| |

উপমহাদেশে ইসলামের মর্মবাণী প্রচারে মহান অলী আল্লাহ হযরত খাজা শাহ শম্ভূগঞ্জী এনায়েতপুরী (রহঃ) ভুমিকা-এড. এম.এন. হাদী

ময়মনসিংহ জেলাধীন সদর উপজেলার চরকালীবাড়ী লালকুঠি দরবার শরীফের মূল ভবন “লালকুঠির নির্মাণকাল গাত্র ফলকে খুদিত দেখা যায় ১৯২২ ইং সন”। বৃটিশ ডেভিট কোম্পানী কর্তৃক নির্মিত এ দালানটি ছিল পাটের অফিস। গেস প্যাল ছিলেন এর ম্যানেজার। ঋণের দায়ে এটি তিনি মিঃ বিরেন সেনের নিকট বিক্রি করে দেন। পরে বিরেন সেনের কাছ থেকে রমেশ বাবু এ লালকুঠি কিনে নেন। রমেশ বাবুর কাছ থেকে বাড়ীটি আলোচ্য অবিসংবাদিত  মহান অলী আল্লাহ আদর্শ মুর্শিদ হযরত খাজা শাহ শম্ভূগঞ্জী এনায়েতপুরী (রহঃ) কিনে মুজাদ্দেদীয়া তরিকত মিশনের সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। এই মহান সাহেবে কাশ্ফ এলমে শরীয়ত, এলমে তরিকত, এলমে হাকিকত, এলমে মারেফাতের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম এর দাওয়াত দিয়ে গেছেন বাংলা আসামের  ঘরে ঘরে। হযরত খাজা শম্ভূগঞ্জী (রহঃ) ছিলেন নক্শেবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া তরিকার প্রচারক। তদ্বীয় মুর্শিদ ও ওয়ালেদ ছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত অলী আল্লাহ গাউছোল আযম পীরানে পীর দস্তগীর হযরত শাহ সুফী খাজা মোঃ ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী নক্শেবন্দী মুজাদ্দেদী (রহঃ)।
হযরত খাজা শাহ এনায়েতপুরী (রহঃ) এঁর মহান মুর্শিদ ছিলেন- হযরত শাহ সুফী সৈয়দ ওয়াজেদ আলী মেহেদীবাগী (রহঃ)। যার পবিত্র মাজার শরীফ কলকাতার গোবরায় অবস্থিত। এনায়েতপুরী হুজুর পাকের পূর্বপুরুষ গণের প্রায় সমস্ত লোকই ছিলেন সুশিক্ষিত, ধর্মন্নোত, বুজুর্গ। উপমহাদের প্রখ্যাত অলি আল্লাহ দেওয়ানে ওয়াইসি গ্রন্থের লেখক হযরত শাহ সুফী সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসি (রহঃ) এর প্রসিদ্ধ খলিফাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও অন্যতম ছিলেন গোবরা শরীফের পীর সাহেব হযরত শাহ সুফী সৈয়দ ওয়াজেদ আলী মেহেদীবাগী (রহঃ)। হযরত শাহ সুফী সৈয়দ ওয়াজেদ আলী মেহেদীবাগী (রহঃ) এর ৫৬ জন খলিফা ছিলেন। ৫৬ জন খলিফার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও অন্যতম ছিলেন হযরত শাহ সুফী খাজা মোঃ ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী নক্শেবন্দী মুজাদ্দেদী (রহঃ)। আপন মুর্শিদের নিকট থেকে এজাজত পাওয়ার পর এই মহান সাধক আধ্যাতিœক সাধনা বলে প্রতিষ্ঠা করেছেন বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার (সাবেক পাবনা জেলা) শরীফ এনায়েতপুর বিশ্ব শান্তি মঞ্জিল পাক দরবার শরীফ। এই মহান তাপস এনায়েতপুর দরবার হতে বাংলা ভারতের প্রত্যান্ত অঞ্চলে নকশেবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া তরিকার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন।
হযরত খাজা পীর শাহ্ এনায়েতপুরী (রহঃ) এর অসংখ্য খলিফা ছিলেন-যারা খাজা এনায়েতপুরী (রহঃ) এর তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর প্রভাবে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দেলে রাসুল (সাঃ) প্রেম মহব্বত প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন।
এই মহান তাপস গাউছোল আযম পীরানে পীর হযরত খাজা শাহ্ এনায়েতপুরী (রহঃ) এর সুযোগ্য দ্বিতীয় সাহেবজাদা উপমহাদেশের প্রখ্যাত অলী আল্লাহ বহু ভাষাবিদ আন্তজার্তিক খ্যাতি সম্পন্ন মহান আধ্যাতিœক সাধক স্বর্ণ পদক প্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ লেখক, কবি ও অমর লেখক মুজাদ্দেদীয়া তরিকত মিশন লালকুঠি পাক দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা হযরত আল্লামা খাজা মোহাম্মদ ছাইফুদ্দীন নক্শেবন্দী মুজাদ্দেদী এনায়েতপুরী শম্ভূগঞ্জী  (রহঃ)। তিনি খাজা শাহ্ এনায়েতপুরী (রহঃ) এর খাছ খেলাফত প্রাপ্ত এবং হযরত শাহ সুফী সৈয়দ ওয়াজেদ আলী মেহেদীবাগী (রহঃ) এর প্রতিশ্রুত মহান অলী আল্লাহ। যার আধ্যাতিœক প্রভাবে এবং অত্যান্ত অনুকরণীয় আচরণে ও ভালবাসায় সিক্ত হয়ে কোটি কোটি ভক্ত অনুরাগী অনুসারী সৃষ্টি হয়েছে। যারা তারই আদর্র্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আল্লাহ ও রাসুল (সাঃ) এর এশ্ক প্রেম মহব্বত অন্তরে ফয়দা করতে এবং নিজেদের কাল্বকে উজ্জল ও আলোকিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দেদীয়া তরিকত মিশন লালকুঠি দরবার শরীফ এখন ময়মনসিংহের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানে পরিনত হয়েছে। এ মহান অলী আল্লাহর মাজার জিয়ারত করতে প্রতিদিন শত শত ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ আসছে। জিয়ারত অন্তে প্রত্যেকেই মনে অনাবিল শান্তি নিয়ে বাড়ী ফিরছেন।
দ্বিনী শিক্ষা ও মানব সেবার মানষে এ মহান জ্ঞান তাপস প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন আল্লামা খাজা ছাইফুদ্দীন (রহঃ) আলিয়া মাদ্রাসা, কুবুতখানা, বিশাল এতিমখানা, বিশাল ইসলামী লাইব্রেরী ইত্যাদি বহুবিদ জনকল্যানকর প্রতিষ্ঠান।
এ মহান জ্ঞান তাপস সম্পর্কে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য জ্ঞানী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীগণ অত্যান্ত উচুমানের ভুয়সী প্রশংসাবাদ ব্যক্ত করেছেন। হযরত খাজা শাহ্ শম্ভূগঞ্জী (রহঃ) সুধু মাত্র আধ্যাতিœক সাধকই ছিলেন না, তিনি বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সুলেখক ছিলেন। তিনি- ১। আদর্শ মুর্শিদ ১ম ও ২য় খন্ড, ২। ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) বা মৌলুদে খাইরুল বারিয়াহ, ৩। সুফি দর্শন ও সুফি দার্শনিক, ৪। তাছাউফের ওজিফা বা মারেফাত তত্ত ১ম ও ২য় খন্ড,  ৫। রাজনৈতিক কোন্দলের আবর্তে নির্যাতিত নবী বংশ, ৬। গায়েবী এলেম ও ওয়াছিলা অন্বেষন, ৭। ইসলামে তাছাওফ বা মারেফাত তত্ত, ৮। আহলে বাইয়াত ও শহীদে কারবালা, ৯। সেজরায়ে মোবারক ১০। হযরত মুজাদ্দেদে আলফেসানী (রহঃ) এর জীবনী গ্রন্থ, ১১। ফাজায়েলে জেয়ারতে মাযার প্রভৃতি অমূল্য ইসলামী আদর্শ সম্পর্কিত রচনাবলী রচনা করে গিয়েছেন। তারই ফলশ্রুতিতে  এদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগ ও উপস্থিতিতে তার রচিত আদর্শ মুর্শিদ, ঈদে মিলাদুন্নবী বা মৌলুদে খাইরুল বারিয়াহ, আহলে বাইত ও শহীদে কারবালা এই ৩টি গ্রন্থের উপর তাঁর প্রাণবন্তু ও তথ্যপূর্ণ সারগর্ভ লিখার জন্য তাঁকে স্বর্ণ পদকে ভুষিত করেছেন। এ সম্পর্কে অনেক জ্ঞানী গুণী ও দেশ বরণ্যে ব্যক্তিবর্গ  হযরত খাজা শাহ্ শম্ভূগঞ্জী (রহঃ) কে মহা জ্ঞানী তাপস বলে উচ্চসিত প্রশংসা করেছেন। তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মুঞ্জরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান জাতীয় অধ্যাপক কবি আল্লামা সৈয়দ আলী আহসান, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ দেওয়ান মোঃ আজরফ, বিশিষ্ট লোকবিজ্ঞানী ড. আশরাফ সিদ্দিকী, প্রফেসর ড. কাজী দীন মুহাম্মদ ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি একেএম নুরুল ইসলামের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
এই মহান অলি আল্লাহর লক্ষ লক্ষ আশেক মুরিদানের দিশারী স্বীয় কুতুবিয়াত তথা মুজাদ্দেদীয়াতে দায়িত্ব পরিপূর্ণ ও সফলতার সহিত পালন করে ৭৫ বৎসরাধিক কর্মময় জীবন অতিবাহিত করে বিগত  ১৪০২ বাংলা সনে ৩০ শে আশ্বিন ১৪১৬ হিজরীর ১৯শে জমাদিউল আউয়াল ১৯৯৫ ইং সনের ১৫ই অক্টোবর রোজ রবিবার বেলা ১টা ৪৫ মিনিটের সময় তার সেই পরম বন্ধু ‘রফিকে আলা’ এর সঙ্গে মিলনের উদ্দেশ্যে ইহধাম ত্যাগ করে  দারুল বাকায় তশরীব নেন। (—–ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। এই জ্ঞান  তাপসের মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন লোকজন আসা যাওয়া করিতেছে। মাজার শরীফ জিয়ারত করে অফুরন্তর শান্তি হৃদয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। তারই জেষ্ঠ্য পুত্র আলহাজ্ব হযরত শাহ সুফী খাজা মোহাম্মদ আব্দুর রব খসরু নকশেবন্দী মুজাদ্দেদী দীর্ঘ ১৭ বৎসর মুজাদ্দেদীয়া তরিকত মিশন লালকুঠি পাক দরবার শরীফের গদীনশীন এর দায়িত্ব পালন করিয়া বর্তমানে জামালপুর জেলার নান্দিনায় স্বাধীন ভাবে দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠা করিয়া সফলভাবে তরিকা প্রচারের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরই দ্বিতীয় সাহেবজাদা সুযোগ্য আওলাদ আলহাজ্ব হযরত শাহ সুফী খাজা মোহাম্মদ রেজাউল হক নকশেবন্দী মুজাদ্দেদী, অপর দুই ভ্রাতা হযরত শাহ সুফী খাজা মোহাম্মদ সৌজাউদ্দৌল্লা নক্শেবন্দী মুজাদ্দেদী ও হযরত শাহ সুফী খাজা মোহাম্মদ আলাউল হক অলী নকশেবন্দী মুজাদ্দেদী এর সার্বিক সহযোগিতায় মুজাদ্দেদীয়া তরিকত মিশন লালকুঠি দরবার শরীফ সফলভাবে পরিচালিত করিয়া আসিতেছেন। ইতিমধ্যে তাঁহাদের পিতার গড়া প্রতিষ্ঠান, এতিমখানা, আলিয়া মাদ্রাসাকে আপগ্রেট করিয়াছেন। লালকুঠি পাক দরবার শরীফের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ধন করিয়াছেন এবং অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন করেছেন। তাঁরই অপর আওলাদ হযরত শাহ সুফী খাজা মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা হায়দার নক্শেবন্দী মুজাদ্দেদী স্বাধীনভাবে আলাদা দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠা করে শেরপুর জেলায় তরিকা প্রচার করছেন। সর্বপরি তাঁহারা তাঁহাদের পিতার লক্ষ লক্ষ আশেক ভক্তদের মাঝে জঙ্গি বিরোধী চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদেরকে লক্ষ লক্ষ লোক অনুসরণ করে, ভালবাসে ও সম্মান করে। সম্মান আল্লাহ পাকের দান। আল্লাহ পাক তাঁর বান্দাদের মাঝে যাকে খুশি তাকে সম্মানিত করতে পারেন। বিশেষতঃ বাংলাদেশ অলী আল্লাহর দেশ। এদেশে কোন নবী রাসুল আসেননি। এসেছেন অসংখ্য অলী আল্লাহ। যা যুগে যুগে প্রমাণিত। বিশেষ করে এই উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে অলী আল্লাহগণের বর্ণাঢ্য ও উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। উপমহাদেশের অলী আল্লাহদের ইসলাম প্রচারের ইতিহাস লিখলে শেষ করা যাবে না। কাজেই লেখার কলেবর বৃদ্ধি না করাই সমিচীন। অলী আল্লাহর বিরুদ্ধে অহেতুক বিরোধিতা বা কুৎসা রটনা করার পূর্বে অবশ্যই প্রত্যেক বিবেকবান মানুষের বিবেকে নাড়া দেওয়া সমিচীন। আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন ‘আলা ইন্না আউলিয়া আল্লাহি লা খাওফুন আলায়হিম ওয়া লাহুম ইয়াহ্ জানুন’ সুরা ইউনুছ, আয়াত-৬২, অর্থাৎ সাবধান! নিশ্চয়ই অলী আল্লাহগণের কোন ভয় নেই এবং তাঁদের কোন দুঃখ ভাবনা নেই।