে যমুনা নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকলেও ভাঙনরোধে কোন কাজই করছে না স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। তাদের মতে প্রকল্প প্রণয়নেই আটকে রয়েছে যমুনা নদীর ভাঙন প্রতিরোধের কাজ। ভাঙন কবলিতদের অভিযোগ, অতীতের মতই জোয়ার ও মৌসুমের বন্যায় প্রতি বছর ঘরবাড়ি হারাচ্ছে শত শত মানুষ। চলতি বর্ষার শুরুতেই যমুনার করাল থাবায় আক্রান্ত ভূঞাপুর ও গোপালপুর উপজেলার নদী এলাকা। ইতোমধ্যে ভূঞাপুরের কয়েকটি গ্রাম নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও কোন তৎপরতাই দেখাচ্ছেনা পানি উন্নয়ন বোর্ড(পাউবো)। সরেজমিনে দেখা গেছে, ভয়াবহ ভাঙনে গোবিন্দাসী ইউনিয়নের খানুরবাড়ী-কষ্টাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুই কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ দুই বছর আগেই নদী গর্ভে চলে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পিকনা-জোকারচর বাঁধের কিয়দাংশ।
পুরো শুকনো মৌসুমে সারি সারি অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ক্রমশঃ পূর্ব দিকে ধাবিত হচ্ছে। যমুনার পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ভেঙে যাচ্ছে নতুন নতুন ঘরবাড়ি। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে আরো কয়েকটি গ্রাম। অব্যাহত ভাঙনে ছোট হচ্ছে ভূঞাপুর উপজেলার সীমানা।
গত কয়েকদিনে অর্জুনা ইউনিয়নের কুঠিবয়ড়া, চুকাইনগর ও অর্জুনা গ্রামসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গোবিন্দাসী ইউনিয়নের কষ্টাপাড়া, খানুরবাড়ি, ভালকুটিয়া, কোনাবাড়ি, চর চিতুলিয়াসহ বিভিন্ন গ্রাম এবং নিকরাইল ও গাবসারা ইউনিয়নের গ্রামগুলোতেও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে অব্যাহত রয়েছে অবৈধ বালু উত্তোলন ও সরবরাহ।
এছাড়া ভাঙনের মুখে রয়েছে, ভূঞাপুরের গোবিন্দাসী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি, কয়েকটি মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, মন্দির, পোল্ট্রি খামারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ইতিমধ্যে ফসলী জমিসহ কয়েক হাজার পরিবার নতুন করে গৃহহীন হওয়ার সম্ভাবনা তীব্রতর হয়েছে।
অর্জুনা গ্রামের হাবিবুর রহমান ও চুকাইনগর গ্রামের আব্দুর রশিদ বলেন, প্রাচীনকাল থেকেই যমুনা নদীর ভাঙনে বাড়িঘর হারাতে হচ্ছে। গত বছর বাড়ির জমি ভেঙে গেছে। এবছর ঘরবাড়িসহ ভেঙে নদী গর্ভে চলে গেছে। সর্বস্ব হারিয়ে এখন অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু সে বাড়িও দু-একদিনের মধ্যে ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গোবিন্দাসী, নিকরাইল, অর্জুনা ও গাবসারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা জানান, কয়েক বছরে যমুনা নদীর ভাঙনে উপজেলার ৪টি ইউনিয়নে হাজার হাজার পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে সহায় সম্বলহীন অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। ফসলী জমি হারিয়ে কৃষকরা নিঃস্ব হয়ে গেছে। নতুন করে ভাঙনের কবলে পড়েছে আরো কয়েকটি গ্রাম। বর্তমানে নদীতে পানি বাড়তে থাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। অথচ ভাঙনরোধে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহন করছে না বলেও তারা অভিযোগ করেন। তারা জনপ্রতিনিধি হয়েও কিছু করতে পারছেন না। পানি উন্নয়ন বোর্ডে যোগাযোগ করায় প্রকল্প অনুমোদন হয়ে আসা পর্যন্ত তাদেরকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। নিরূপায় হয়ে তারা নিরব দর্শক হিসেবে ভাঙন দেখে যাচ্ছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানায়, যমুনা নদী ভাঙন রোধে একাধিক প্রকল্প তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলেও সেগুলো অজ্ঞাত কারণে অনুমোদন হচ্ছে না। তাই তারাও কিছু করতে পারছেন না।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, যমুনা নদী ভাঙনরোধে উপজেলার নলীন হতে অর্জুনা পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাঁধ নির্মাণে ১৬৪ কোটি টাকার একটি প্রস্তাবণা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া ডেল্টা প্ল্যানের আওতায় আনুমানিক ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায় ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে যমুনা নদীতে বাঁধ নির্মাণ কাজের প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছে। সেটিও বর্তমানে স্টাডি পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানায় পাউবো।
ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল জানান, যমুনার ভাঙন রোধে বরাবরই পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পাউবো’র কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, তারাও প্রাক্কলন তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে। দ্রুতই ভাঙন রোধে কাজ শুরু করা যাবে। উপজেলা প্রশাসনের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাত থেকে ভাঙন কবলিতদের যৎসামান্য সাহায্য করছেন।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শাহজাহান সিরাজ বলেন, ভূঞাপুরে যমুনা নদীর ভাঙন রোধে ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রকল্প তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বড় প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় প্রকল্পগুলো ছোট ছোট আকারে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন হলেই ভাঙন রোধে কাজ শুরু করা হবে। প্রকল্পগুলো অনুমোদন করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তদারকি না থাকায় সেগুলো ফাইলেই আটকে থাকছে বলেও তিনি জানান। অনুমোদন না হলে তাদের করার কিছুই নাই বলে মন্তব্য করেন তিনি।