| |

বড়দিন সকল মানুষের মিলনানন্দের মহোৎসব -ফাদার শিমন হাচ্ছা

আজ পঁচিশ ডিসেম্বর শুভ বড়দিন। বড়দিন বিশ্বের সকল খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের জন্য কাংখিত দিন। এ দিনটিকে ঘিরে খ্রীষ্টানদের মধ্যে মাস ব্যাপী চলে আধ্যাতিœক, মানসিক, জাগতিক ও বাহ্যিক প্রস্তুতি। যীশু খ্রীষ্টের জন্মতিথি পালনে শুধুমাত্র খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যেই আনন্দের সাড়া পড়ে তা নয়-এই আনন্দ জতি, বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে-সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এ আনন্দের কারণ-যীশু খ্রীষ্টের জন্মের সংবাদ নিয়ে আসে শান্তি, জগতে নিয়ে আসে আলো, নিরাশা হতাশা গ্রস্থ মানুষের মাঝে আশার বাণী, আর পাপী মানুষের পরিত্রাণের পথ।
বাইবেলের লেখকগণ যীশু খ্রীষ্টের জন্মের বহু বছর পূর্বে ঈশ্বরের দৈববাণীর শক্তিতে ঘোষনা করে আসছিলেন, এ জগতে এক ত্রাণকর্তা জন্মগ্রহণ করবেন, এদের মধ্যে প্রবক্তা ইসাইয়া ছিলেন অন্যতম। তিনি লিখেছেন “প্রভু নিজেই তোমাদের এই নির্দেশণটি দেবেন, শোন এক কুমারী যুবতী এখন সন্তান সম্ভবা, যিনি একমাত্র সন্তানের জন্মদেবেন, তিনি তার নাম রাখবেন ইম্মানুয়েল।” (৭ঃ১৪) এ ভবিষ্যত বাণীটি করেছিলেন যীশু খ্রীষ্টের জন্মের ৭০০ বছর আগে। যীশু খ্রীষ্ট পেম-প্রীতি, ¯েœহ-ভালবাসা দিয়ে এজগতে শাসন করতে এসেছিলেন, যাতে এ জগতের মানুষ চিরকাল ধরে শান্তি-সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করে, যা প্রবক্তা ইসাইয়া সুস্পষ্টভাবে তার ভবিষ্যত বাণীতে বলেছিলেন এই ভাবে—–
“কারণ এক শিশু জন্ম নিয়েছেন আমাদের জন্য, এক পুত্র সন্তানকে দেওয়া হয়েছে আমাদের, তাঁর কাঁধে রয়েছে আধিপত্য-ভার, তাঁর নাম রাখা হলো” আশ্চর্য মন্ত্রণাদাতা, শক্তিশালী ঈশ্বর, সনাতন পিতা, শান্তিরাজ। সীমাহীন শান্তিতে তিনি আধিপত্য প্রসারিত করবেন-দাউদের সিংহাসন ও রাজ্যের উপর ন্যায়, ধর্মময়তা, দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ও সুদৃঢ় করার জন্য এখন থেকে চিরকাল ধরে” (ইসা-৯ঃ৫-৬)।
কেনইবা যীশু এসেছিলেন এ পৃথিবীতে, তার এ পৃথিবীতে আসার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য কি? যীশু নিজেই এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, “প্রভু ভগবানের আতিœক প্রেরণা আমার উপর অধিষ্ঠিত। ভগবান নিজেই আমাকে অভিষিক্ত করেছেন। তিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন দীন-দরিদ্রদের কাছে মঙ্গলবার্তা শোনাতে, ভগ্ন হৃদয়ের ক্ষতস্থান বেঁধে দিতে, বন্দির কছে মুক্তি আর কারারুদ্ধদের কাছে নিস্কৃতির কথা শোনাতে।” এ কথার মর্মার্থ হলো-যীশু এসেছেন আধ্যাতিœক , রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে এবং সার্বিক মুক্তির পথ দেখাতে। এ পৃথিবীর মানুষ স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে জীবন যাপন করে একটি শান্তিময় পরিবেশে বাস করতে পারে। তাই তাকে (যীশু) যারা বিশ্বাস করবে, তার বাণীতে জীবন যাপন করবে, তার শিক্ষা মনে প্রাণে গ্রহণ করবে, তারাই পাবে-“তখন নেকড়ে বাঘ মেষশাবকের সঙ্গে বাস করবে, চিতাবাঘ শুয়ে থাকবে ছাগল ছানার পাশে, বাছুর আর সিংহের বাচ্চা এক সঙ্গে চড়ে বেড়াবে। একটি ছোট ছেলে তাদের পথ দেখিয়ে দেবে। গরু আর ভালুক তখন মিলে মিশে থাকবে। বাচ্চারাও একসঙ্গে শুয়ে থাকবে……” অর্থাৎ জগত জুড়ে শান্তি, একতা ও ভালবাসা বিরাজমান থাকবে।
যীশু খ্রীষ্টের জন্মবার্তা হতাশা নিরাশা ও সমস্যাগ্রস্থ মানুষের আশার বাণী নিয়ে আসেন। তিনি নিঃস্ব হয়ে এ জগতে এসেছিলেন যাতে হত দরিদ্র মানুষের সাথে একাতœ হতে পারেন, তাদের সাথে একাকার হতে পারেন। পৃথিবীর সকল মানুষকে এই আশ্বাস বাণী শুনিয়েছিলেন-শুনিয়েছিলেন মঙ্গলবাণী। প্রবক্তা জেফানিয়া বলেছিলেন-“ভয় করোনা সিয়োন, নিরাশায় যেন অবশ না হয় তোমার হাত। কারণ, তোমাদের ঈশ্বর, স্বয়ং ভগবান এখন তোমাদের কাছেই রয়েছেন, মহাযোদ্ধা, মুক্তিদাতা তিনি, তোমাকে নিয়ে তিনি গভীর আনন্দে আনন্দিত হবেন, তার প্রেমে তিনি তোমাকে নতুন করে গড়ে তুলবেন।” (৩ঃ১৮) এ বাণীর মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারি, ঈশ্বর মানুষকে কতইনা ভালবাসেন।
ঈশ্বর নিজেই ভালবাসা। এ ভালবাসার মন্ত্র নিয়ে এ দুনিয়াতে যীশু এসেছিলেন-নতুন পৃথিবী গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এ পৃথিবীকে নতুন স্বর্গ-রাজ্য স্থাপন করার জন্য। নতুন পৃথিবী-নতুন স্বর্গ গড়ার লক্ষে তিনি তার শিক্ষায়, প্রেম ভালবাসা, সেবা ও ক্ষমা এ মৌলিক উপাদানগুলো বার বার মানুষের কাছে প্রকাশ করেছেন। যারা এ মৌলিক উপাদানগুলো অন্তরে ধারন করবে তারাই হবে খাঁটি, পবিত্র ও শান্তিকামী মানুষ। যীশু নিজেই ছিলেন সেই ধরণের মানুষ। বড় দিনে সবচেয়ে আনন্দের সংবাদটি হলো “ইম্মানুয়েল” যার অর্থ হলো “ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে আছেন”। ঈশ্বর সর্বশক্তিমান-তিনি নিজেই যীশু খ্রীষ্টের মাধ্যমে মানুষের রূপধারণ করে এ জগতে এসেছেন। সকল মানুষের হৃদয় মন্দিরে তার বাসস্থান। মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা সহভাগিতা করার জন্য তার এ জগতে আগমন। তিনি তার সৃষ্টি মানুষকে আপন করে নিয়েছেন, ভালবেসেছেন অন্তর দিয়ে, তার ভালবাসার মানুষ বিনষ্ট হোক তিনি তা চান না। তিনি উদার ও ক্ষমাশীল ঈশ্বর। তাই পাপী মানুষকে পবিত্র করার জন্য, দুর্বল মানুষকে সবল করে তোলার জন্য, অন্ধকারে চলছে যে মানুষ তাদের আলোর পথে আনার জন্য মানবদেহ ধারণ করেছেন। সৃষ্টিকর্তা-সৃষ্ট মানুষের সাথে বাস করতে আসা বড় আনন্দের সংবাদ।
ভালবাসা-আশা-বিশ্বাস এ তিনটি মঙ্গল বার্তা নিয়েই যীশুর জন্ম। ভালবাসা মানুষের মাঝে আনে প্রেম-প্রীতি, সেবা ও ক্ষমা। আশা মানুষের জীবনে আনে ঐশ্বরিক আশীর্বাদ ও ঈশ্বরের সাথে মিলনের আকাংখা আর বিশ্বাস হলো ঈশ্বর ও মানুষের সম্পর্ক স্থাপনের একটি উপায় ও স্বর্গীয় শান্তি লাভের পথ। তাই বড়দিন সকল মানুষের মিলনানন্দের একটি মহোৎসব।